বুকব্যথা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা কিংবা হঠাৎ তীব্র ভয়- এসব উপসর্গকে অনেক সময় অ্যাংজাইটি (উদ্বেগ) বা প্যানিক অ্যাটাক বলে মনে করা হয়। কিন্তু একই ধরনের উপসর্গ প্রাণঘাতী হার্ট অ্যাটাকেরও সঙ্কেত হতে পারে। ফলে শুধু অ্যাংজাইটি ভেবে হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা নিতে দেরি করলে জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, হার্ট অ্যাটাক ও প্যানিক অ্যাটাকের উপসর্গের মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। এ কারণেই ভুলটি হয় এবং বিপদ বাড়ে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া শুধু উপসর্গ দেখে দু’টি অবস্থাকে আলাদা করা কঠিন। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের উপসর্গ অনেক সময় প্রচলিত ধারণার চেয়ে ভিন্ন হওয়ায় ভুল হওয়ার ঝুঁকি বেশি বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন। তারা বলছেন, নিজে নিজে সিদ্ধান্ত না দিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে এলে মৃত্যুঝুঁকি অনেক কমে যায়।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়ের কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা: ডি এম এম ফারুক ওসমানী বলেন, ‘অ্যাংজাইটি থেকে বুকে ব্যথা হতে পারে। এই ব্যথা হঠাৎ করে শুরু হতে পারে এবং এর সাথে হাত-পা কাঁপা, ঘাম হওয়া, মাথা ঘোরানো, দ্রুত হৃদস্পন্দন ও তীব্র ভয় কাজ করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের মধ্যে এসব উপসর্গ তীব্র হয়ে আবার কমে যেতে পারে। অন্য দিকে হার্ট অ্যাটাকের ব্যথা বুকের ওপর চাপ বা ভারী কিছু চেপে থাকার মতো অনুভূত হয়। ব্যথা বুক থেকে পিঠ, ঘাড়, চোয়াল কিংবা এক বা দুই হাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর সাথে শ্বাসকষ্ট, ঠাণ্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরানো ও অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। ব্যথা কয়েক মিনিটের মধ্যে চলে না গিয়ে স্থায়ী হতে পারে বা ধীরে ধীরে তীব্র হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘হার্ট অ্যাটাকের আগে কয়েক দিন ধরেও কিছু অস্পষ্ট সতর্ক সঙ্কেত দেখা দিতে পারে। অস্বাভাবিক ক্লান্তি, বদহজম বা শারীরিক দুর্বলতার মতো উপসর্গকে অনেকে সাধারণ সমস্যা হিসেবে এড়িয়ে যান। শারীরিক পরিশ্রম, তীব্র রাগ বা বড় ধরনের মানসিক চাপের পর এসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে।’
নারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি : হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে নারীদের উপসর্গ বিশেষভাবে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। পুরুষদের ক্ষেত্রে বুকে তীব্র ব্যথা ও বুক চেপে ধরার মতো উপসর্গ বেশি পরিচিত হলেও নারীদের ক্ষেত্রে বমি বমি ভাব, বমি, অতিরিক্ত ক্লান্তি, কাঁধে ব্যথা, মাথা ঘোরানো কিংবা অ্যাংজাইটির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। জার্নাল অব দ্য অ্যামেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-জামা গবেষণার (২০১২ সালে প্রকাশিত) তথ্য অনুযায়ী, ‘হার্ট অ্যাটাক হওয়া নারীদের প্রায় ৪২ শতাংশের ক্ষেত্রে বুকব্যথা ছিল না। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল প্রায় ৩১ শতাংশ। একই গবেষণায় হাসপাতালে মৃত্যুর হারও নারীদের মধ্যে বেশি প্রায় ১৫ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে ছিল ১০ শতাংশ।
অ্যাংজাইটি হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে : বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এ কারণে যে অ্যাংজাইটি বা উদ্বেগ শুধু হার্ট অ্যাটাকের উপসর্গের সাথে মিলে যায় এমন নয় বরং দীর্ঘস্থায়ী অ্যাংজাইটি হৃদ্রোগের ঝুঁকির সাথে সম্পর্কিত। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ২০১০ সালের আড়াই লাখ মানুষের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, উদ্বেগজনিত সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের করোনারি হৃদ্রোগের ঝুঁকি প্রায় ২৬ শতাংশের বেশি। হৃদ্রোগের অন্যতম প্রধান কারণ অ্যাথেরোস্কে¬রোসিস। এ অবস্থায় ধীরে ধীরে ধমনির দেয়ালে চর্বি, কোলেস্টেরল ও অন্যান্য পদার্থ জমে প্ল্যাক তৈরি হয়। কোনো স্থানের প্ল্যাক ভেঙে গিয়ে রক্ত জমাট বাঁধলে হৃদ্যন্ত্রে রক্ত ও অক্সিজেনের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
কখন দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে : এ ব্যাপারে ডা: ডি এম এম ফারুক ওসমানী বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো নতুন ধরনের বুকব্যথা বা আগের তুলনায় ভিন্ন কোনো উপসর্গকে নিজে থেকে গ্যাস, উদ্বেগ বা প্যানিক অ্যাটাক ধরে নেয়া উচিত নয়। বিশেষ করে বুকের চাপ বা ভারী অনুভূতি, ব্যথা হাত-চোয়াল-পিঠে ছড়িয়ে পড়া, শ্বাসকষ্ট, ঠাণ্ডা, ঘাম, বমি বমি ভাব কিংবা মাথা ঘোরা থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেয়া জরুরি। কারণ প্যানিক অ্যাটাক ও হার্ট অ্যাটাকের পার্থক্য নিশ্চিত করতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে হতে পারে।’ এ ক্ষেত্রে কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপিকে (সিবিটি) কার্যকর প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা ও হৃদ্স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস উদ্বেগ ও হৃদ্রোগ দুই ক্ষেত্রেই উপকারী। বুকের নতুন বা অস্বাভাবিক ব্যথাকে কখনোই নিজের সিদ্ধান্তে শুধু উদ্বেগ বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা নেয়াই জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোমল পানীয়তে অ্যাসপার্টাম, সুক্রালুজ, অ্যাসেসালফেম পটামিয়াম থাকে। অ্যাসপার্টাম অ্যাথেরোস্কে¬রোসিসের সাথে সম্পর্কিত, এই রোগটি হলে আর্টারিতে রক্ত জমাট বেঁধে রক্ত প্রবাহে বাধা প্রদান করে।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার কার্ডিওভাস্কুলার ও থোরাসিক সার্জন ড. জেরেমি লন্ডনকে উদ্ধৃত করে ডেইলি মেইল বলেছে, শীর্ষ স্থানীয় হার্ট সার্জন ড. জেরেমি লন্ডন ফাস্টফুড, কোমল পানীয় এড়িয়ে চলতে বলেছেন। চিনি রক্তচাপ ও এলডিএল (ক্ষতিকর চর্বি), কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে ধমনীতে রক্ত প্রবাহে বাধা প্রদান করে। এ ছাড়া অতিরিক্ত চিনি রক্তে গ্লুকোজের বাড়িয়ে দেয়, এই বাড়তি গ্লুকোজ শরীরে চর্বি হিসেবে জমা হয় এবং স্থূলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।


