নজরুল ইসলাম সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)
চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণ অধিকার পরিষদসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছেন। এ আসনে বিএনপি থেকে আসলাম চৌধুরী এফসিএ, জামায়াত থেকে আনোয়ার ছিদ্দিক চৌধুরী, ইসলামী আন্দোলন থেকে মাওলানা কারি দিদারুল মাওলা, গণ অধিকার পরিষদ থেকে এ টি এম পারভেজ, ইসলামিক ফ্রন্ট থেকে মো: সিরাজুদ্দৌলা, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি থেকে শহীদুল ইসলাম চৌধুরী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি থেকে মছিউদদৌলা, গণসংহতি আন্দোলন থেকে জাহিদুল আলম, নেজামে ইসলাম পার্টি থেকে জাকারিয়া খালেদ মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
প্রার্থীরা এখন প্রচার-প্রচারণায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। যাচ্ছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। নানা রকম প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছেন। গ্রাম-গঞ্জের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে উপজেলার সর্বত্র পর্যন্ত এখন প্রার্থীদের নিয়ে নানান হিসাবনিকাশ করছেন ভোটাররা। তবে এ আসনে বিএনপি-জামায়াতের শক্ত সাংগঠনিক অবস্থান থাকলেও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর তেমন কোনো দৃঢ় সাংগঠনিক অবস্থান নেই বললেই চলে। সেই মতে এখানে মূলত লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যেই। বিএনপির ভরসা গণভিত্তি আর জামায়াতের রয়েছে তরুণ প্রজন্ম, নারী ভোটার ও সুশৃঙ্খল কর্মী বাহিনী। অন্য দিকে অন্য দলগুলোর ভাবনা, ভোটাররা এবার ভোটদানের সুযোগ পেলে প্রচলিত রাজনীতির বাইরে গিয়ে তাদেরকে মূল্যবান করবে। এ ক্ষেত্রে তারা সাধারণ ভোটারদের ভোট পাবেন বলে আশাবাদী।
চট্টগ্রামের প্রবেশ দ্বার ও শিল্পাঞ্চলখ্যাত সীতাকুণ্ড আসনটি রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ গুরুত্ব বহন করে। অতীত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ আসন থেকে যে দলই জিতে সেই দলই সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যায়। সেই হিসাবে আসনটিকে আলাদা গুরুত্ব দেয় সব রাজনৈতিক দলই।
উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এবং চট্টগ্রাম সিটির আকবর শাহ ও পাহাড়তলীর আংশিক এলাকা নিয়ে এই আসন গঠিত। এখানকার মোট ভোটার চার লাখ ২৭ হাজার ২০৬ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার সংখ্যা হলো দুই লাখ দুই হাজার ৩৬৪ জন।
এই আসনে মূলত বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। এখানে বিএনপির রয়েছে ব্যাপক গণভিত্তি ও সমর্থন। বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরী ব্যক্তি হিসেবেও ব্যাপক জনপ্রিয়। তিনি ২০০৪ সাল থেকে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে সাবেক মন্ত্রী মরহুম এল কে সিদ্দিকীর বিপরীতে অগোছালো দলকে দারুণভাবে সংগঠিত করে রেখেছেন। এল কে সিদ্দিকীর মৃত্যুর পর সীতাকুণ্ডের বিএনপিতে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন তিনি।
তবে, বিএনপি প্রাথমিক পর্যায়ে আসলাম চৌধুরীকে মনোনয়ন না দিয়ে উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কাজি সালাউদ্দিনকে মনোনয়ন দিয়েছিল। এর প্রতিবাদে আসলামপন্থীরা ব্যাপক বিক্ষোভ মিছিল ও মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে করে সীতাকুণ্ডে বিএনপি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। পরে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় আসলাম চৌধুরীকেই মনোনয়ন দেয়া হয়। আসলাম চৌধুরীরকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়াতে এখন সালাউদ্দিনপন্থীরা ক্ষুব্ধ ও হতাশ। এ মনোনয়নকে কেন্দ্র করে বর্তমানে বিএনপির মধ্যে কিছুটা বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। আসলাম চৌধুরী মনোনয়ন পাওয়ার পর কাজি সালাউদ্দিনকে ফোন করে নিজ বাড়িতে নেতাকর্মীদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠানে দাওয়াত করলে তিনি আসেননি। তিনি এলে হয়তো বিষয়টি সুন্দর হতো। অনেকে মনে করছেন, এ বিভাজন নির্বাচনেও কিছুটা প্রভাব ফেলবে।
উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ডা: কমল কদর ও পৌর বিএনপি নেতা শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, আসলাম চৌধুরীকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দিয়ে দল সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে। দলে এখন কোনো বিভক্তি নেই। তবে, কেউ করতে চাইলেও আসলাম চৌধুরীর জনপ্রিয়তার কাছে তা টিকবে না।
অন্য দিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার ছিদ্দিকের রয়েছে ব্যাপকহারে পারিবারিক ও ব্যক্তি ইমেজ। ছাত্রশিবিরের রাজনীতি থেকে উঠে আসা এই তরুণ রাজনীতিবিদ বর্তমানে উত্তর জেলা জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন। আনোয়ার ছিদ্দিক চৌধুরী বলেন, জুলাই বিপ্লবের পর তরুণ প্রজন্ম যে পরিবর্তন চাচ্ছে তা ধারণ করছে জামায়াতে ইসলামী দলটি। এ ছাড়াও নারী ভোটার ও দলের সুশৃঙ্খল কর্মী বাহিনী এবারের নির্বাচনে যাবতীয় হিসাবনিকাশ পাল্টে দিতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এখানে বিএনপির প্রার্থী জটিলতার কারণে ভোটারদের মধ্যে কিছুটা বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে। সে ক্ষেত্রে জামায়াত প্রার্থী কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। এ দলে কোনো গ্রুপিং-লবিং নেই। ৫ আগস্টের পর থেকে জামায়াতের নেতাকর্মীরা দাঁড়িপাল্লার পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টির লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে পাড়া মহল্লায় কাজ করে যাচ্ছেন।
এ ছাড়াও জামায়াতের প্রতিটি ওয়ার্ডে রয়েছে দলীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটি; কিন্তু বিএনপি সে দিক থেকেও নাজুক অবস্থায় আছে। তাদের উপজেলা কমিটি থেকে শুরু করে ওয়ার্ড কমিটিরও পূর্ণাঙ্গ কোনো কমিটি নেই। বিএনপি প্রার্থী দলের সাংগঠনিক ভিত্তি ও শৃঙ্খলা দ্রুত সময়ের মধ্যে যদি ফিরিয়ে আনতে না পারেন তাহলে নির্বাচনের মতো কঠিন খেলায় শেষ পর্যন্ত টিকে থাকাটা কঠিন হয়ে যাবে।



