কোথা থেকে আসছে এত বিক্রয়চাপ প্রশ্ন বিনিয়োগকারীদের

বিএসইসি চেয়ারম্যানকে হেনস্তার দেড় বছর পর শাস্তি কার্যকর

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

পুুঁজিবাজার সূচকের অবনতিতে টানা সাত দিন পার করল দেশের দুই পুঁজিবাজার। দৃশ্যমান কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ নেতিবাচক আচরণ শুরু হয় বাজারে। বাজারের এহেন আচরণে হতাশায় মুষড়ে পড়া বিনিয়োগকারীদের একটি অংশের প্রশ্ন ছিল কোথা থেকে আসছে এ বিক্রয়চাপ? যেখানে বাজারের গড় মূল্য-আয় অনুপাত (পিই) এখনো ১০ এর নিচে সেখানে বাজার সংশোধনে এত লম্বা সময় সূচকের টানা অবনতি ঘটার কোনো কারণ থাকতে পারে না।

বিগত কয়েক দিনের বাজার আচরণে দেখা যায়, লেনদেনের শুরুতে সূচকের বড় উন্নতি ঘটার পরই বিক্রয়চাপ তৈরি হয়। কিন্তু গতকাল ঘটে উল্টোটা। এদিন লেনদেনের শুরুতেই সূচকের বড় ধরনের অবনতি ঘটে দুই পুঁজিবাজারে। কিন্তু দ্রুত এ চাপ সামলে ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে বাজার সূচক। সকাল সাড়ে ১০টার আগেই হারানো সূচক ফিরে পায় বাজারগুলো। কিন্তু দিনের বাকি সময় সমান তালে চলতে থাকে সূচকের ওঠানামা। সূচক কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হতেই সৃষ্টি হয় বিক্রয়চাপ। এর মধ্যেও বেলা ১২টার পর চাপ সামলে ঊর্ধ্বমুখী হওয়া সূচক বেলা ১টা পর্যন্ত বড় ধরনের উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। কিন্তু লেনদেন শেষ হওয়ার পনের মিনিট আগে সৃষ্ট হওয়া বিক্রয়চাপ দিনশেষে দুই পুঁজিবাজারেই সূচকের অবনতি ঘটায়।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩ দশমিক ৯১ পয়েন্ট হারায়। ৫ হাজার ৭৭৩ দশমিক ৬২ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বুধবার লেনদেন শেষে স্থির হয় ৫ হাজার ৭৬৯ দশমিক ৭১ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ ১ দশমিক ৫০ পয়েন্ট অবনতির শিকার হলেও ডিএসই শরিয়াহ সূচকটি দশমিক ৯৪ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। অনুরূপভাবে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১৯ দশমিক ২৮ পয়েন্ট হারায় গতকাল। ১৫ হাজার ৫১৩ দশমিক ৪০ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বিকেলে লেনদেন শেষে নেমে আসে ১৫ হাজার ৪৯৪ দশমিক ১২ পয়েন্টে। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১ দশমিক ৫২ ও ৭ দশমিক ৩৯ পয়েন্ট।

গতকাল দুই পুঁজিবাজারে সূচকের অবনতি কিছুটা সহনীয়পর্যায়ে থাকলেও সূচকের ওঠানামার কারণে কিছুটা গতি হারায় বাজারগুলো। ডিএসই গতকাল মাত্র ৭৩২ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি বছরের ১৯ মের পর আর এ পর্যায়ে নামেনি ডিএসইর লেনদেন। লেনদেন কমেছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারেও। গতকাল এখানে ৩৭ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়। মঙ্গলবার সিএসইর লেনদেন ছিল ৭৩ কোটি টাকা।

এ দিকে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। একই ঘটনায় আরো পাঁচ কর্মকর্তার বেতন সর্বনিম্ন গ্রেডে নামিয়ে আনা হয়েছে। বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ তার নেতৃত্বে পরিচালিত কমিশনকে হেনস্তা ও অবরুদ্ধ করার জেরে সেই সময় ঘোষিত শাস্তি কার্যকর হলো। গত বছরের ৫ মার্চ তৎকালীন বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ ও কয়েকজন কমিশনারকে ৪ ঘণ্টার বেশি সময় অবরূদ্ধ ও নাজেহাল করার ঘটনায় সরকারের নির্দেশে বিএসইসি কর্তৃক এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে বিএসইসি এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই ঘটনায় মোট ২৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছিল সরকার। এর মধ্যে ২২ জনের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৭ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর এবং পাঁচজনের বেতন সর্বনিম্ন স্তর বা গ্রেডে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। বাকি একজন কর্মকর্তা এর আগেই অন্য একটি অভিযোগে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বিএসইসির একাধিক সাবেক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, মঙ্গলবারই সংশ্লিষ্টদের শাস্তির সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। তবে আনুষ্ঠানিক চিঠি তারা বুধবার হাতে পেয়েছেন। তাদের অনেকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসি কার্যালয়ে গিয়ে চিঠি গ্রহণ করেন।

প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ৫ মার্চ বিএসইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ তৎকালীন চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের অবরূদ্ধ করে রাখেন। চার ঘণ্টার বেশি সময় পর সেনাবাহিনী এসে তাদের উদ্ধার করে। বিএসইসির তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর প্রতিবাদ থেকেই ওই ঘটনার সূত্রপাত। পরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিভিন্ন দাবিদাওয়া তুলে ধরার পাশাপাশি তৎকালীন কমিশনের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ করেন। এ ঘটনায় তারা কর্মবিরতিও পালন করেন। ফলে কয়েক দিন ধরে বিএসইসিতে অচলাবস্থা ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। একই কারণে সেই সময় পুঁজিবাজারেও তার ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

ঘটনার পর ৬ মার্চ রাজধানীর শেরেবাংলানগর থানায় ১৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তৎকালীন বিএসইসি চেয়ারম্যানের নিরাপত্তায় নিয়োজিত গানম্যান আশিকুর রহমান বাদি হয়ে মামলাটি করেন। ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি সরকারি বিধি অনুযায়ী ঘটনার তদন্ত ও বিভাগীয় মামলা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তদন্ত পরিচালনার পাশাপাশি অভিযুক্ত কর্মকর্তা এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্য নেয়া হয়। তদন্ত ও অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষে সরকারের পক্ষ থেকে ২৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিএসইসিকে নির্দেশনা দেয়া হয়।

মঙ্গলবার সেই নির্দেশনার ভিত্তিতেই ২২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তি কার্যকর করা হয়েছে।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, তৎকালীন চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্বে কমিশনের নির্ধারিত সভাকক্ষে বৈঠক চলার সময় অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জোরপূর্বক সেখানে প্রবেশ করে চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের অবরুদ্ধ করেন। অভিযোগে আরো বলা হয়, পূর্বপরিকল্পিতভাবে কমিশনের মূল ফটকে তালা দেয়া, সিসিটিভি ক্যামেরা ও ওয়াই-ফাই সংযোগ বন্ধ করা এবং লিফট ও বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো ঘটনা ঘটানো হয়। এতে কমিশন ভবনে ভীতিকর ও অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।