বিএনপির রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী কে হচ্ছেন তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার অবসান হচ্ছে আজ। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই আজ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে তার কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন। আর বিএনপির প্রার্থীই যে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। কারণ সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপির।
জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আজ বেলা ১১টার দিকে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দলের সিনিয়র নেতা ও এমপিদের নিয়ে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি বিএনপির প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী কে হবেন সেটি নিয়ে আলোচনা করবেন। এরপর সবার উপস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট পদে বিএনপি প্রার্থীর ফরম পূরণ করা হবে। প্রস্তাবক ও সমর্থকের স্বাক্ষর নিয়ে এই ফরম পূরণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলে প্রধানমন্ত্রী বিএনপির পক্ষে রাষ্ট্রপতি পদে যিনি প্রার্থী হচ্ছেন, তার নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করবেন। নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী আজ বৃহস্পতিবারই মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন।
জানা গেছে, মনোনয়ন ফরম পূরণ শেষে প্রস্তাবক ও সমর্থকের নেতৃত্বে বিএনপির সংসদীয় দলের সদস্যদের একটি টিম নির্বাচন কমিশন অফিসে সেটি জমা দেবেন। বিএনপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, প্রেসিডেন্ট পদে প্রস্তাবক হিসেবে থাকছেন দলের স্থায়ী কমিটির সিনিয়র একজন সদস্য আর সমর্থক হিসেবে থাকবেন সংসদে সরকারি দলের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপি দলীয় প্রার্থীর মনোনয়ন ফরম কখন জমা দেয়া হবে জানতে চাইলে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নয়া দিগন্তকে জানান, আনুষ্ঠানিক কাজ শেষ করে দ্রুত সময়ের মধ্যেই সেটি নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়া হবে। তিনি বলেন, সময়টি দুপুরের দিকে হতে পারে। এ সময় তিনি জানান, বিএনপির রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী কে হচ্ছেন এটি প্রধানমন্ত্রীই কেবল জানেন। তিনি চূড়ান্ত করার পরই জানা যাবে কে রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হচ্ছেন। আমরা সেই অপেক্ষায় আছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থীর নাম কে ঘোষণা করবেন বা কোথায় ঘোষণা হবে, সেটিও বৃহস্পতিবার জানা যাবে।
সূত্র মতে, দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির প্রার্থী হচ্ছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে গত কয়েক দিন ধরে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মির্জা ফখরুলের পাশাপাশি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ড. আবদুল মঈন খানের নাম নিয়েও দলের শীর্ষপর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নামও আলোচনায় ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুলের নামই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
দলের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এরই মধ্যে এসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছেন। তিনি দলের নেতৃবৃন্দ ছাড়াও সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিধি অনুযায়ী প্রার্থীকে মনোনয়নপত্রে সম্মতিসূচক স্বাক্ষর প্রদান করতে হয়। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট সম্মতিসূচক নথিতে স্বাক্ষর সম্পন্ন করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। যদিও এ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য এখন পর্যন্ত আসেনি। এমনকি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চান না। ইসি থেকে বিএনপির পক্ষে এরই মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য দু’টি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া তার সরকারি বাসভবন হেয়ার রোডের ৩৫ নম্বর বাসার সামনে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। আজ মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর তার বাসায় এসএসএফসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি আরো জোরদার করা হবে বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলীয় নেতাদের মতে, দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে রাজপথের আন্দোলনে ভূমিকা ও কঠিন সময়ে দল পরিচালনার পুরস্কার হিসেবে মির্জা ফখরুলকে দেশের সর্বোচ্চ সম্মানিত পদে আসীন করা হচ্ছে। ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দলের নেতৃত্ব ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। তার রয়েছে বর্ণাঢ্য পারিবারিক ইতিহাস। মির্জা ফখরুল নিজেও তার ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন বিসিএস ক্যাডার হিসেবে সরকারি কলেজের শিক্ষকতা দিয়ে।
ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপি মহাসচিব ছাড়াও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এখন আলোচনা হচ্ছে, তিনি দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি হলে একই সাথে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় শূন্যতা তৈরি হবে। সেগুলো হচ্ছে বিএনপি মহাসচিব পদ, স্থানীয় সরকার বিষয়কমন্ত্রী এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য। ফলে কে হবেন তার উত্তরসূরি, এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। জানা গেছে, দলের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তের আলোকে কাউন্সিলের আগ পর্যন্ত সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এ দিকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় শূন্য হলে এ ক্ষেত্রে নতুন মুখ আসতে পারে। তা ছাড়া স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সাধারণত দলের মহাসচিবকেই বিবেচনা করা হয়। অতীতেও তাই হয়েছে। ফলে রুহুল কবির রিজভী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকারমন্ত্রীও হতে পারেন বলে অনেকেই ধারণা করছেন।
জানা গেছে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য আগে থেকেই সংসদ সদস্য বা মন্ত্রিত্ব পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয় না। তবে কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হলে, তিনি যেদিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে কার্যভার গ্রহণ করবেন, ঠিক সেই দিন থেকেই তার সংসদীয় আসন (এমপি পদ) স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হয়ে যাবে। মন্ত্রিত্ব বা নির্বাহী পদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। জানা গেছে, এখনই আনুষ্ঠানিক পদত্যাগের ঘোষণা দেবেন না মির্জা ফখরুল। শপথ নেয়ার আগ পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবেন।
গত ২৪ জুলাই ২২তম রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন অসুস্থতা দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। এরপর ২০ আগস্ট ভোটের তারিখ রেখে ৬ আগস্ট তফসিল ঘোষণা করে ইসি। এরই মধ্যে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য বিরোধীদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব:) অলি আহমদের নাম চূড়ান্ত করেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। ফলে একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে ৩৫ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট গ্রহণ হবে।
মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন আজ
ইসির তফসিল অনুযায়ী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন হবে। মনোনয়নপত্র জমা দেয়া যাবে ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। ইসি সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতি পদে একই ব্যক্তির নামে দু’টি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেয়ার বিধান আছে। কারণ একটি মনোনয়নপত্রে কোনো ভুলত্রুটি থাকলে যাতে অন্যটি বিবেচনায় নেয়া যায়। সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনের নির্বাচনের সময়ও এমনটা করা হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেন সংসদ সদস্যরা। সচরাচর ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ী হন। বিরোধী দল সাধারণত এ পদে প্রার্থী দেয় না। তাই ভোটাভুটির দরকার হয় না। তবে এবার জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে।
এ দিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, আগামী ২০ আগস্ট বিরতিহীনভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে এ ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো: নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ ভোট দিতে পারবেন না। ভোট দিলে তাদের সদস্য পদ বাতিল হবে।


