ফিরে দেখা জুলাই ’২৪

রাষ্ট্রীয় শোক প্রত্যাখ্যান, লাল কাপড়ে প্রতিবাদ

Printed Edition
রাষ্ট্রীয় শোক প্রত্যাখ্যান, লাল কাপড়ে প্রতিবাদ
রাষ্ট্রীয় শোক প্রত্যাখ্যান, লাল কাপড়ে প্রতিবাদ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

২০২৪ সালের ২৯ জুলাই ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিন। আগের দিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে ডিবি কার্যালয়ে আটকে রেখে বক্তব্য পাঠ করানোর অভিযোগে দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সেই ক্ষোভ থেকেই সরকার ঘোষিত রাষ্ট্রীয় শোক প্রত্যাখ্যান করে মুখে ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে প্রতিবাদের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন আন্দোলনের সমন্বয়করা। রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কর্মসূচিটি ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থী, বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ এবং অনেক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব লাল কাপড় বেঁধে ছবি প্রকাশ করে সংহতি জানান।

এ দিকে মন্ত্রিসভা কোটা আন্দোলন ঘিরে নিহতদের স্মরণে ৩০ জুলাই দেশব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোক পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। কালো ব্যাজ ধারণ, মসজিদে বিশেষ দোয়া এবং অন্যান্য উপাসনালয়ে প্রার্থনার ঘোষণা দেয়া হলেও আন্দোলনকারীরা দাবি করেন, বিচারহীন অবস্থায় রাষ্ট্রীয় শোক গ্রহণযোগ্য নয়। একইসঙ্গে তারা তাদের পূর্বঘোষিত ৯ দফা দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেন।

দিনজুড়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুমিল্লা, সিলেট, বরিশাল, যশোর, বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, নোয়াখালী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। রাজধানীর পল্টন, সেগুনবাগিচা, সায়েন্সল্যাব, ইসিবি চত্বর, মিরপুর-১০সহ বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের জমায়েতে পুলিশ বাধা দেয়, লাঠিচার্জ ও ধাওয়া করে এবং বহু শিক্ষার্থীকে আটক করে। চট্টগ্রামে কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়, কুমিল্লায় এক শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হন এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে।

যদিও অফিস-আদালত ও যান চলাচল অনেকটাই স্বাভাবিক ছিল, তবুও দেশজুড়ে টানা ১০ম দিনের মতো কারফিউ বহাল থাকে। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের কড়া নিরাপত্তা, চেকপোস্ট এবং হেলিকপ্টার টহল ছিল চোখে পড়ার মতো।

সে দিন আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ডিবি কার্যালয়ে আটকে রাখা সমন্বয়কদের ছবি প্রকাশ নিয়ে তীব্র বিতর্ক। হাইকোর্টে এ বিষয়ে রিটের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যের জবাবে আদালত মন্তব্য করেন, ‘জাতিকে নিয়ে মশকরা কইরেন না।’ আদালত সমন্বয়কদের মুক্তি এবং আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি না চালানোর নির্দেশনা চেয়ে করা আবেদনের শুনানিতে এ মন্তব্য করেন, যা সেদিন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

একই দিনে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে আইনজীবী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উদ্যোগে ‘জাতীয় গণতদন্ত কমিশন’ গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়। কমিশনের উদ্দেশ্য ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত হত্যা, গুলিবর্ষণ, গুম, গ্রেফতার, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তথ্য সংগ্রহ এবং সত্য উদ্ঘাটন। একইসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), গণতন্ত্র মঞ্চ, ৭৪ বিশিষ্ট নাগরিক এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষক স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত, গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি, গুম-নির্যাতন বন্ধ এবং শিক্ষার্থী হত্যার বিচার দাবি করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার সামনে নিপীড়নবিরোধী শিক্ষকদের সমাবেশে শিক্ষার্থী হত্যার বিচার, কারফিউ প্রত্যাহার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া এবং আন্দোলনের যৌক্তিক দাবিগুলো বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসের শিক্ষকও এসব দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও দিনটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। রাতে গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ১৪ দলের বৈঠকে জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্য হয়। বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানান, দেশবিরোধী অপশক্তিকে প্রতিহত করার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

অন্য দিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকার ঘোষিত নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের সাথে সরকারি হিসাবের অসামঞ্জস্যের কথা উল্লেখ করেন।

সব মিলিয়ে ২৯ জুলাই ছিল এমন এক দিন, যখন এক দিকে রাষ্ট্রীয় শোকের ঘোষণার বিপরীতে লাল কাপড় বাঁধা প্রতিবাদ আন্দোলনের নতুন প্রতীকে পরিণত হয়, অন্য দিকে ডিবিতে সমন্বয়কদের আটকে রাখার ঘটনা, হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, দেশব্যাপী বিক্ষোভ, গণতদন্ত কমিশন গঠন এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো জুলাই আন্দোলনের গতিপথকে আরো গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নিয়ে যায়।