দেশে উচ্চশিক্ষার প্রসারে গত তিন দশকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছেন। তবে শিক্ষার বিস্তারের পাশাপাশি গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞান সৃষ্টিতে অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনিয়োগ এখনো প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। ফলে উচ্চশিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কতটা অর্জিত হচ্ছে, তা নিয়ে শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৬৯টি। এর মধ্যে ১১৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করলেও গবেষণায় তাদের অবদান তুলনামূলকভাবে সীমিত।
ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনাকারী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্তত ১৫ শতাংশ গবেষণা খাতে কোনো বরাদ্দই রাখেনি। অনেক প্রতিষ্ঠানে গবেষণার জন্য বরাদ্দ থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। অন্যদিকে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি,ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি), ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি) ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গবেষণায় তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ করছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল শক্তি শুধু পাঠদান নয়; গবেষণা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, উদ্ভাবন এবং সমাজ ও শিল্পখাতের সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখাও এর অন্যতম দায়িত্ব। গবেষণাকেন্দ্রিক শিক্ষা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান আয়ের উৎস টিউশন ফি। ফলে নতুন ভবন নির্মাণ, অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও প্রশাসনিক ব্যয়ে তুলনামূলক বেশি অর্থ ব্যয় হলেও গবেষণার জন্য দীর্ঘমেয়াদি তহবিল গড়ে ওঠেনি। অনেক ক্ষেত্রে নতুন বিভাগ ও শিক্ষার্থী ভর্তির প্রতিযোগিতাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইউজিসির তথ্য বলছে, গবেষণায় পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ হলো পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব, আধুনিক গবেষণাগার ও গবেষণা সহকারীর সঙ্কট এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সীমাবদ্ধতা। একই সাথে অনেক শিক্ষককে অতিরিক্ত কোর্স পড়াতে হয়, ফলে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সময় পান না।
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষণা ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক এম রিজওয়ান খান গণমাধ্যমকে বলেন, গবেষণা একটি ব্যয়বহুল কার্যক্রম। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় সে ব্যয় বহনে আগ্রহী নয়। পাশাপাশি শিক্ষকদের অতিরিক্ত পাঠদানের চাপও গবেষণার বড় অন্তরায়। অবশ্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিনিধিরা ভিন্ন বাস্তবতার কথা তুলে ধরছেন। তাদের দাবি, শিক্ষার্থীরা শতভাগ টিউশন ফি, ভ্যাট ও অন্যান্য কর পরিশোধ করলেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গবেষণা অনুদান, শিক্ষার্থী ঋণ বা বৃত্তির সুযোগ পান না। ফলে উন্নত গবেষণা অবকাঠামো গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। তারা গবেষণা প্রকল্প অনুমোদন এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করারও দাবি জানিয়েছেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ গবেষণা বাড়ানোর বিকল্প নেই। গবেষণাকে ব্যয় নয়, ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা তহবিল থাকলেও খুব অল্পসংখ্যক শিক্ষক তা ব্যবহার করতে পারেন। পিএইচডি ও পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা, আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশনা, আধুনিক গবেষণাগার স্থাপন এবং গবেষণা-সহায়ক অবকাঠামো তৈরিতে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের ওপর।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন, গবেষণায় ন্যূনতম বাধ্যতামূলক বরাদ্দ নির্ধারণ, গবেষণা ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং শিল্পখাতের সাথে যৌথ গবেষণা সম্প্রসারণ জরুরি। পাশাপাশি গবেষণায় ভালো পারফরম্যান্সকে বিশ্ববিদ্যালয় মূল্যায়নের অন্যতম সূচক হিসেবে বিবেচনা করা এবং গবেষণায় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য কর-সুবিধা বা বিশেষ প্রণোদনার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
ইউজিসির সদস্য (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, গবেষণা অর্থায়নকে আরো স্বচ্ছ ও গবেষকবান্ধব করতে নতুন নীতিমালা নেয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার জন্য ২২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। যদিও এ বরাদ্দ সরাসরি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নয়, তবু জাতীয় পর্যায়ে গবেষণার মানোন্নয়নে সমন্বিত নীতির প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ক্যাম্পাস, ভবন বা শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণ করা যায় না। আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে অবস্থান নির্ভর করে গবেষণা প্রকাশনা, উদ্ধৃতি (সাইটেশন), উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং পেটেন্টের মতো সূচকের ওপর। এসব সূচকে বাংলাদেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখনো পিছিয়ে রয়েছে। গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



