নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুদ্ধবিদ্ধস্ত ফিলিস্তিনের গাজায় শক্তিশালী ঝড় বাইরনের আঘাতে বেশ কিছু ঘরবাড়ি, দেয়াল ও তাঁবু ধসে পড়েছে। যার কারণে ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ১২ জন মারা গেছেন। তীব্র শীত আর ঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট বৃষ্টিতে উপত্যকা প্লাবিত হয়ে মানবিক সঙ্কট আরো বেড়েছে। এক দিকে ঝড়ের তাণ্ডব, অন্য দিকে ইসরাইলি বাহিনীর বর্বরতা- দুইয়ের আঘাতে বিপন্ন হয়ে পড়েছে বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবন।
আল জাজিরা ও দ্য নিউ আরব পরিবেশিত খবরে জানা গেছে, সব কিছু হারানো ফিলিস্তিনিদের এই বিপর্যয়কর আবহাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়ার মতোও কিছুই ছিল না। ১২ জনের মধ্যে তীব্র শীতে হাইপোথার্মিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া তিন শিশুও রয়েছে।
তিন শিশুর মধ্যে দু’জন মারা গেছে গতকাল শুক্রবার। এর মধ্যে এক শিশু তায়ম আল-খাওজা। পরিবারসহ তারা গাজার পশ্চিমে আলশাতি রিফিউজি ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছিল। একটি স্কুলে আশ্রয় নেয়া ৯ বছর বয়সী হাদীল হামদানও শীতের কারণে মারা গেছে। ওই স্কুলে পুনর্বাসিতদের জন্য পর্যাপ্ত তাপ সরবরাহ ব্যবস্থা ছিল না। এ দিকে বেইত লাহিয়ায় একটি ভবন ধসে অন্তত পাঁচ ফিলিস্তিনি মারা গেছেন। অন্য দিকে রেমাল এলাকায় ক্যাম্পের তাঁবুর ওপর একটি প্রাচীর ধসে আরো দু’জন মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ঝড়ের এই তাণ্ডবের মধ্যেও গাজায় ইসরাইলি বর্বরতা থেমে নেই। ‘ইয়েলো লাইন’ অতিক্রমের অভিযোগে উত্তরাঞ্চলীয় শহর জাবালিয়ায় দখলদারদের গুলিতে এক নারী নিহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলের হামলায় এ পর্যন্ত ৭০ হাজার ৩৬৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। যদিও কিছু সংস্থা বলছে, প্রকৃতপক্ষে এই নিহতের সংখ্যা আরো বেশি।
আনাদোলু এজেন্সির খবরে জানা যায়, ঝড় বায়রনের তাণ্ডবের মাঝেও গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর হামলা থেমে নেই। উত্তরাঞ্চলীয় শহর জাবালিয়ায় ইয়েলো লাইন অতিক্রমের অভিযোগে দখলদারদের গুলিতে এক নারী নিহত হয়েছেন। তীব্র শীত এবং ঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট বৃষ্টিপাতে উপত্যকার অনেক রাস্তাঘাট ও ত্রাণশিবিরের তাবু প্লাবিত হয়েছে। রাতভর বৃষ্টি আর ঠাণ্ডায় জর্জরিত হয়ে শিশুসহ কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটেছে। ঝড়ে কয়েকটি ভবনও ধসে পড়েছে। অস্থায়ী তাঁবুগুলো পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে না পারায় বাসিন্দারা আশ্রয় নিচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে।
জাতিসঙ্ঘ সতর্ক করেছে, গাজায় বন্যা বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ। ৭৬০টির বেশি শরণার্থী শিবির সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত খারাপের দিকে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে হোয়াইট হাউজ নীরবে প্রস্তুতি চালাচ্ছে বলে জানা গেছে, যদিও এর কার্যকরের নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি। অন্য দিকে হামাস যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে নিজস্ব পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠনটি জানায়, নিরস্ত্রীকরণ ও সামরিক অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে কিভাবে এগোবে সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের পরিকল্পনা বোঝানোর চেষ্টা চলছে। তারা ফিলিস্তিনিদের পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু করার সুযোগ দিতে মধ্যস্থতাকারীসহ অন্য দেশগুলোকে ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছে।
তবে ইসরাইল বলছে, গাজা উপত্যকার শাসনব্যবস্থায় হামাসের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সরকারি মুখপাত্র শোশ বেদ্রোসিয়ান জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী হামাসকে নিরস্ত্র করা হবে এবং উপত্যকাটিকে অস্ত্রমুক্ত করা হবে।
জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি হামলায় গাজার দুই লাখ ৮২ হাজারের বেশি বাড়ি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা পুরো অঞ্চলের প্রায় ৯০ শতাংশ। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইসরাইল গাজায় কনটেইনার ঘর ঢুকতে দিচ্ছে না। ফলে অধিকাংশ মানুষ অস্থায়ী তাঁবুতেই বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। খাদ্য সঙ্কট, আশ্রয় সঙ্কট ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে থাকা ফিলিস্তিনিদের তাবুগুলো ভারী বৃষ্টিতে প্লাবিত হয়েছে। নারী ও শিশুসহ হাজারো মানুষের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।
বৃষ্টিতে আরো দুর্ভোগ বাড়তে পারে : জাতিসঙ্ঘের সতর্কতা
জাতিসঙ্ঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএম জানিয়েছে, ঝড় বায়রনের কারণে গাজায় প্রায় ৭ লাখ ৯৫ হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। সংস্থাটি জানায়, ঝড়টি গাজায় পৌঁছানোর আগে গ্রিস ও সাইপ্রাসে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করেছিল। বৃষ্টি আরো বাড়তে পারে, যা অনিরাপদ আশ্রয়ে থাকা পরিবারগুলোর পরিস্থিতি আরো খারাপ করবে। আইওএম বলেছে, যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও বাস্তুচ্যুত মানুষগুলো অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে পানি বাড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আইওএম মহাপরিচালক অ্যামি পোপ বলেন, গাজার মানুষ অনেক দিন ধরে ভয় ও ক্ষতির মধ্যে বেঁচে আছেন। ঝড়ের পর পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, গাজায় জরুরি ও বাধাহীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে সহায়তা পৌঁছানো যায়। তিন দিন ধরে চলা মেরু ঝড় বায়রন গাজায় মানবিক সঙ্কট আরো গভীর করছে।
গাজায় ধ্বংসস্তূপ সরানোর খরচ দেবে ইসরাইল
ইসরাইল গাজায় ব্যাপক ধ্বংসস্তূপ সরানোর খরচ বহন করতে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ মেনে নিয়েছে বলে বৃহস্পতিবার জানিয়েছে ইসরাইলি দৈনিক ইয়েদিয়োথ আহরোনোথ। মিডল ইস্ট মনিটর জানায়, গত দুই বছরে সামরিক অভিযান, বিমান হামলা এবং ইসরাইলি সামরিক বুলডোজারে ভবন সমতল করার ফলে গাজায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পত্রিকাটিকে এক জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মকর্তা বলেন, ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবি গ্রহণ করেছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ধ্বংসস্তূপ সরানোর সরাসরি খরচই ইসরাইলের শত শত মিলিয়ন শেকেল পর্যন্ত হতে পারে। আর পুরো ধ্বংসাবশেষ অপসারণ ও পুনর্গঠন প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়াতে পারে কয়েক বিলিয়ন শেকেল। গাজায় পুনর্গঠন শুরু করার আগে ধ্বংসস্তূপ সরানো বাধ্যতামূলক। যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে এই কাজ শুরু হওয়ার কথা। প্রথম ধাপ ১০ অক্টোবর ২০২৫ থেকে কার্যকর হয়েছে।
পশ্চিমতীরে ইসরাইলি সেনাদের হাতে শিশু হত্যার হার নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে
পশ্চিমতীরে তুবাসের আল-ফারাআ শরণার্থী শিবিরের ১৪ বছর বয়সী জাদ জিহাদের পরিবার ১৬ নভেম্বর সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও দেখে ভেঙে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, ইসরাইলি সৈন্যরা তাকে পায়ে গুলি করার পর মাটিতে কাতরাতে থাকে, মাথা তুলতে থাকে, আর সৈন্যরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার রক্তক্ষরণ দেখছিল। তারা অ্যাম্বুলেন্সকেও কাছে যেতে দেয়নি।
এক ঘণ্টা পরও জাদ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। এরপর সৈন্যরা তাকে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। পরে পরিবার জানতে পারে, জাদ মারা গেছে। ২০২৫ সালে ইসরাইল দখলকৃত ওয়েস্ট ব্যাংকে ৫১ জন ফিলিস্তিনি শিশুকে হত্যা করেছে, যা এ অঞ্চলে শিশু হত্যার সবচেয়ে ভয়াবহ বছর। এ ছাড়া এ বছর নিহত ১৭ শিশুর লাশ ইসরাইল এখনো আটকে রেখেছে এবং পরিবারকে ফেরত দিচ্ছে না।
জাদের ভাই কুসাই দ্য নিউ আরবকে বলেন, জাদ বন্ধুদের সাথে বিলিয়ার্ড খেলছিল। এ সময় ইসরাইলি সেনারা শিবিরে ঢোকে। জাদ বাড়ি ফিরতে চাইলে সৈন্যরা তাকে ঘিরে ধরে খুব কাছ থেকে গুলি করে। পায়ে গুলি লেগে সে মাটিতে পড়ে যায়। আশপাশের বাসিন্দারা ছাদ থেকে তাকে দেখতে পান তার মা-ও দেখেন, পোশাক দেখে ছেলেকে চিনতে পারেন। তিনি ছেলেকে যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখেও কাছে যেতে পারেননি, শুধু কাঁদছিলেন।
কুসাই বলেন, সৈন্যরা যখন তাকে সরাল, আমরা ভেবেছিলাম চিকিৎসা দেবে। কিন্তু তারা ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে চিকিৎসা না দিয়ে মরতে দিয়েছে। পরিবারকে আরো কষ্ট দিচ্ছে জাদের লাশ আটকে রাখা। ইসরাইল লাশ ফেরত দিচ্ছে না, এমনকি পরিবারকে লাশ দেখতে বা কোথায় রাখা হয়েছে তাও জানাচ্ছে না। কুসাই বলেন, বিদায় জানাতে না পারা, কবর না থাকা এটা আমাদের জন্য অসহনীয়। মা দিনরাত কাঁদছেন। লাশ না দেয়ায় মনে হয় তারা সত্য লুকাচ্ছে। যদি সে সত্যিই মারা যায়? যদি এখনো বেঁচে থাকে? হাজার প্রশ্ন আমাদের তাড়া করে। জাদ শিবিরে সবার প্রিয় ছিল হাসিখুশি, কর্মচঞ্চল, বিশেষ করে বয়স্কদের সাহায্য করতে ভালোবাসত। তার বন্ধুরা প্রতিদিন তার বাড়ির সামনে ডাক দিত, এখন তারা গভীর শোকে সেখানে দিয়ে যায়।
শিশুদের ওপর বাড়ছে দমনপীড়ন
সেভ দ্য চিলড্রেনের গ্লোবাল মিডিয়া ম্যানেজার এমিলি ওয়াইট বলেন, ইসরাইলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা শিশুদের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে- সামরিক আটক, বাড়িঘর ভাঙা, বাস্তুচ্যুতি, হয়রানি, স্কুলে যাওয়ার পথে হামলা-সবই বেড়েছে। ওচার তথ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে ১১ নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত দখলকৃত ওয়েস্ট ব্যাংকে (পূর্ব জেরুসালেমসহ) ৯৯৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্তত ২১৯ শিশু। ২০২৫ সালে ইসরাইলি বাহিনীর হাতে নিহত প্রতি পাঁচজনের একজনই শিশু। ওয়াইট বলেন, চলমান অবরোধ, চেকপোস্ট ও সহিংসতার কারণে শিশুদের শিক্ষাজীবনও হুমকির মুখে।
দুই সপ্তাহ আগে সেভ দ্য চিলড্রেন উত্তর ওয়েস্ট ব্যাংকের কিছু এলাকায় শিক্ষা সহায়তা ও শিশু সুরক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়। ফলে ৭০০-র বেশি শিশু সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়। তিনি বলেন, ‘২০২৫ সালের শুরু থেকে ওয়েস্ট ব্যাংকের মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহভাবে খারাপ হয়েছে। ইসরাইলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীরা মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করছে। সহিংসতা, ভাঙচুর, জমি দখল, অবকাঠামো ধ্বংস সবমিলিয়ে ফিলিস্তিনিদের জীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছে। তিনি আরো বলেন, আরো প্রস্তাব নয় ফিলিস্তিনি শিশু ও পরিবারগুলোর জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। আন্তর্জাতিক আইন মানা না হলে তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা আরো লঙ্ঘিত হবে।



