সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু

গ্যাসমুক্ত না করেই কাটা হচ্ছিল জাহাজ, নিরাপত্তা ছিল দুর্বল

Printed Edition
২৮০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৪৩ মিটার প্রস্থের জাহাজটি ২০২৫ জুলাইয়ে চট্টগ্রাম নোঙরখানায় আসে এবং ভাঙার জন্য তীরে তোলা হয়  : নয়া দিগন্ত
২৮০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৪৩ মিটার প্রস্থের জাহাজটি ২০২৫ জুলাইয়ে চট্টগ্রাম নোঙরখানায় আসে এবং ভাঙার জন্য তীরে তোলা হয় : নয়া দিগন্ত

সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি জাহাজভাঙা কারখানায় পুরনো এলএনজিবাহী জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে নয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরো অন্তত ৩০ জন। শুক্রবার সকালে উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকায় মো: লোকমানের মালিকানাধীন ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে। নিহত শ্রমিকদের নাম-পরিচয় জানা গেছে। তারা হলেন- আব্দুল আলিম সুজন (৩৬), খোকন মিয়া (২৩), সানি জলদাস (২৩), পলাশ জলদাস (২৬), দুই সহোদর মনসুর আলী (৪১) ও নাসির উদ্দিন (৩৭), হাবিবুর রহমান (৫১), মো: রানা (২৫) ও মো: সানি (২৩)। সবাই ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা।

প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিক শুভ জলদাস জানান, জাহাজটির এলএনজি ট্যাংক কাটার কাজ প্রায় শেষপর্যায়ে ছিল। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ফোরম্যানসহ সাত-আটজন শ্রমিক একটি ট্যাংকের চারপাশ গোল করে কাটার পর সরে যান। প্রায় ১০ মিনিট পর গর্তটি পুরোপুরি খুলতে গেলে প্রথমে দুইজন শ্রমিক জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে একে একে আরো কয়েকজন ফোরম্যান, নিরাপত্তা কর্মকর্তা এমনকি উদ্ধারে এগিয়ে যাওয়া আরেকজনও গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে জ্ঞান হারান।

কারখানার শ্রমিক মো: রফিক অভিযোগ করেন, অসুস্থ শ্রমিকদের উদ্ধারের পরও সময়মতো চিকিৎসা দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, পলাশ জলদাসকে উদ্ধারের সময় তিনি জীবিত থাকলেও কারখানায় তখন অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক বা অক্সিজেন সিলিন্ডার ছিল না। সময়মতো অক্সিজেন দেয়া গেলে এত মৃত্যু ঠেকানো যেত বলে তার দাবি।

ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম জানান, বেলা পৌনে ১১টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর পেয়ে কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে হতাহতদের উদ্ধার করে। তিনি বলেন, এলএনজিবাহী জাহাজ কাটার আগে সম্পূর্ণ গ্যাসমুক্ত করতে হয়, কারণ কিছু ট্যাংকে ফ্লোরিন, কার্বন মনোক্সাইড ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাস থাকতে পারে। জাহাজটি গ্যাসমুক্ত না করেই কাটার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে ধারণা করছেন তিনি, একই সাথে কারখানার নিরাপত্তাব্যবস্থাও ছিল দুর্বল।

বিস্ফোরক অধিদফতর চট্টগ্রামের পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে কার্বন ডাই-অক্সাইড, হাইড্রোজেন সালফাইডসহ বিভিন্ন গ্যাস মিলে বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানা যাবে বলে তিনি জানান।

মালিকপক্ষের দাবি, শ্রমিক ফেডারেশনের ক্ষোভ

কারখানার মালিকপক্ষের প্রতিনিধি মো: মহিউদ্দিন দাবি করেন, শুক্রবার কারখানা বন্ধ ছিল এবং শুধু নিরাপত্তা বিভাগের লোকজন দায়িত্বে থাকা অবস্থায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও তাদের পরিবারকে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে বলে তিনি জানান। সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: ফখরুল ইসলাম বলেন, ঠিক কোন গ্যাসে শ্রমিকেরা আক্রান্ত হয়েছেন, তা নিশ্চিত হতে সেনাবাহিনীর একটি অভিজ্ঞ দল ও বিস্ফোরক অধিদফতরের কর্মকর্তাদের ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে জাহাজভাঙা শিল্প মালিক সমিতির (বিএসবিএ) পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকা করে সহায়তা দেয়া হবে বলে তিনি জানান।

এ দিকে বাংলাদেশ শ্রমিক-কর্মচারী ফেডারেশন এক বিবৃতিতে ঘটনাটিকে ‘অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড’ আখ্যা দিয়ে দায়ী ইয়ার্ড মালিকের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে। সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মানস নন্দী ও সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রেজা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, জাহাজের ভেতরে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা না করেই শ্রমিকদের কাজ করানো হচ্ছিল, যা মালিকপক্ষের স্পষ্ট গাফিলতি। নিয়ম অনুযায়ী কাটার আগে গ্যাস-ফ্রি সনদ নেয়া বাধ্যতামূলক হলেও তা মানা হয়নি বলে তারা অভিযোগ করেন। তাদের দাবি, সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছিল। বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে (২০০৫-২৬) সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে দুর্ঘটনা ও গ্যাস বিস্ফোরণে আড়াই শতাধিক শ্রমিক নিহত হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত রয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। নেতৃবৃন্দ দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি জানান।

ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ হয়ে কারখানায় ঢুকে ভাঙচুর চালান, পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক আশরাফ উদ্দিন জানান, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে এবং প্রয়োজনে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তদন্ত করে ব্যবস্থা : অর্থমন্ত্রী

এ দিকে হতাহতের ঘটনায় তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

তিনি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের খোঁজখবর নেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘তদন্তে যা পাওয়া যাবে, তার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে। দুর্ঘটনার আন্তর্জাতিক প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই গ্রিন ইয়ার্ডের কমপ্লায়েন্সের বিষয়ে জোর দেয়া হচ্ছে। গ্রিন ইয়ার্ডের গ্রেডিং সরকার করে না জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এটি হংকং কনভেনশনের নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী করা হয়। ওই নীতিমালা পূরণ করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে গ্রিন ইয়ার্ডের সনদ দেয়া হয়।