কেরানীগঞ্জের বিশেষ কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভারতে পলাতক শেখ হাসিনার বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের একটি দাঁত রহস্যজনকভাবে ভেঙে গেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। তবে এমন অভিযোগ ফালতু জানিয়ে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোহাম্মদ মোতাহের হোসেন নয়া দিগন্তের কাছে দাবি করেছেন, ‘হি ইজ ফাইন’।
এক শ্রেণীর দুর্বৃত্ত বাইরে থেকে কৌশলে কিছুদিন পরপর এই ধরনের গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমরা তাদেরকে ফাইন্ড আউট করার চেষ্টা করছি। তবে এখনো ওই চক্রের সন্ধান আমরা বের করতে পারিনি। শুধু সালমান এফ রহমানের বিষয়ে নয়, অন্যান্য কারাগারেও আটক আলোচিত বন্দীদের নিয়ে একইভাবে ওই চক্রটি প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছে।
গতকাল শুক্রবার দুপুরের পরপরই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারে আটক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার অন্যতম সহযোগী সালমান এফ রহমানের দাঁত কারাগারে আটক অন্য এক বন্দী ঘুষি মেরে ভেঙে ফেলেছে। কিভাবে, কারা ভেঙেছে তা জানতে নানাভাবে চেষ্টা চালানো হয়। তবে রাত ৮টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওই কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার, জেলারসহ অন্যান্য কর্মকর্তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেও সালমান এফ রহমানের দাঁত ভাঙার খবরের সত্যতা জানা সম্ভব হয়নি।
কারাগার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিশেষ কারাগারে আটক বন্দীদের মধ্যে যেসব আলোচিত বন্দী রয়েছেন তারা প্রায়ই একে অপরের সাথে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কার কি ভূমিকা, কে কত টাকা মেরেছে, কে বেশি সুবিধা নিয়েছিল, কার কী প্রভাব ছিল এসব নিয়ে তর্কবিতর্ক ছাড়াও নানা ইস্যুতে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ আবার কথা বলার ফাঁকে সেলের মধ্যেই একে অপরের দিকে তেড়ে যান। কোনো কোনো সময় হাতাহাতিতে লিপ্ত হওয়ারও ব্যর্থ চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। হয়তো কারা কর্তৃপক্ষের অগোচরে ভিআইপি বন্দীদের মধ্যে এমন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটতে পারে বলে সূত্রগুলো মনে করছে। তবে এসব ঘটনাগুলোকে একেবারেই হাস্যকর ও গুজব বলে অভিহিত করেছেন কেরানীগঞ্জ বিশেষ কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মোহা: তায়েফ উদ্দিন মিয়া।
গতকাল সন্ধ্যার পর সিনিয়র জেল সুপার তায়েফ উদ্দিন মিয়ার সাথে যোগাযোগ করে সালামান এফ রহমানের দাঁত ভাঙার বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, না, না, এসব কে বলছে ? এ রকম কোনো ঘটনাই তো ঘটেনি। এখন পর্যন্ত এসবই গুজব। উনি তো কালকেও কারাগার থেকে ভার্চুয়াল কোর্ট করেছেন।
এক প্রশ্নের উত্তরে সিনিয়র জেল সুপার নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমানে তার এই বিশেষ কারাগারে মোট ১৯৯ জন ডিভিশনপ্রাপ্ত বিশেষ বন্দী আটক আছেন। প্রতি সেলে চারজন করে বন্দী অবস্থান করছে। বন্দীদের সবাই সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের মন্ত্রী, এমপি পদমর্যাদার। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন- সালমান এফ রহমান, আনিসুল হক, পলক, কাজী জাফর উল্লাহ, সাধন চন্দ্র মজুমদার, টিপু মুন্সী, সাবেক মেয়র আতিক। এখানে ন্যূনতম এমপি পর্যায়ের বন্দী রয়েছেন জানিয়ে তিনি আরো বলেন, এ ছাড়া পুলিশের সাবেক কিছু কর্মকর্তা আছেন। তারমধ্যে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান মিয়া, ইকবাল বাহার ও সাইফুল ইসলাম অন্যতম। আপনার কারাগারে ভিআইপি এসব বন্দীদের মধ্যে কারা কারা অসুস্থ জানতে চাইলে তিনি বলেন, যারা আছে তারা তো সবাই সিনিয়র সিটিজেন। প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু শারীরিক সমস্যা আছেই। সেই অনুযায়ী তাদেরকে ডাক্তারদের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা দেয়া হয়ে থাকে। এখন পর্যন্ত তাদের খাবার দাবারসহ অন্য কোনো ধরনের সমস্যা নাই বলে জানান তিনি।
এর আগে গতকাল সন্ধ্যার পর আইজি প্রিজন্স সৈয়দ মোহাম্মদ মোতাহের হোসেনের সাথে যোগাযোগ করে সালমান এফ রহমানের দাঁত ভাঙার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, এটা শুধু একটা প্রপাগান্ডা ছাড়া আর কিছুই না। আমি যতটুকু জানি, হি ইজ ফাইন। তার দাঁত ভাঙেনি। এরপর তিনি বলেন, এ বিষয়টি জানতে আমার কাছে আরো একজন একটি ক্ষুদেবার্তা দিয়ে জানতে চেয়েছেন। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এরআগে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে আটক এমপি মমতাজকে তার সেলের মধ্যেই অপর একজন বন্দী লাথি মেরে ফেলে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছিল। পরে বিষয়টির সত্যতা জানতে খোঁজ নিলাম। ওই কারাগারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আমাকে জানালেন, এটা সত্য নয়। শুধু তাই নয়, দুই দিন আগে একই কারাগার থেকে জামিনে বের হয়েছেন সুরভী নামে একজন নারী বন্দী। তাকেও নাকি তার লকাপে ঢুকে কে বা কারা পিটাইছে। এটারও কোনো সত্যতা পেলাম না। কারা এসব ছড়াচ্ছে জানতে চাইলে- আইজি প্রিজন্স বলেন, আমরা এ গুজবগুলো ফাইন্ড আউট করার চেষ্টা করছি। আর আমি এ ব্যাপারে বক্তব্য দিলে তো ওই চক্রটি মনে মনে ভাবে তাদের মিশন সাকসেস হয়েছে।
তবে কারাগার সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা সম্প্রতি নয়া দিগন্তের এই প্রতিবেদকের কাছে নাম না প্রকাশের শর্তে বিশেষ বন্দীদের বিষয়ে কথা বলার সময় বলেছিলেন, বিশেষ কারাগারে আটক ভিআইপি বন্দীদের মধ্যে কয়েকজন বন্দী আছেন তারা প্রতিনিয়ত বেসামাল আচরণ করেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে বাজে আচরণ করেন। এর মধ্যে সাবেক এমপি কামাল আহমেদ মজুমদার এবং পুরান ঢাকার আলোচিত সমালোচিত সাবেক এমপি হাজী মো: সেলিম। এই দু’জনের চিল্লাচিল্লিতে প্রতিনিয়ত কারাগারের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা আতঙ্কের মধ্যে থাকেন। এর মধ্যে হাজী সেলিম তো কথা বলতে পারেন না। তারপরও তিনি হাত তুলে অনেক সময় তার সেবাদানকারী কারারক্ষী ও সেবকদের ওপর আক্রমণের চেষ্টা করেন বলে জানান তিনি। গত সপ্তাহে কামাল আহমেদ মজুমদার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ প্রসঙ্গে আইজি প্রিজন্স বলেন, তার স্বাস্থ্যর অবস্থা অত্যন্ত ক্রিটিক্যাল।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নদীপথে পালানোর সময় প্রথম যে দু’জন মন্ত্রী এবং উপদেষ্টা গ্রেফতার হয়েছিলেন তাদের মধ্যে একজন সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং অন্যজন ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান।



