ব্যাংক খাতে ঋণের ক্ষত দূর করতে ‘লিড ব্যাংক’ মডেল

দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও অনিয়মের জাল বিস্তারকারী ছয়টি শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে উদ্ধার করতে ‘লিড ব্যাংক’ মডেল অনুসরণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এস আলম, সাইফুজ্জামান চৌধুরী, বেক্সিমকো, সিকদার গ্রুপ, নাসা ও ওরিয়ন গ্রুপের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা এবং তদারকি জোরদার করতে নির্দিষ্ট কিছু অভিজ্ঞ ব্যাংককে দায়িত্ব দেয়ার এই রূপরেখা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও অনিয়মের জাল বিস্তারকারী ছয়টি শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে উদ্ধার করতে ‘লিড ব্যাংক’ মডেল অনুসরণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এস আলম, সাইফুজ্জামান চৌধুরী, বেক্সিমকো, সিকদার গ্রুপ, নাসা ও ওরিয়ন গ্রুপের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা এবং তদারকি জোরদার করতে নির্দিষ্ট কিছু অভিজ্ঞ ব্যাংককে দায়িত্ব দেয়ার এই রূপরেখা তৈরি হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক ও শিল্পগোষ্ঠীর চিত্র : প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নির্দিষ্ট কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর ঋণের চাপে পিষ্ট হচ্ছে দেশের প্রধান সারির বেশ কয়েকটি ব্যাংক। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক (বাংলাদেশ) লিমিটেড, জনতা ব্যাংক এবং আইএফআইসি ব্যাংক একাধিক গ্রুপের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ছয় গ্রুপের প্রভাববলয় : এস আলম গ্রুপ : এদের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংক (বাংলাদেশ) লিমিটেড, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকসহ এক ডজন প্রতিষ্ঠান।

বেক্সিমকো গ্রুপ : জনতা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকে এই গ্রুপের ঋণের বড় অংশ আটকে আছে।

সাইফুজ্জামান চৌধুরী : ইসলামী ব্যাংক ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) তার প্রভাববলয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।

সিকদার গ্রুপ : ন্যাশনাল ব্যাংক ও এবি ব্যাংক তাদের প্রধান টার্গেট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

লিড ব্যাংক নির্বাচনের বিশেষ ক্রাইটেরিয়া : ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর সমস্যা নিরসনে কোন ব্যাংক ‘নেতৃত্ব’ দেবে, তার জন্য কিছু কঠোর শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমত, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক: যে ব্যাংকগুলো নির্দিষ্ট গ্রুপের দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের মধ্য থেকেই লিড ব্যাংক নির্বাচন। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: যে ব্যাংকগুলো ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে এনডিএ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে বা করছে, তাদের অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। তৃতীয়ত, একীভূতকরণ বর্জন : যেসব ব্যাংক ইতোমধ্যে অন্য ব্যাংকের সাথে একীভূত হওয়ার তালিকায় আছে, তাদের লিড ব্যাংক হিসেবে রাখা হচ্ছে না। চতুর্থত, বেসরকারি ব্যাংকের গুরুত্ব : যদি কোনো গ্রুপের সব ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক সরকারি হয়, তবে অভিজ্ঞতার স্বার্থে পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত বেসরকারি ব্যাংকটিকেও নেতৃত্বে রাখা হবে।

গ্রুপভিত্তিক নির্বাচিত ‘লিড ব্যাংক’ তালিকা

বিশেষ এই তদারকিপ্রক্রিয়ায় প্রতিটি গ্রুপের জন্য নির্দিষ্ট ব্যাংককে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে: এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক (ইউ) লিমিটেড, জনতা ব্যাংক, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসিকে দেয়া হয়েছে- এস আলম গ্রুপ, ইসলামী ব্যাংক (ইউ) লিমিটেড, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (টঈই), আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংককে দেয়া হয়েছে- সাইফুজ্জামান চৌধুরী, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক এর দায়িত্বে রয়েছে-বেক্সিমকো গ্রুপ, ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড ও আইএফআইসি ব্যাংক হলো সিকদার গ্রুপের, ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিড ব্যাংক হলো- নাসা গ্রুপের, অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের দায়িত্বে পড়েছে- ওরিয়ন গ্রুপ এর।

বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ : সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এই লিড ব্যাংকগুলো সংশ্লিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীগুলোর ঋণের প্রকৃত অবস্থা নিরূপণ, জামানত যাচাই এবং অর্থ উদ্ধারে বিশেষ সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করবে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে এই ব্যাংকগুলো কতটুকু সফল হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশের ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা।

বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক (বাংলাদেশ) লিমিটেড এবং জনতা ব্যাংককে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপের লিড ব্যাংক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, যা তাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর তদারকি ও এই লিড ব্যাংকগুলোর স্বচ্ছতাই পারে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে।

এই ‘লিড ব্যাংক’ মডেলের মাধ্যমে বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলোর ঋণের জাল থেকে ব্যাংক খাতকে উদ্ধারের এই প্রচেষ্টার ফলাফল দ্বিমুখী হতে পারে। একদিকে যেমন এটি শৃঙ্খলা ফেরানোর সুযোগ তৈরি করবে, অন্যদিকে বাস্তবায়নে রয়েছে ব্যাপক ঝুঁকি।

সম্ভাব্য ইতিবাচক সম্ভাবনা

জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ : প্রতিটি গ্রুপের জন্য নির্দিষ্ট ‘লিড ব্যাংক’ থাকায় ওই গ্রুপের ঋণের তথ্য গোপন করা বা দায় এড়ানোর সুযোগ কমে যাবে। একটি কেন্দ্র থেকে তদারকি হওয়ার ফলে ঋণের প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠবে।

সম্পদ পুনরুদ্ধার : আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যাংকগুলো লিড ব্যাংক হওয়ায় তারা পেশাদারিত্বের সাথে জামানত বাজেয়াপ্ত বা আইনিপ্রক্রিয়া দ্রুত করতে পারবে।

আমানতকারীদের আস্থা বৃদ্ধি : বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর অনিয়ম ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন শক্তিশালী ব্যাংকগুলোকে দায়িত্ব দেয়, তখন সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে ব্যাংক খাতের ওপর আস্থা কিছুটা হলেও ফিরে আসতে পারে।

সমন্বিত আইনি পদক্ষেপ : আলাদা আলাদা ব্যাংক মামলা না করে লিড ব্যাংকের নেতৃত্বে সম্মিলিত আইনি ব্যবস্থা নিলে খেলাপিদের ওপর চাপ বাড়বে এবং আইনি মারপ্যাঁচ এড়ানো সহজ হবে।

নেতিবাচক বা ঝুঁকিপূর্ণ দিক

লিড ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত চাপ : ইসলামী ব্যাংক বা জনতা ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই এখন তারল্য সঙ্কটে বা অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জর্জরিত। তাদের ওপর আবার তিনটি ভিন্ন গ্রুপের (যেমন: এস আলম, বেক্সিমকো) তদারকির দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে তাদের নিজস্ব ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।

স্বার্থের সঙ্ঘাত : লিড ব্যাংক হিসেবে নির্বাচিত অনেক ব্যাংক নিজেই হয়তো ওই গ্রুপের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত। সে ক্ষেত্রে তদারকি করতে গিয়ে তারা নিজেদের পাওনা আগে আদায়ের চেষ্টা করতে পারে, যা অন্য ছোট ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর স্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাধা : এই ছয়টি গ্রুপের মালিকরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। ব্যাংকগুলো যখন কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাবে, তখন রাজনৈতিক চাপ বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পুরো প্রক্রিয়াটি ধীর হয়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে।

আইনি দীর্ঘসূত্রতা : লিড ব্যাংক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়ায় ঋণের টাকা ফেরত আনা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। রিট বা স্থগিতাদেশের মাধ্যমে প্রভাবশালী গ্রুপগুলো এই প্রক্রিয়াকে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখতে পারে।

ব্যাংক খাতের কাঠামোগত প্রভাব : দুর্বল ব্যাংকের বিলুপ্তি বা একীভূতকরণ : এই প্রক্রিয়ায় যদি দেখা যায় কোনো কোনো ব্যাংক পুরোপুরি দেউলিয়া হওয়ার পথে, তবে এই লিড ব্যাংক মডেলের মাধ্যমেই তাদের অন্য ব্যাংকের সাথে একীভূত করার প্রক্রিয়া সহজতর হবে।

ঋণ বিতরণে নতুন মানদণ্ড : এই উদ্যোগের ফলে ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলো একক কোনো বড় গ্রুপকে বড় অঙ্কের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হবে। এটি ‘সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার লিমিট’ বা একক গ্রাহক ঋণসীমা কঠোরভাবে পালনে সহায়তা করবে।

করণীয় : এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি ও কঠোর সমর্থনের ওপর। যদি লিড ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় আইনি ক্ষমতা ও নিরাপত্তা না পায়, তবে এই উদ্যোগটি কেবল একটি ‘কাগুজে প্রক্রিয়া’ হিসেবেই থেকে যাবে। পাশাপাশি, এই গ্রুপগুলোর বিদেশে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনতে ‘লিড ব্যাংক’গুলোর সাথে দুদকের ও বিএফআইইউর ঘনিষ্ঠ সমন্বয় থাকা জরুরি।