অতিরিক্ত গেমের ফলে শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকি বাড়ছে
‘সাইট বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি’
ছাত্র-তরুণদের মধ্যে অনলাইন জুয়া ও গেমের আসক্তি ভয়াবহ আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকে কৌতূহলবশত জুয়ার ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে হয়ে যাচ্ছে জুয়ায় আসক্ত। তা ছাড়া অতিরিক্ত গেম খেলার মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনলাইন জুয়ায় বড় ভূমিকা রাখছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে টার্গেট করে বিভিন্ন জুয়াভিত্তিক সাইটগুলো প্রতিনিয়ত তাদের লোভনীয় বিজ্ঞাপন প্রচার করে যাচ্ছে। গেম খেলে আয় করুন ও বিনা পরিশ্রমে লাখোপতি হওয়া যাবে, এমন বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পা দিচ্ছেন অনেকেই।
এসব অনলাইন গেম ও জুয়ার ফলে পারিবারিক বন্ধনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন খেলাকে কেন্দ্র করে চলে রমরমা অনলাইন জুয়ার আসর। বাংলাদেশে প্রায় কয়েক শ’ সাইট রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন কোটি টাকার জুয়া হয়। আর এমন অসংখ্য আকর্ষণীয় গেম রয়েছে। যেগুলোতে আসক্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। সরকার বিভিন্ন সময় উদ্যোগ গ্রহণ করলেও কোনো কাজে আসছে না বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
অভিভাবক সাইদুল ইসলাম জানান, তার ছেলে সারা দিন অনলাইনে গেম খেলে। কোন কথা শোনে না। প্রথমে অল্প থাকলেও এখন তা মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। পড়াশোনায় মন নেই, অদ্ভুত আচরণ করছে। খেলাধুলার প্রতি কোনো আকর্ষণ নেই। মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে গিয়ে এখন চশমা পরতে হচ্ছে।
শফিকুর নামের আরেকজন বলেন, আমার সন্তান মারাত্মকভাবে অনলাইনে গেমের প্রতি আশক্ত হয়ে গেছে। তাকে নিষেধ করলে বাসার বিভিন্ন জিনিস ভাঙতে শুরু করে। আসক্তির মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে, ছাড়ানোর জন্য চিকিৎকেরও দ্বারস্থ হয়েছি। এই পরিস্থিতিতে অনলাইন গেমগুলো বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ খুবই জরুরি।
এ ছাড়াও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষার্থী জানান, ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে বন্ধুর মাধ্যমে বেটিং শুরু করেন। শুরুতে কিছু টাকা জিতে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। এরপর দেড় বছরে ৯ লাখ টাকা হারিয়ে ফেলেন। ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়লে পরিবারে বিবাদ শুরু হয়, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কয়েক সেমিস্টার ড্রপ দেন।
আরেক শিক্ষার্থী সম্পর্কে তার বাবা বলেন, আমার ছেলে পড়াশোনার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং করতো বলে জানতাম। সে সবসময় বলতো অনেক টাকা উপার্জন করে মা-বাবাকে দিবে। কিন্তু আমরা জানতাম না সে মূলত খেলতো জুয়া। অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে বাসা থেকে টাকা চুরি করেছে, আমার গয়না নিয়ে বিক্রি করেছে।
২০২৩ সালে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এক হাজার ৭৭৩ জন শিক্ষার্থীর ওপর এক জরিপ পরিচালনা করে বেসরকারি সংস্থা ‘আঁচল ফাউন্ডেশন’। সমীক্ষায় দেখা গেছে, পড়াশোনা বিষয়ক কাজে ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকেন ৩৮ দশমিক দুই শতাংশ শিক্ষার্থী। ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ অনলাইন গেম খেলতে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। ইন্টারনেট আসক্তি নিয়ে জাতীয় মানসিক ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ২০২১ সালের জরিপের তথ্যানুযায়ী, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের গেমিংয়ে সময় ব্যয় করেন ৫৪ দশমিক পাঁচ শতাংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণা থেকে জানা যায়, ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি সাতজনের একজন (ছেলে-মেয়ে) কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভোগছে। অন্যদিকে গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, দেশে শতাধিক অনলাইন জুয়ার সাইট ও অ্যাপের মাধ্যমে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ জুয়া খেলেন। ২০২০ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে এই বাজার চার দশমিক সাত শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যাদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই বেশি। এই অনলাইন জুয়ার আরেকটি ভয়ঙ্কর দিক হলো অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং অর্থ পাচার। অনলাইন জুয়ার অধিকাংশ প্ল্যাটফর্মই বিদেশী, ফলে এই খাতে যে বিশাল অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়, তার বড় অংশ দেশ থেকে বেরিয়ে যায়। অনলাইন জুয়ায় এ দেশ থেকে বছরে পাচার হচ্ছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা।
ওয়ার্ল্ড গ্যাম্বলিং মার্কেট রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২ সালে শুধু অনলাইন জুয়ার বাজারমূল্য ছিল ছয় হাজার ৩৫৩ কোটি মার্কিন ডলার। ২০২৩ সালের ব্যাপ্তি ১১ দশমিক সাত শতাংশ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং এই অনলাইন জুয়ায় বাজারমূল্যের গ্রাফ ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী।
ঢাকা শহরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী অন্তত ৩২ শতাংশ তরুণ কোনো না কোনোভাবে অনলাইন জুয়ার সাথে যুক্ত। প্রতি মাসে গড়ে একজন অনলাইন জুয়াড়ি পাঁচ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হারাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেটিং টিপস পেজের সংখ্যা ৫০০-এর বেশি, যেগুলো তরুণদের প্রতিনিয়ত উৎসাহিত করছে জুয়ায় নামতে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকার গত কয়েক বছরে তিন হাজার ৫০০টিরও বেশি জুয়ার সাইট বন্ধ করেছে। সিআইডি, ডিবি ও র্যাবের হাতে ধরা পড়েছে জুয়ার সাইট পরিচালনাকারী শতাধিক ব্যক্তি। তবে প্রতিটি সাইট বন্ধ করার পরপর এই চক্র ভিপিএন (ভয়েস ওভার প্রটোকল নেটওয়ার্ক) দিয়ে সাইটগুলো আবার সচল করে।
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ২০ ধারা অনুযায়ী, জুয়ায় অংশ নেয়া বা এর প্রচারণা করা ফৌজদারি অপরাধ। এই ধারার আওতায় অনলাইন জুয়ার সাথে যুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তি ভোগ করতে হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন এসইও বিশেষজ্ঞ বলেন, এই অনলাইন জুয়ার ফাঁদ থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে ভয়াবহ সঙ্কটের মুখে পড়তে হবে; এটি অবশ্যম্ভাবী। কাজেই সমাজের সব স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। আসক্তি দূর করতে পরিবার ও বন্ধুদের দায়িত্ব নিতে হবে। রাষ্ট্রকে কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করার পাশাপাশি তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে জোর দিতে হবে।
মনোরোগ চিকিৎসকরা বলছেন, অনলাইন জুয়া আসক্তির একটি ভয়ঙ্কর রূপ। এটি শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, মানসিক চাপ, বিষণœতা ও আত্মহত্যার প্রবণতাও বাড়ায়। বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি ব্যাপক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশ ঘটাতে কেবল একা নয়; প্রয়োজন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
সিআইডির সূত্রে জানা যায়, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ওয়ানএক্সবেট, মেলবেট, বেটউইনার নামের বেটিং সাইটগুলোতে বাংলাদেশের প্রচুর গ্রাহক বেটিং বা জুয়া খেলায় অংশ নিচ্ছে। রাশিয়া থেকে মূলত এসব অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বিভিন্ন দেশে স্থানীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য দক্ষ ম্যানেজার নিয়োগ করা হয়। এদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, জুয়ায় আসক্ত হয়ে মানুষ নিজের, পরিবারের ও সম্পর্কের দায়িত্ব ভুলে যায়। অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনাতেও অবহেলা শুরু করে। ডিজিটাল জুয়ার বিস্তার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নেপথ্যের নেটওয়ার্কগুলো ধ্বংস করা এবং কঠোর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। জনসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়, বরং এটি আরো ভয়াবহ রূপ নেবে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও ডিকোডস ল্যাব লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ মঈনুদ্দীন বলেন, বর্তমান প্রজন্ম অনলাইন গেমের প্রতি বেশি আসক্ত হওয়ার কারণ হচ্ছে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা। এ ছাড়া অনেক গেমে পুরস্কার থাকে যেখানে লেভেল আপ, পয়েন্ট, পুরস্কার পাওয়া যায় যা খেলোয়াড়কে বারবার খেলতে উৎসাহিত করে। অতিরিক্ত গেম খেলার ফলে শারীরিকভাবে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে বসে থাকার কারণে চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা, ঘাড় ও পিঠে ব্যথা এবং স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ে। অনেকেই রাত জেগে গেম খেলে, ফলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে এবং শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। অনলাইন গেম আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সচেতনতা ও নিয়ন্ত্রণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অনলাইন জুয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, অনলাইন জুয়া প্রথমে ছোট অংকের টাকা দিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে বড় অংকে পরিণত হয়। জুয়ার প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে তৈরি থাকে যে খেলোয়াড় মাঝে মধ্যে জেতে, ফলে সে মনে করে আবার খেললে আরো লাভ হবে। এই মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদের কারণে মানুষ বারবার টাকা বিনিয়োগ করে এবং শেষ পর্যন্ত বড় অংকের ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইন বিজ্ঞাপনে ‘সহজে টাকা আয়’ বা ‘কম সময়ে লাভ’ এর মতো প্রলোভন দেখানো হয়, যা মানুষকে আকৃষ্ট করে।
দ্রুত ধনী হওয়ার আকাক্সক্ষা, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক প্রভাব মানুষকে জুয়ার দিকে টানে। বিজ্ঞাপন ও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে জুয়াকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়।
অনলাইন গেইম ও জুয়ার বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অবৈধ অনলাইন জুয়া সাইটগুলো বন্ধ করা এবং কঠোর আইন প্রয়োগ করা জরুরি। জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা। এক্ষেত্রে স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম চালু করা যেতে পারে। এ ছাড়া বিকল্প বিনোদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করলে তরুণরা ইতিবাচক কাজে যুক্ত হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনলাইন জুয়া একটি প্রতারণামূলক ফাঁদ হিসেবে কাজ করে। জুয়ার অ্যাপ বা ওয়েবসাইট ব্লক করা এবং সময় অন্য কাজে ব্যয় করা। ধীরে ধীরে অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। ব্যক্তিগতভাবে এটি সময় নষ্ট, শিক্ষার ক্ষতি, মানসিক সমস্যা এবং আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়। পারিবারিক সম্পর্কেও বিরূপ প্রভাব পড়ে ঝগড়া, অবিশ্বাস এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়।



