টানা বৃষ্টিতে দুর্ভোগে রাজধানীবাসী

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

রোববারের ভারী বৃষ্টির পর গতকাল সোমবার সকাল থেকে আবারো মুষলধারে বৃষ্টি ঝরেছে রাজধানীতে। ফলে জলাবদ্ধতা আরো বেড়েছে। অফিসগামী মানুষ আর জীবিকার তাগিদে বের হওয়া মানুষের ভোগান্তির চিত্র ছিল আগের মতোই। পানি জমে যাওয়ায় বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। কোথাও কোথাও দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। অন্য দিকে বৃষ্টির কারণে সড়কে গণপরিবহনের সংখ্যাও কমে যাওয়ায় বাসে চলাচল করা যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়ে যায়। গন্তব্যে যেতে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সিএনজি অটোরিকশা চালকরা নেন কয়েকগুণ বেশি ভাড়া। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে জনজীবন। বিশেষ করে গতকাল এইসএসসি পরীক্ষা থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে পানিতে ডুবে যায় রাজধানীর পথঘাট। শনিবার বিকেলের দিকে বৃষ্টি বন্ধ হলে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ঢাকাবাসী। গতকাল ভোর থেকে আবারো রাজধানীতে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়। সকাল ৮টার পর তা মুষলধারে বর্ষণে রূপ নেয়। এতে আগের দিনের বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়া অনেক সড়ক আবারো পানির নিচে তলিয়ে যায়।

মালিবাগ রেলগেট মোড়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষায় থাকা রাশেদুল ইসলাম বলেন, আমার অফিস রামপুরায়। বৃষ্টি দেখে একটু আগেভাগে বের হয়েছি। কিন্তু ১০ মিনিট ধরে অপেক্ষা করেও কোনো বাস পাচ্ছি না। উপায় না পেয়ে রিকশা খুঁজছি। ৩০-৪০ টাকার ভাড়া চাচ্ছে ১৫০ টাকা। একে বৃষ্টি ও রাস্তায় জমা পানির বিপত্তি, তার ওপর গাড়ির সঙ্কট।

বৃষ্টির মধ্যে গণপরিবহনের এই সঙ্কট মানুষের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মালিবাগ আবুল হোটেল থেকে বৃষ্টিতে ভিজে রাইদা পরিবহনে ওঠা আবিদ ইসলাম নামে এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন, আজকে একটা ক্লাস টেস্ট আছে। মিস করা যাবে না ভেবে ছাতা নিয়ে বের হয়েছি। কিন্তু ভিড়ের মধ্যে গাড়িতে উঠতে গিয়ে পুরো ভিজে গেছি। এভাবে পরীক্ষা কি দেবো জানি না। অন্তত উপস্থিতিটা নিশ্চিত করতে হবে বলে যাচ্ছি।

ভারী বৃষ্টির কারণে ছাতা কিংবা রেইনকোটেও রক্ষা পাচ্ছেন না মানুষ। নতুনবাজার ওভার ব্রিজে ছাতা হাতে থাকলেও অনেকে বৃষ্টি থেকে বাঁচতে আশ্রয় নিয়েছেন ব্রিজের ওপর ও নিচে। শাকিল হোসেন নামে এক কলেজশিক্ষার্থী বলেন, ছাতা নিয়েও ভিজে যাচ্ছি। এত ভারী বৃষ্টিতে ছাতা কোনো কাজের না।

রাজধানীর রামপুরা এলাকা থেকে পল্টনে অফিসে যাওয়ার জন্য রাস্তায় অপেক্ষা করা বেসরকারি চাকরিজীবী তোফায়েল হোসেন বলেন, বৃষ্টির কারণে সড়কে গণপরিবহনের সংখ্যা তুলনামূলক কম। এই সুযোগে সিএনজি বা ব্যাটারিচালিত রিকশায় ভাড়া, আজ তার দ্বিগুণ চাচ্ছে। বৃষ্টি দেখলেই এদের ভাড়া বেড়ে যায়।

ভাড়া বেশি নেয়ার পেছনে যুক্তি তুলে সিএনজি চালক আবিদুর রহমান বলেন, বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি চালানো অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। রাস্তায় পানি জমে থাকে, গাড়ির ইঞ্জিনে সমস্যা হয়, যাত্রীও কম পাওয়া যায়। এ জন্যই একটু বেশি ভাড়া চাইতে হয়। গতকাল জলাবদ্ধতায় রাস্তার মধ্যে আমার সিএনজির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়, সারা দিনে আর কোনো আয় হলো না।

সকালের বৃষ্টিতে ফের জলমগ্ন ধানমন্ডি, দুর্ভোগ চরমে : রাজধানীতে সকাল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে আবারো ধানমন্ডি ২৭ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। প্রধান সড়ক, অলিগলি ও বিভিন্ন সংযোগসড়কে হাঁটুসমান পানি জমে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন পথচারী, শিক্ষার্থী ও যানবাহনের চালকরা। রোববার টানা ভারী বৃষ্টিতে পুরো ধানমন্ডি এলাকার প্রায় সব সড়কই তলিয়ে যায়। এতে অফিসগামীযাত্রী থেকে শুরু করে পথচারী, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।

গতকাল সকাল থেকে হওয়া বৃষ্টিতে ধানমন্ডি ২৭, রাফা প্লাজা, মানিক মিয়া এভিনিউ ও আশপাশের এলাকাজুড়ে জলাবদ্ধতার এ চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ধানমন্ডি ২৭ এলাকায় বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যা থাকলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। ড্রেনেজ ব্যবস্থার অকার্যকারিতা, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং ড্রেনে ময়লা-আবর্জনা জমে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে বলে তাদের দাবি।

ঢামেক-পলাশীর সড়কে হাঁটুপানি, চরম ভোগান্তিতে রোগী ও শিক্ষার্থীরা : ভারী বর্ষণের একদিন পরও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল, পলাশীর মোড় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিভিন্ন এলাকায় এখনো হাঁটুসমান পানি জমে আছে। পানি না নামায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী, তাদের স্বজন ও শিক্ষার্থীরা।

গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে দেখা যায়, পুরো এলাকা হাঁটুসমান পানির নিচে তলিয়ে আছে। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের নোংরা পানি মাড়িয়ে হাসপাতালে প্রবেশ ও বের হতে হচ্ছে। এ দিকে পলাশীর মোড় থেকে পূর্ব দিকে স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলের ফটক পর্যন্ত হাঁটুসমান পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। তলিয়ে আছে এসএম হলের মাঠও। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনের পানি নেমে গেলেও ঢাবির গণিত ভবন থেকে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের সামনের অংশ পর্যন্ত পানি জমে আছে। কেন্দ্রীয় খেলার মাঠটিও পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে আছে।

গুলশান লেকের পানি উপচে সড়কে : টানা বৃষ্টিতে গুলশান লেকের পানি উপচে গুলশান-শাহজাদপুর সংযোগ সড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে সড়কটির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানির প্রবাহ অব্যাহত থাকায় সড়কে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দেয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, টানা বর্ষণের কারণে লেকের পানি বেড়ে রোববার বেলা ১১টার দিকে সড়কের ওপর উঠে আসে।

জলমগ্ন বনানী-ইসিবি-কুড়িল, বিকল্প সড়ক ব্যবহারের অনুরোধ : সকালের বৃষ্টিতে ফের জলমগ্ন রাজধানীর বনানী, কাকলী, মিরপুর, ইসিবি এবং কুড়িল এলাকার বিভিন্ন সড়ক। এ অবস্থায় নগরবাসীকে ওই সব রুট বাদ দিয়ে বিকল্প সড়ক ব্যবহারের অনুরোধ জানিয়েছে ডিএমপির গুলশান ট্রাফিক বিভাগ। বনানী/কাকলী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নামার র‌্যাম্পের প্রান্তে হালকা পানি জমেছে। যান চলাচল কিছুটা ধীর। ইসিবি এলাকায় ক্যান্টনমেন্ট গার্লস স্কুলের সামনে পানি জমে রয়েছে। ফলে মিরপুর ডিওএইচএস এবং কালশী থেকে ইসিবি হয়ে মাটিকাটা ফ্লাইওভারগামী যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করতে পারছে। যমুনা ফিউচার পার্কের সামনের সড়কে বৃষ্টির পানি জমার কারণে এবং ঢাকা ওয়াসার পাইপলাইনিং কাজের জন্য যান চলাচলে ধীরগতি রয়েছে। বিকল্প সড়ক ব্যবহার এবং হাতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে চলাচলের অনুরোধ জানায় ট্রাফিক বিভাগ।

সপ্তাহজুড়ে ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস : সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি কমার কোনো লক্ষণ নেই। উল্টো সপ্তাহজুড়ে দেশের অধিকাংশ এলাকায় দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। একই সাথে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভারী বর্ষণও হতে পারে। গতকাল সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার পূর্বাভাসে এসব তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর।