নিজস্ব প্রতিবেদক
- ট্রাইব্যুনাল-২-এ প্রসিকিউশনের প্রারম্ভিক বক্তব্য
- ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় গুলিতে নিহত ৬ জন
- আসামি হানিফসহ আওয়ামী লীগের ৪ নেতা- সবাই পলাতক
- প্রসিকিউশন : অপরাধ ছিল পূর্বপরিকল্পিত, পদ্ধতিগত ও ব্যাপকমাত্রায় সংগঠিত
- প্রমাণ : ভিডিও-অডিওসহ বিস্তৃত উপাত্ত, সাক্ষী ৩৮ জন।
- সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু ৮ ডিসেম্বর
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয় নিরীহ ছাত্র-জনতাকে হত্যার দায়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য মো: মাহবুব উল আলম হানিফসহ চারজন শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ প্রসিকিউশন তাদের প্রারম্ভিক বক্তব্য পেশের মাধ্যমে এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে।
প্রসিকিউশন জোর দিয়ে বলেছে, আসামিদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধ ছিল ‘পূর্বপরিকল্পিত, পদ্ধতিগতভাবে ও ব্যাপক মাত্রায় সংগঠিত’ এবং তা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। আদালত এই মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আগামী ৮ ডিসেম্বর তারিখ নির্ধারণ করেছে।
ট্রাইব্যুনালে প্রারম্ভিক বক্তব্য উপস্থাপন : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর-এর সমন্বয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এই ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর এ দিন উপস্থিত ছিলেন না। এ সময় তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আত্ম-উৎসর্গকারী দেড় হাজার শহীদ ও পঁচিশ হাজারেরও অধিক আহতদের স্মরণ করেন। তিনি বলেন, আজ আমরা স্মরণ করছি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আত্ম-উৎসর্গকারী দেড় হাজার শহীদ ও পঁচিশ হাজারেরও অধিক আহত শিক্ষার্থী-জনতা যারা মারাত্মক জখম, পঙ্গুত্ব ও অন্ধত্বের শিকার হয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও ছাত্র-জনতা কোটা সংস্কারের দাবিতে এক ঐতিহাসিক গণজাগরণ সৃষ্টি করেন। যে আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন সমাজ এবং ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না বরং এটি ছিল শাসক গোষ্ঠীর দীর্ঘ দিনের নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে জনগণের অধিকার আদায়ের একটি মহাজাগরণ ও মরণপণ প্রয়াস।
প্রসিকিউশনের মূল দাবি : ‘আমরা যে অভিযোগপত্র মাননীয় ট্রাইবুনালে পেশ করেছি এবং যেসব তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে যাচ্ছি, তা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করবে যে এই অপরাধগুলো ছিল পূর্বপরিকল্পিত, পদ্ধতিগতভাবে ও ব্যাপকমাত্রায় সংগঠিত এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে পরিচালিত। উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করা, ভয় সৃষ্টি করা এবং জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষাকে দমন করা।’ প্রসিকিউশন আরো জানায়, এই অপরাধ শুধু কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং ‘একটি জাতির স্বপ্ন ও অস্তিত্বের ওপর আঘাত হেনেছে।’
হানিফসহ অভিযুক্ত ৪ নেতা : মামলার চারজন আসামিই পলাতক। তাদের মধ্যে প্রধান আসামি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো: মাহবুবউল আলম হানিফ-এর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অবস্থানকে ফোকাস করা হয়েছে। অন্য তিন আসামিও কুষ্টিয়া জেলা ও শহর আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। এর মধ্যে এক নম্বর আসামি হানিফ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। দ্বিতীয় আসামি মো: সদর উদ্দিন খান: কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি। তৃতীয় আসামি মো: আসগর আলী: কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। চতুর্থ আসামি মো: আতাউর রহমান আতা: কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।
আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করে কিছু কথা বলার জন্য ট্রাইব্যুনালের অনুমতি চান। অনুমতি পাওয়ার পর তিনি বলেন, আমি প্রসিকিউশনের বক্তব্যের কিছু অংশের সাথে একমত। তবে আমরা (আসামিরা) আওয়ামী লীগ করি। তাই শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ করার কারণে যেন বিচার না হয়। এ সময় ট্রাইব্যুনাল বলেন, আল্লাহকে হাজির-নাজির রেখে আমরা এখানে ন্যায়বিচার করতে বসেছি। কোনো নির্দোষ মানুষ যেন বিচারের মুখোমুখি না হন। অভিযুক্তরাও বিচার পাওয়ার অধিকার রাখেন। অতএব আপনার শঙ্কা রাখার কারণ নেই। এ সময় প্রসিকিউশনের পক্ষে মিজানুল ইসলাম বলেন, এই বিচার প্রক্রিয়া কোনো রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নয়। রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তির ছত্রছায়ায় যেন কেউ অপরাধ করার সাহস না পান সে জন্য এই বিচার।
কুষ্টিয়ায় ৬ জনকে হত্যার অভিযোগ : প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে কুষ্টিয়ায় শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলছিল। এই আন্দোলন দমনে আসামিরা তাদের অবৈধ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখেন।
বিশেষত, ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে কুষ্টিয়া সদর মডেল থানা এলাকায় আসামিদের অধীনস্থ ও নিয়ন্ত্রণাধীন পুলিশ ও সশস্ত্র আওয়ামী সন্ত্রাসীরা আক্রমণ করে। বেলা ১টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কুষ্টিয়া সদর মডেল থানার গেটের সামনের রাস্তা, ফায়ার সার্ভিস এলাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিনা উসকানিতে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এতে নিহত হন ছয়জন। তারা হলেন, শিক্ষার্থী: মো: আব্দুল্লাহ আল মুস্তাকিন ও মো: উসামা। শ্রমিক: মো: সুরুজ আলী বাবু ও মো: আশরাফুল ইসলাম। অন্যান্য: ব্যবসায়ী মো: বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী মো: ইউসুফ শেখ।
প্রসিকিউশন তাদের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো: মাহবুবউল আলম হানিফ বিভিন্ন সময়ে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ নেতা এবং কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলন দমনে ‘সর্বোচ্চ বল প্রয়োগের নির্দেশ’ দেন।
সদর উদ্দিনের ভূমিকা : আসামি মো: সদর উদ্দিন খান হানিফের নির্দেশে ও নেতৃত্বে কুষ্টিয়া জেলায় অবস্থান করে তার অধঃস্তনদের দ্বারা হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনে সর্বোচ্চ বল প্রয়োগ নিশ্চিত করেন। প্রসিকিউশন দাবি করে, আসামিরা তাদের উচ্চতর অবস্থান (সুপিরিয়র/কমান্ড রেসপনসিবিলিটি) থেকে নির্দেশনা দিয়ে তাদের অধীনস্থ সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী এবং শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনকারী পুলিশ সদস্যদের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
প্রমাণের শৃঙ্খল ও সাক্ষীর তালিকা : প্রসিকিউশন আদালতকে জানায়, তারা একটি অবিচ্ছিন্ন ও সুদৃঢ় প্রমাণশৃঙ্খল উপস্থাপন করবে। এই মামলায় মোট ৩৮ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেবেন।
সাক্ষীর তালিকা : শহীদ পরিবারের সাক্ষী (৮ জন), প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী (৮ জন), আহত সাক্ষী (৮ জন), আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সাক্ষী ৬ জন, পুলিশ সাক্ষী (১ জন), সাংবাদিক সাক্ষী (১ জন), জব্দ তালিকার সাক্ষী ২ জন, বিশেষজ্ঞ সাক্ষী (২ জন), বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ১ জন এবং তদন্ত কর্মকর্তা।
প্রধান প্রমাণাদি : ভিডিও ক্লিপ (১৩টি), অডিও ক্লিপ (৩টি), স্থির চিত্র (১১টি), সরকারি নির্দেশনা, ফরেনসিক রিপোর্ট, নিহত ও আহতদের গেজেট। এ ছাড়া, ১৪ জুলাই, ২০২৪ তারিখে শেখ হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্য, তার ফোনালাপ (যেমন জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সাথে) এবং মোবাইল ফোনের সিডিআর প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হবে।
প্রসিকিউশন তাদের বক্তব্য শেষ করে একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়ে। তারা বিশ্ব নেতাদের উদাহরণ টেনে বলেন, বিশ্বের অনেক গণহত্যাকারী স্বৈরশাসক বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন এবং শেখ হাসিনা ওয়াজেদ সেই তালিকার সর্বশেষ সংযোজন।
প্রসিকিউশন সর্বশেষ আবেদনে বলেন, আমরা চাই এই বিচার জাতির সভ্যতার ঐতিহাসিক যাত্রাপথে এক উজ্জ্বল মাইলস্টোন হিসেবে স্থান পাক, যাতে আগামীর বাংলাদেশে কেউ যেন গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের সাহস না দেখায়। এই বিচার প্রমাণ করবে যে, দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তিকেও আইনসম্মত জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায় এবং কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অপরাধীরা যত শক্তিশালীই হোক- রাষ্ট্র তাকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করতে সক্ষম। বিচার মানে ন্যায়বিচার। বিচার মানে অপরাধের পুনরাবৃত্তির বিরুদ্ধে বজ্রকঠিন বার্তা ‘নেভার এগেইন’।



