বাংলাদেশ সরকার গত এক দশকে শিল্পায়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) প্রকল্পকে সামনে এনেছে। লক্ষ্য ছিল- বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রফতানি বহুমুখীকরণ। ঘোষণায় বলা হয়েছিল, দেশজুড়ে প্রায় ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠবে, যেখানে আধুনিক অবকাঠামো, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস, দ্রুত কাস্টমস সুবিধা এবং কর ছাড় থাকবে। কিন্তু বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ অর্থনৈতিক অঞ্চল এখনো আংশিক নির্মাণাধীন, অনেক উৎপাদন কার্যক্রম শুরুই হয়নি, আর যেগুলো চালু হয়েছে সেগুলোও উচ্চ লজিস্টিক ব্যয় ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ টানতে পারছে না।
কাগজে ১০০ এসইজেড, মাঠে সক্রিয় কয়টি?
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) হিসাব অনুযায়ী দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় এক শ’টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদিত। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের তথ্য বলছে, এর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ভূমি উন্নয়ন সম্পন্ন হয়েছে ৩৫-৪০টিতে। বিদ্যুৎ, পানি, ড্রেনেজ ও সড়কসহ মৌলিক অবকাঠামো কার্যকরভাবে চালু আছে ২০-২৫টির মতো। প্রকৃত অর্থে উৎপাদন শুরু হয়েছে মাত্র ১০-১২টি অঞ্চলে।
মিরসরাই, মহেশখালী, আড়াইহাজার ও সিলেট অঞ্চলে ঘুরে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় প্লট বরাদ্দ দেয়া হলেও গ্যাস সংযোগ নেই, বিদ্যুৎ সরবরাহে ভোল্টেজ ওঠানামা, অভ্যন্তরীণ সড়ক অসম্পূর্ণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই। ফলে বিনিয়োগকারীরা উৎপাদনে যেতে দ্বিধায় পড়ছেন।
একটি জাপানি শিল্প প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধি বলেন, “জোনে জমি পেয়েছি, কিন্তু গ্যাস না থাকায় উৎপাদন পরিকল্পনা এক বছর পিছিয়েছে। বিকল্প জ্বালানিতে খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে।”
ইউটিলিটি সঙ্কট : শিল্পায়নের বড় বাধা
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল নিরবচ্ছিন্ন ইউটিলিটি সাপোর্ট। বাস্তবে গ্যাস সঙ্কট সবচেয়ে বড় বাধা। দেশের সামগ্রিক গ্যাস ঘাটতির প্রভাব সরাসরি এসইজেডগুলোতেও পড়ছে। অনেক অঞ্চলে শিল্প সংযোগ অনুমোদন থাকলেও সরবরাহ নেই। বিদ্যুৎ ক্ষেত্রেও একই সমস্যা- গ্রিড দুর্বলতা, সাবস্টেশন অসম্পূর্ণতা এবং ব্যাকআপ ব্যবস্থার ঘাটতি উৎপাদন ব্যাহত করছে।
পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও মানসম্পন্ন ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি অনেক জোনে। পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়া নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগকারীদের সময় ও ব্যয় বাড়াচ্ছে।
বন্দর ও সড়ক সংযোগ : লজিস্টিকের দুর্বলতা
অর্থনৈতিক অঞ্চলের কার্যকারিতা সরাসরি নির্ভর করে বন্দর, মহাসড়ক ও রেল সংযোগের ওপর। কিন্তু অনেক এসইজেড এখনো সরাসরি চার লেন মহাসড়ক বা রেল নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত নয়। কনটেইনার পরিবহনে সময় বেশি লাগছে, বাড়ছে জ্বালানি ও অপারেশন খরচ।
চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার জট, ডেমারেজ চার্জ, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে বিলম্ব- সব মিলিয়ে রফতানি সময়সীমা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। একটি রফতানি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানান, “একটি কনটেইনার ছাড় করতে কখনো পাঁচ দিন, কখনো ১০ দিন লাগে। এই অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা কমিয়ে দেয়।”
লজিস্টিক ব্যয়ে বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে?
বিশ্বব্যাপী গড় হিসেবে একটি দেশের মোট উৎপাদনের (জিডিপি) ৬-৮ শতাংশ লজিস্টিকে ব্যয় হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই হার আনুমানিক ১৩-১৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পণ্য পরিবহন, সংরক্ষণ ও বন্দর ব্যবস্থাপনায় ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ।
অন্য দিকে তুলনামূলকভাবে ভারত ৮-৯ শতাংশ; ভিয়েতনাম ৭-৮ শতাংশ; চীন ৬-৭ শতাংশ; মালয়েশিয়া প্রায় ৬ শতাংশ।
একটি রফতানি কনটেইনার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ইউরোপ পাঠাতে গড়ে ২,২০০-২,৬০০ ডলার খরচ পড়ে এবং সময় লাগে ১৮-২২ দিন। একই পণ্য ভিয়েতনাম বা ভারত থেকে পাঠাতে খরচ পড়ে ১,৫০০-১,৯০০ ডলার এবং সময় লাগে ১৪-১৭ দিন। এই বাড়তি খরচ সরাসরি বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
কোথায় খরচ বেশি হচ্ছে?
বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের লজিস্টিক ব্যয়ের বড় অংশ যাচ্ছে- সড়ক পরিবহন প্রায় ৪০%; বন্দর চার্জ ও ডেমারেজ ২৫%; গুদাম ও হ্যান্ডলিং ১৫%; কাস্টমস বিলম্বজনিত ব্যয় ১০% এবং অনানুষ্ঠানিক ব্যয় ৫-১০%। রেল ও নৌপথের সীমিত ব্যবহার, একক বন্দরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থার ধীর বাস্তবায়ন এই ব্যয় বৃদ্ধির মূল কারণ।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা সঙ্কট
বিদেশী বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি নীতি স্থিতিশীলতা, দ্রুত লজিস্টিক সুবিধা এবং নির্ভরযোগ্য ইউটিলিটি সাপোর্ট চান। কিন্তু কর ছাড়ের নীতিমালা পরিবর্তন, শুল্ক কাঠামোর অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক জটিলতা বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে ধীর করে দিচ্ছে। একজন ইউরোপীয় বিনিয়োগ পরামর্শক বলেন, “বাংলাদেশের শ্রম ব্যয় প্রতিযোগিতামূলক, কিন্তু লজিস্টিক ও সময় ব্যয় বেশি। ক্লায়েন্টরা তাই ভিয়েতনাম বা ইন্দোনেশিয়ায় ঝুঁকছেন।”
এসইজেড ও জাতীয় শিল্পনীতির ফাঁক
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে জাতীয় শিল্পনীতির সঙ্গে সমন্বয় করা হয়নি যথাযথভাবে। কোথায় কোন শিল্প ক্লাস্টার হবে, কোন অঞ্চলে কোন ধরনের অবকাঠামো অগ্রাধিকার পাবে- এই রোডম্যাপ স্পষ্ট নয়। ফলে অনেক জোনে প্লট বরাদ্দ হলেও শিল্পের সমন্বিত ইকোসিস্টেম তৈরি হয়নি। এসইজেড ও লজিস্টিক থাকার পরও বিনিয়োগ কেন আটকে যাচ্ছে। এ প্রশ্নের জবাবে বাস্তব সমীকরণ দাঁড়ায় : উচ্চ লজিস্টিক ব্যয় + দুর্বল ইউটিলিটি + ধীর কাস্টমস = এসইজেড থাকা সত্ত্বেও প্রতিযোগিতা হারানো। আর বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ- ১. জোন আছে কিন্তু গ্যাস নাই। ২. পোর্টে কনটেইনার আটকে থাকে ৭-১০ দিন। ৩. নীতির নিশ্চয়তা নেই-ট্যাক্স সুবিধা বদলায়।”
করণীয় কী : বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার সমাধানে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসইজেড সংযোগ নিশ্চিত করা। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো ও বিকল্প বন্দর কার্যকর করা। রেল ও নৌপথে কনটেইনার পরিবহন বাড়ানো। ডিজিটাল কাস্টমস ও সিঙ্গেল উইন্ডো বাস্তবায়ন দ্রুত করা। এসইজেড ভিত্তিক শিল্প ক্লাস্টার পরিকল্পনা প্রণয়ন। নীতিগত স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি কর নিশ্চয়তা দেয়া।
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশের শিল্পায়নের বড় সম্ভাবনা সৃষ্টি করলেও বাস্তব অবকাঠামো সঙ্কট ও উচ্চ লজিস্টিক ব্যয় সেই সম্ভাবনাকে সীমিত করে ফেলছে। কাগজে পরিকল্পনা থাকলেও মাঠে বাস্তবায়নের ঘাটতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমাচ্ছে। যদি দ্রুত অবকাঠামো, বন্দর, কাস্টমস ও ইউটিলিটি সংস্কারে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া না হয়, তাহলে এসইজেড প্রকল্প দেশের অর্থনীতির কাক্সিক্ষত রূপান্তর ঘটাতে ব্যর্থ হতে পারে।



