শাহ আলম নূর
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নতুন এক সঙ্কট ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বেসরকারি খাতে চাকরির সুযোগ কমে আসছে, অথচ প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করছেন। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে চাকরি পাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতিতে তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে বেকারত্বের হার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও তরুণদের মধ্যে (১৫-২৯ বছর বয়সী) বেকারত্বের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ ‘নিয়োজিত নয়, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণেও নেই’ এমন অবস্থায় রয়েছে, যার হার ৩০ শতাংশের কাছাকাছি বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃত বেকারত্বের চিত্র আরো উদ্বেগজনক, কারণ অনেকেই অপ্রতুল বা অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে যুক্ত থাকলেও তা তাদের যোগ্যতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে ‘আন্ডার এমপ্লয়মেন্ট’ বা অপ্রতুল কর্মসংস্থানের হার বাড়ছে।
তথ্যে দেখা যায়, চাকরি সৃষ্টির প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত বেসরকারি খাত বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সঙ্কট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সঙ্কট এবং ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার সব মিলিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণে অনীহা তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে।
এদিকে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন নিয়োগ দেয়া তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান কর্মী ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমানে শিল্প খাতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। বিদ্যুৎ ও গ্যাসসঙ্কটের কারণে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় নতুন বিনিয়োগ বা নিয়োগ বাড়ানো কঠিন। তিনি বলেন, তৈরী পোশাক খাত দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত এবং কর্মসংস্থানের অন্যতম উৎস, সেখানেও প্রবৃদ্ধির গতি কমে এসেছে। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির কারণে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় নতুন অর্ডার কম এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়েছে বা আংশিক বন্ধ রেখেছে, এর প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানে।
বিজিএমইএ এর তথ্যে দেখা যায়, গত এক বছরে কয়েক ডজন কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বা উৎপাদন সীমিত করেছে। এতে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন, যদিও সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন।
এদিকে আইটি ও স্টার্টআপ খাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে এই খাতকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা হচ্ছিল, সেখানে সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় নতুন নিয়োগ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেক স্টার্টআপ খরচ কমাতে কর্মী ছাঁটাই করেছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে কাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা অনেক শিক্ষার্থীর দক্ষতা শিল্প খাতের প্রয়োজনের সাথে মিলছে না। তিনি বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো চাকরিমুখী দক্ষতা তৈরিতে পিছিয়ে আছে। কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার ওপর জোর না বাড়ালে এ সঙ্কট আরো তীব্র হবে।
তিনি আরো বলেন, শুধু বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করে কর্মসংস্থান সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সরকারেরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে, বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তার মাধ্যমে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতের উচ্চ সুদহারও বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঋণের সুদহার ১২ থেকে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা অনেক উদ্যোক্তার জন্য বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে। ফলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার হার কমছে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, ব্যবসা করতে গেলে এখন অনেক বেশি মূলধন লাগে। কিন্তু ঋণের খরচ এত বেশি যে নতুন প্রকল্প নেয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। ফলে নিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা স্থগিত হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের মধ্যে সরকারি চাকরির প্রতি ঝোঁক আরো বেড়েছে। কিন্তু সেখানে সুযোগ সীমিত হওয়ায় প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে। একটি সরকারি চাকরির বিপরীতে হাজার হাজার আবেদন জমা পড়ছে, যা চাকরিপ্রার্থীদের হতাশা বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবেলায় বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি জোরদার করতে হবে, যাতে তরুণরা নতুন প্রযুক্তি ও শিল্পের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রফতানি খাত বহুমুখীকরণ এবং নতুন খাত যেমন আইটি, ফার্মাসিউটিক্যালস, কৃষি-প্রসেসিং খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সাথে উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ বাড়ানো গেলে তরুণদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তরুণদের একটি বড় অংশ ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন ব্যবসা বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হওয়ার দিকে ঝুঁকছেন। তবে এসব খাতেও স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার অভাব রয়েছে।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তাহলে এই চাকরি সঙ্কট ভবিষ্যতে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যায় রূপ নিতে পারে। তরুণ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে না পারলে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ সুবিধা হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তারা বলছেন, বেসরকারি খাতে চাকরি সঙ্কট এখন দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।



