শিরোপা কি ধরে রাখতে পারবে আর্জেন্টিনা

Printed Edition

ক্রীড়া প্রতিবেদক কানাডা থেকে

প্রথম থেকেই বলা হচ্ছিল এবারের বিশ্বকাপের সহজ গ্রুপে পড়েছে আর্জেন্টিনা। গ্রুপে তিন দল আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া এবং জর্দানের বিপক্ষে সহজ জয় তার প্রমাণ দিয়েছে। ফুটবল পরিচয় এবং ঐতিহ্যে এই তিন দলের চেয়ে পিছিয়ে এবং কম পরিচয়ের ছিল কেপ ভার্দে। যদিও আটলান্টিক মহাসগারের পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলের ১২টি দ্বীপ নিয়ে গড়া কেপ ভার্দে এবারের বিশ্বকাপে এসেই জানান দিয়েছে তারা কোনো দলকেই ছেড়ে দেবে না। কোনো শক্তির দলই তাদের নাগালের বাইরে নয়। তবে তিনবারের বিশ্বকাপ জয়ী লিওনেল মেসিরা যেভাবে নাকানি চোবনি খেয়েছে অখ্যাত লিগে খেলা সব ফুটবলারের কাছে, তাতে শঙ্কা এবার ট্রফি ধরে রাখতে পারবে কিনা লিওনেল স্কালোনির দল।

ছোট দলের কাছে হেরে আর্জেন্টিনার হোঁচট খাওয়াটা নতুন কিছু নয়। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে আগেরবারের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ক্যামেরুনের কাছে হেরেছিল দিয়েগো ম্যারাডোনার দল। ২০২২ সালে শিরোপা পুনরুদ্ধারের সফল মিশনে তাদের প্রথম ম্যাচেই হারতে হয়েছিল দুর্বল সৌদি আরবের কাছে। এই দুই হারের পর আর্জেন্টিনা ঘুরেও দাঁড়িয়েছিল। ১৯৯০ সালের মতো ২০২২ সালের বিশ্বকাপেরও ফাইনালে খেলেছিল। ইতালির মাঠে শিরোপায় হাত ছোয়াতে না পারলেও কাতারের মাঠে সফল। এবার অবশ্য এখনো অপারজিত দল আর্জেন্টিনা। সৌদি আরবের কাছে কাতারের মাঠে হারের পর বিশ্বকাপে টানা ১০ ম্যাচে অপরাজিত। মোট কথা টাইব্রেকারে জেতা মিলিয়ে ১০ খেলাতেই জয়। তবে কেপ ভার্দে যেভাবে কাঁপিয়ে দিয়েছে অর্জেন্টিনা দলকে, এটা অন্য কোনো বড় দলের বিপক্ষে হলে লজ্জা নিয়েই মাঠ ছাড়তে হতো ল্যাটিনদের।

সেই পর্ব এখনো বাকি। সেরা ১৬-এর ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ মিশর। যদি আরব দেশটির বাঁধা পেরুতে পারে, তাহলে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে সব শক্তিশালী এবং সমপর্যায়ের দল। তখন কেপ ভার্দের বিপক্ষে যেভাবে কার্যত: যে অসহায় অবস্থায় ছিল তেমনটি হলে আর রক্ষা নেই। এমনকি প্রথমবারের মতো নক আউট পর্বে আসা এবং জয় পাওয়া মিশরও কিন্তু ছেড়ে কথা বলবে না। তাই মেসি বাহিনীর জন্য এখন মোহাম্মদ সালাহরও আরেক কঠিন চ্যালেঞ্জ।

কেপ ভার্দে কিন্তু উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচেই প্রমাণ করেছে পিছিয়ে পড়েও তারা ম্যাচে ফিরতে পারে। আর্জেন্টিনার প্রতিবেশী উরুগুয়ে। উরুগুয়ের চেয়েও শক্তিশালী আর্জেন্টিনা। সেই আর্জেন্টাইনদের বিপক্ষেও আফ্রিকার দেশটি দুই দফা দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। মিডফিল্ডার এবং ডিফেন্সের ভুলেই এই বিপদে পড়েছিলেন মেসিরা। এখন এই দুই বিভাগ নিয়েই কাজ করতে হবে।

আর্জেন্টিনা আসলে মোকাবেলা করছে তিন বিভাগের সমস্যা। ফরোয়ার্ড লাইনে মেসি ছাড়া কেউই ফর্মে নেই। গোলের দেখা পাচ্ছে না। মিডফিল্ড থেকেও সেই যুতসই পাস দেয়া যাচ্ছে না আক্রমণভাগকে। আর রক্ষণভাগ গোল হজম করেছিল জর্দানের কাছে। আর কেপ ভার্দে তো এই দুর্বলতাকে পুঁজি করেই জোড়া গোল দিয়েছে। এমনকি শেষ তিন মিনিট যেভাবে আর্জেন্টিনাকে চেপে ধরেছিল, তখন মেসিদের দেখে মনেই হয়নি এরা যে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন এবং ফিফা র‌্যাংকিংয়ে এক নম্বর দল। এতেই বুঝা যায় কতটা অসহায় তাদের রক্ষণভাগ ও মিডফিল্ড।

আক্রমণভাগকে একাই টানছেন মেসি। চার ম্যাচের প্রত্যেকটিতেই গোল। নামের পাশে জমা করেছেন ৭ গোল। কিন্তু আর গোলদাতারা কোথায়। কেপ ভার্দের বিপক্ষে তিন গোলের দু’টি করেছেন দুই ডিফেন্ডার। একজন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও অপরজন স্টপার ব্যাক ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো। যদিও রোমেরোর হেডের গোলকে রেফারি আত্মঘাতী গোল দিয়েছেন।

কাতার বিশ্বকাপে অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া ছিলেন। নিজে গোল করেছেন, গোল করিয়েছেন, মাঝমাঠ দাবড়িয়ে বেরিয়েছেন। ছিলেন বিপক্ষ রক্ষণভাগের জন্য আতঙ্ক। এবার ডি মারিয়া নেই। চলে গেছেন অবসরে। টানা দুই বিশ্বকাপে অফফর্মে লাউতারো মার্টিনেজ। তার বিকল্প হিসেবে কাতার বিশ্বকাপে ৪ গোল করেছিলেন জুলিয়ান আলভারেজ। এবার তিনিও গোলের দেখা পাচ্ছেন না। কাতার বিশ্বকাপে মেক্সিকোর বিপক্ষে গোল করা এনজো ফার্নান্দেজ, পোল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাক অ্যালিস্টার, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে গোল করা নাহুয়েল মলিনা এবার এখনো গোলের দেখা পাননি। ফলে ফরোয়ার্ড লাইনে মেসিই ওয়ানম্যান শো। ৩৯ বছর বয়সী মেসি একা আর কতো করবেন।

তাই শিরোপা ধরে রাখতে আগামী চার ম্যাচে (যদি সুযোগ পায়) অবশ্যই অন্য খেলোয়াড়দের জ্বলে উঠতে হবে। তা না হলে ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালের ইতালি এবং ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের টানা দুই শিরোপা জয়ের রেকর্ডে ভাগ বসাতে পারবে না আর্জেন্টিনা।

কেপ ভার্দের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা জিতলেও দলের পারফরম্যান্সে খুশি হতে পারেননি মেসি। তাই ম্যাচ শেষে তার ক্ষোভ, আমাদেরতো এতো প্রেসারে পড়ার কথা ছিল না। আমরা প্রেসার নিয়ে ফেলেছি। বেশ কয়েকবার বিপদেও পড়তে হয়েছে, যা ছিল অপ্রত্যাশিত। তবে আগেই বলেছি এটা বিশ্বকাপ। এখানে সব পরিস্থিতিই মোকাবেলা করতে হবে। কিছু হতাশাজনক ঘটনাও ঘটেছে। যা কাম্য ছিল না।’

উল্লেখ্য, কাতার বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনা গোল দিয়ে এরপর হেরেছে, ২ গোলে লিড নিয়েও ৯০ মিনিটে জিততে পারেনি। এবার কি সেই পথে হাঁটবে।