হাওরে কৃষক পরিবারে ঈদের আনন্দ নেই

Printed Edition

তৌহিদ চৌধুরী প্রদীপ সুনামগঞ্জ

সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, মধ্যনগর, তাহিরপুর দিরাই, শাল্লা, এলাকাসহ হাওর এলাকার প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে ফসলহারা কৃষক পরিবারগুলোতে এবার ঈদের আনন্দ নেই। কিছু কিছু কৃষকপরিবার অর্ধেক ধান তুলতে পারলেও বেশিরভাগ পরিবারের অবস্থা একেবারেই নাজেহাল। বিগত বছরগুলোতে ঈদ আসার পূর্বেই ঘরে ঘরে জানান দিত ঈদের খুশির বারতা। এবার বোরো ফসল বিনষ্টের কারণে এই অঞ্চলের মানুষের ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে পড়েছে। বৈশাখ মাস এবার বর্ষাকালে রূপ নিয়েছে।

ভারতীয় পাহাড়ি ঢল আর অতিবৃষ্টি গড়ে প্রায় অর্ধেক বোরো ফসল নিমজ্জিত হয়ে কৃষকদের ‘মড়ার উপর খাড়ার ঘাঁয়ে’ পরিণত হয়েছে। অতিবৃষ্টি আর বন্যার কারণে বোরো ফসলের পাশাপাশি রবিশস্য ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ অনেক দাঁড়িয়েছে; যা কৃষক পরিবারগুলো চোখে অন্ধকার দেখছেন। ফসলহারা বন্যা কবলিত অনেক পরিবার নীরবে বিপর্যস্ত হয়ে জীবন যাপন করছেন। হাওরপাড়ের নিভৃত পল্লীগুলোতে নীরব হাহাকার। চৈত্রের দুর্দিন কাটিয়ে গেল রমজানের ঈদ কোনোরকম কাটিয়ে যে কৃষকরা বুকভরা স্বপ্ন আর আশা নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন বৈশাখে সোনালি ফসল ঘরে তুলে কোরবানির ঈদে অনেকেই ছেলে-মেয়ে পরিবার-পরিজনকে নতুন জামা কাপড় কিনে দেবেন; সেই স্বপ্ন এবার ডুবে গেল পানির নীচে। হাওর এলাকার কিছু কৃষক পরিবার তার রোপিত জমির অর্ধেক বা কিছু ধান কাটলেও গড়ে প্রায় অর্ধেক কৃষকের অধিকাংশ ফসলই বিনষ্ট হয়েছে। জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে ৮০ ভাগ ধান তোলার কথা বলা হলেও কৃষকরা তা মশকরা ও মনগড়া বলে দাবি করেছেন।

হাওরবাসী জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক গ্রামের বড় ও সুখী গৃহস্থ তোফায়েল আলম চৌধুরী ছানা বলেন, সারাজীবন একা একা বড় বড় গরু কোরবানি দিয়ে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজনসহ সবাইকে নিয়ে উৎসব করেছি। এবার কোরবানি দেয়া তো দূরের কথা, আমার কাজের লোকজনকে বেতন দেয়াটাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

উদয়পুর গ্রামের ফিরোজা বেগম এই প্রতিবেদককে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন ২০১৭ সালে বজ্রপাতে আমার তিনটি দুধেল গাভী মারা যায়। যে গাভীর দুধ বিক্রি করে চলত আমার সংসার। আমার সন্তানদের মতোই গরুগুলোকে যতœ করতাম, গাভীগুলো তুফান আর শিলাবৃষ্টি ও বজ্রপাতে মারা যাওয়ার পর বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে বিপদের সম্মুখীন হয়ে আজো নীরবে দিন কাটাচ্ছি। কোরবানির গোশত খাওয়া তো দূরের কথা, কত কষ্ট করে আমরা আছি ঈদ নামের একটা দিন আছে কী করমু মুখে হাসিও আসে না, ঘরে বাচ্চা-কাচ্চার দিকে তাকালে চোখ দিয়ে পানি আসে। কাউরে তো নতুন জামা কাপড় কিনে দিতে পারছি না’। এ কথা বলে তিনি চোখ মোছেন শাড়ির আঁচল দিয়ে। একই গ্রামের রেজওয়ান আহমদ বলেন, ‘আমার কোরবানি নাই, ঈদের খুশিও নাই। অন্য বছর কয়েকজনে মিলেমিশে কোরবানি দিতাম, এবার ফসলডুবির কারণে কোরবানি তো দূরের কথা খাইয়াই জীবন বাঁচবো কেমনে সেই চিন্তায় আছি’।

ফেনারবাঁক গ্রামের বর্গাচাষি কৃষক ফারুখ মিয়া বলেন, ‘অন্যের জমি চুক্তি করে যে পরিমাণ জমি করছিলাম আর যে টাকা খরচ হয়েছিল একটা ধান আমি পাই নাই। সব জমি তলিয়ে গেছে। তবু ছবলি তুলে কিছু কাটার চেষ্টা করছি। ঈদে সব জিনিসের দাম বাড়তি কী যে করি কই যাই, কার কাছে কই কিছুই বলতে পারছি না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাবে যে সাহায্য দিতাছে, হেই তালিকায় নাম দিছি এখনো কোন টেকা পইসা পাই নাই। ঈদের আগে যদি পাই আমার মতো ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরার খুব উপকার হইবো’। হঠামারা গ্রামের কৃষক ফিরোজ আলী বলেন, আমার গ্রামে এবার কোরবানির গোশত সব পরিবারে খাইতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। কোরবানির চেয়ে ভাত খাইয়া জীবন বাঁচানো যায় আমরা যদি এখন হাওরের মাছ ধরতে পারতাম তাহলে কোনো রকম জীবন বাঁচত, আমাদের এলাকার বিলের ইজারাদাদের কারণে গরিবরারেও ভাসান পানিতে মাছও ধরতে পারছে না ঠিকমতো’।