সৌদি থেকে আসছে তেলবাহী জাহাজ বাড়তি ব্যয় ৫০ কোটি টাকা

Printed Edition

নূরুল মোস্তফা কাজী, চট্টগ্রাম

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ১৮ হাজার কিলোমিটার বাড়তি পথ ঘুরে এক লাখ মেট্রিক টন এরাবিয়ান লাইট ক্রুড নিয়ে চট্টগ্রামের পথে রয়েছে মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী এমটি নিনেমিয়া। ভেসেল ফাইন্ডারের তথ্য অনুযায়ী গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাহাজটি ঘণ্টায় ১২.৫ নটিক্যাল মাইল গতিতে পূর্ব আফ্রিকার বে-অব জিব্রালটার পাড়ি দিচ্ছিল। ভেসেল ফাইন্ডারের তথ্যে জাহাজটি সেপ্টেম্বরের ১২ তারিখে চট্টগ্রামে পৌঁছাবে।

দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো থেকে এরাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েল (এএলসি) ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি থেকে মারবান ক্রুড অয়েল আমদানি করে পরিশোধন করা হয়। এর বাইরে অন্য কোনো দেশের ক্রুড শোধনের উপযোগী নয় ইস্টার্ন রিফাইনারি।

সূত্র জানায়, সাধারণত প্রতি মাসে দুই দেশ থেকে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের দু’টি ট্যাংকার বাংলাদেশে আসে। সৌদি আরবের ইয়ানবু থেকে ছেড়ে আসা এমটি নিনেমিয়া চলতি মাসের শুরুতে চট্টগ্রাম পৌঁছার কথা থাকলেও বিকল্প পথে এটি পৌঁছাতে আরো একমাস সাত দিন লাগবে। এ ছাড়া আগামী ১২ আগস্ট ইউএই’র ফুজাইরা বন্দরে একটি জাহাজে এক লাখ মেট্রিক টন ক্রুড লোড হওয়ার সিডিউল রয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশরেন (বিপিসি) জন্য ক্রুড অয়েল আমদানির জাহাজ চার্টরিংয়ের দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)।

বিএসসি সূত্র জানিয়েছে, গত ২৩ জুলাই ইয়ানবু বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করা মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী এমটি নিনেমিয়া বাব আল মান্দেব প্রণালী হয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছার কথা ছিল। কিন্তু ওই সময়ে হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের হুদেইদা বন্দর এবং কামরান দ্বীপে সৌদি বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবে বাব আল মান্দেব অবরোধের ঘোষণা এবং ২৫ জুলাই সৌদি আরবের জিজান ও ইয়ানবুতে ইয়েমেনের হুদি বিদ্রোহীরা হামলা চালানোর জন্য সংশ্লিষ্ট শিপিং এজেন্ট জাহাজটি গন্তব্যে পেঁছাতে বিকল্প পথ ধরে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ইয়ানবু থেকে পূর্বদিকে গিয়ে সুয়েজ ক্যানাল, ভূমধ্যসাগর, জিব্রালটার প্রণালী হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের উপকূল ঘেঁষে মাদাগাস্কার-শ্রীলঙ্কা হয়ে বাংলাদেশে আসছে এই তেলবাহী ট্যাংকার। এতে জাহাজটিকে ১৮ হাজার কিলোমিটার বাড়তি পথসহ মোট ২৬ হাজার কিলোমিটার (১৩ হাজার নটিক্যাল মাইল) পথ পাড়ি দিতে হবে। এতে বাড়তি সময় লাগবে ৩৫ দিন আর বাড়তি ব্যয় গুনতে হবে প্রায় ৫০ কোটি টাকা। এতে সুয়েজ খালের টোল, জাহাজের জ্বালানি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে সূত্র জানিয়েছে।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক নয়া দিগন্তকে জানান, আমরা ক্রুড অয়েল আমদানি করি সৌদি আরব এবং ইউএই থেকে। এ ছাড়া অন্য দেশের তেল আমাদের রিফাইনারি পরিশোধন করতে পারে না। সেজন্য এই দুই দেশ থেকেই আমাদের ক্রুড আনতে হবে। সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছাতে স্বাভাবিক সময়ে ১৩ দিন লাগলেও বিকল্প পথে জাহাজটি চট্টগ্রামে পৌঁছাতে ৩২ দিন বাড়তি সময়সহ ৪৫ দিন লাগবে।

তিনি বলেন, শিপিং এজেন্ট বিকল্প পথে জাহাজ পরিচালনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে এবং অতিরিক্ত ৪ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ব্যয়ের হিসাব দিয়েছে। তবে তারা একথাও বলেছে এক্ষেত্রে তারা কোন লাভের চিন্তা করছে না, যা বাড়তি খরচ লাগবে সেটাই নেবে। তিনি বলেন, যেহেতু ইউএই’র জেবেল আলীর বিকল্প বন্দর হচ্ছে ফুজাইরা এটা রেড সি-তে পড়লেও ইয়েমেন থেকে অনেক দূরে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

রিফাইনারিতে কাঁচামাল মজুদ আছে ৫ সপ্তাহের :

এদিকে দেশের একমাত্র দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রায় ৫ সপ্তাহের কাঁচামাল মজুদ রয়েছে বলে জানা গেছে। আর ওই মজুদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালেই ইয়ানবু থেকে ছেড়ে আসা জাহাজটি বা ইউএই থেকে লোড নেয়া জাহাজ চট্টগ্রামে পৌঁছার ব্যাপারে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা।

ইআরএল মূলত বর্তমানে কিছু নন-ফুয়েল পণ্যসহ লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), স্পেশাল বয়েলিং পয়েন্ট সলভেন্ট (এসবিপি), মোটর গ্যাসোলিন রেগুলার (পেট্রোল), মোটর গ্যাসোলিন প্রিমিয়াম (অকটেন), ন্যাফথা (গ্যাসোলিন), মিনারেল টার্পেনটাইন (এমটিটি), সুপিরিয়র কেরোসিন অয়েল (এসকেও), জেট এ-১ (এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল), হাইস্পিড ডিজেল (এইচএসডি), জুট ব্যাচিং অয়েল (জেবিও), লাইট ডিজেল অয়েল (এলডিও), ফার্নেস অয়েল (এফও) এবং বিটুমিন উৎপাদন করে।

বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে, যা দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ পূরণ করে।