বিদায়ী সংবর্ধনায় প্রধান বিচারপতি

সংবিধানের সাথে বিচার বিভাগের সম্পর্ক জবাবদিহি করাই গণ-অভ্যুত্থানের ল্য

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেছেন, সংবিধান বাতিল করা জুলাই বিপ্লবের ল্য ছিল না; বরং সংবিধানের সাথে বিচার বিভাগের সম্পকর্কে বিশুদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক করাই ছিল সেই অভ্যুত্থানের মূল ল্য। গতকাল বৃহস্পতিবার অবসরের আগে আপিল বিভাগে শেষ কর্মদিবসে তিনি এই মন্তব্য করেন। আগামী ২৭ ডিসেম্বর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরে যাবেন, তবে সুপ্রিম কোর্টে অবকাশকালীন ছুটি থাকায় গতকালই ছিল তার শেষ কার্যদিবস।

বিদায়ী বক্তব্যে প্রধান বিচারপতি উল্লেখ করেন, গণতন্ত্রে যতদিন বিচার বিভাগের মূল্যবোধ বজায় থাকবে, ততদিন সুপ্রিম কোর্ট ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার শেষ আশ্রয়স্থল হয়ে থাকবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিচার বিভাগকে অবশ্যই বর্তমান সংবিধানের মূল নীতিগুলো মেনে চলতে হবে, যার মধ্যে মতা পৃথকীকরণ, বিচারিক স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক শাসন, মৌলিক অধিকার এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রধান বিচারপতি তার বক্তব্যে আরো যুক্ত করেন যে, বিচার বিভাগের প্রকৃত শক্তি কোনো একক দফতরে নয়, বরং সততা ও দূরদর্শিতার সাথে ন্যায়বিচার করার সম্মিলিত সঙ্কল্পের মধ্যেই নিহিত।

প্রধান বিচারপতির শেষ কর্মদিবসে আপিল বিভাগের এজলাসেই অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির প থেকে তাকে বর্ণাঢ্য বিদায়ী সংবর্ধনা দেয়া হয়। এ অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি, ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি, বারের আইনজীবী এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য : অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আসাদুজ্জামান প্রধান বিচারপতিকে বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বলেন, আপনি উত্তরাধিকার সূত্রে এমন এক বিচারব্যবস্থা পেয়েছিলেন যেখানে প্রায়ই আইনের শাসনের পরিবর্তে সুবিধার শাসন জেঁকে বসেছিল। গত ১৬ মাসে আপনি ছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক সততার এক সুদ কারিগর। তিনি আরো বলেন, এই অল্প সময়ে আপনি বহু যুগান্তকারী বা ট্রান্সফরমেটিভ পদপে গ্রহণ করেছেন। আপনার গৃহীত ও বাস্তবায়িত উদ্যোগগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

পৃথক বিচারিক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা : দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে মাসদার হোসেন মামলার রায় ছিল এক চমৎকার কিন্তু উপেতি ব্লুপ্রিন্ট। আপনার সাহসেই একটি স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আজ এক দৃশ্যমান বাস্তবতা।

মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা : আপনি রাজনৈতিক অনুকম্পায় নিয়োগের সংস্কৃতি ভেঙে দিয়েছেন। আপনার উদ্যোগে প্রণীত সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং সুপ্রিম জুডিসিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল আমাদের বিচারিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সংযোজন।

মনোবল বৃদ্ধি ও জবাবদিহি : এই বছর ২৩২টি নতুন বিচারিক পদ সৃষ্টি এবং ৮২৬ জন কর্মকর্তার পদোন্নতি ছিল এক বিশাল মাইলফলক। এ ছাড়া বিচারকদের জন্য সুদমুক্ত ঋণ এবং গাড়ি নগদায়ন সুবিধা প্রদানের নির্দেশ কর্মকর্তাদের মনোবল তুঙ্গে নিয়ে গেছে।

ডিজিটালাইজেশন : হাইকোর্টের কোম্পানি বেঞ্চে কাগজমুক্ত বিচার কার্যক্রম এবং হেল্পলাইন চালুর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘব হয়েছে।

কমার্শিয়াল কোর্ট প্রতিষ্ঠা : একুশ শতকের উপযোগী কার্যকর ও গতিশীল বিচারকার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কমার্শিয়াল বা বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠার জন্য আইন প্রণীত হয়েছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল প্রধান বিচারপতিকে বলেন, আপনি আপনার চিন্তা, দৃঢ় দৃষ্টিভঙ্গি এবং অনমনীয় সততার মাধ্যমে বাংলাদেশের বিচার জগতে একজন প্রমিথিউস হয়ে উঠেছেন। যতবার এই বিচার বিভাগ তার পথ হারানোর চেষ্টা করেছে, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে, অহেতুক বাজে আক্রমণের শিকার হয়েছে, স্বার্থান্বেষী মহলের স্বার্থের কেন্দ্রে পরিণত হয়ে বিচার বিভাগ ধ্বংসের উপক্রম হয়েছে, ততবার এই বিচার বিভাগ ফিনিক্স পাখির মতো আপনার হাত ধরে তার সঠিক গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। তিনি বলেন, আপনার প্রজ্ঞা এবং পাণ্ডিত্যের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া পর্যন্ত এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে থাইল্যান্ড থেকে দুবাইয়ের গ্লোবাল গভর্নমেন্ট সামিট, মিসর থেকে ব্রাজিল-প্রতিটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে আপনার উপস্থিতি আমাদের গর্বিত করেছে। বিশেষ করে, পরিবেশগত ন্যায়বিচার বা ইনভাইরনমেন্টাল জাস্টিস নিয়ে আপনার অবদান আজ বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অনারারি ফেলোশিপ অর্জন আমাদের সমগ্র বিচার বিভাগের জন্য এক অনন্য সম্মান। রাষ্ট্রের এই প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে স্বল্প সময়ের এই টেনিউরে আপনি আপনার প্রজ্ঞা, মেধা ও দূরদর্শিতার দ্বারা স্থাপন করেছেন এক অনন্য বিচার বিভাগীয় মানদণ্ড যাকে আমি নাম দিয়েছি ‘দ্য রেফাত স্ট্যান্ডার্ড’, যা বিচারিক সাহসিকতা এবং পরম স্বচ্ছতার এক মূর্ত প্রতীক।

আবেগাপ্লুত হয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমার জীবনের আইন পেশার অনন্য এবং অনবদ্য একটি অংশ অতিবাহিত হয়েছে আপনার মরহুম পিতা ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদের জুনিয়র হিসেবে এবং সেখানে আপনার সহকর্মী হিসেবে। প্রত্য অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি আমার গুরু ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদের চেম্বারে সংবিধান কেবল কোনো পাঠ্যবই ছিল না; সেটি ছিল এক জীবন্ত ও স্পন্দিত বিবেক। তিনি বলেন, আজ যখন এই এজলাসে আপনার দিকে তাকাই, আমি ঠিক সেই একই আপসহীন ও নৈতিক ব্যক্তিত্বের ছায়া দেখতে পাই। আপনি আপনার পিতামহ এবং পিতার সেই অসম্পূর্ণ বিপ্লবকে সফল করেছেন। আপনার মা, প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদের সেই প্রজ্ঞা এবং ভাষা আন্দোলনের তেজ আপনার নেতৃত্বের প্রতিটি পরতে মিশে আছে। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আপনি আমাদের শিখিয়েছেন, প্রতিষ্ঠান তৈরি করা সহজ, কিন্তু তার আত্মাকে রা করা কঠিন। আপনি বলেছেন, আমরা যদি আমলনামায় স্বচ্ছ না থাকি, তবে কোনো সচিবালয় আমাদের রা করতে পারবে না। আপনার এই সতর্কবাণী আমাদের হৃদয়ে গেঁথে থাকবে।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বিচার বিভাগীয় সংস্কারের েেত্র আপনি আমাদের কাছে চে গুয়েভারার মতোই এক বিপ্লবী চেতনার মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। আপনি আমাদের শিখিয়েছেন, ‘প্রলয় আসলেও যেন ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়’। তিনি বলেন, আপনি এসেছিলেন এক উত্তপ্ত বিপ্লবের ঋতুতে; আর বিদায় নিচ্ছেন বিজয়, শান্তি এবং স্বচ্ছতার এক অনন্য ঋতুতে। আমরা সবাই প্রার্থনা করছি সর্বশক্তিমান আল্লাহ আপনাকে সুনির্মল স্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু দান করুন। আপনি যে স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় এবং বিচার বিভাগীয় সংস্কারের বীজ বুনে দিয়ে যাচ্ছেন, আমরা আশা করছি, তাকে আমরা মহীরুহে পরিণত করব, ইনশা আল্লাহ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘তোমারে যে চাহিয়াছে ভুলে একদিন, সে জানে তোমারে ভুলা কি কঠিন’। আমরা আপনাকে আজীবন মনে রাখবো, ভুলবো না।

বার সমিতির সভাপতির বক্তব্য : সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, প্রধান বিচারপতি সৎ, নিষ্ঠা ও দতার সাথে দায়িত্ব পালন করে সাংবিধানিকসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ মামলা নিষ্পত্তি করেছেন। আগামী ২৭ ডিসেম্বর অবসরে যাচ্ছেন দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। তবে সে সময় সুপ্রিম কোর্টে অবকাশকালীন ছুটি থাকায় বৃহস্পতিবার তার শেষ কর্মদিবস ছিল। শিগগিরই তিনি ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে পবিত্র ভূমিতে যাত্রা করবেন।