শাহ আলম নূর
নির্বাচনী বছর সামনে রেখে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কৃষি প্রণোদনা, সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা, জ্বালানি ভর্তুকি এবং অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয়ের চাপ সরকারের জন্য স্বাভাবিকভাবেই বেশি। কিন্তু এই প্রয়োজনীয় ব্যয়ের সাথে রাজস্ব আদায়ের গতি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫) রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বড় অংশ অপূর্ণ থাকায় বাজেট বাস্তবায়নের চাপ নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, করজালের সীমিত বিস্তার, আমদানি সঙ্কোচন, মূল্যস্ফীতিজনিত ভোক্তা চাহিদার পতন এবং ধীরগতির কর প্রশাসন রাজস্ব আহরণকে গতি দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে নির্বাচনী বছরে সরকারকে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থছাড়, ব্যাংক ঋণের ওপর অতিনির্ভরতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা মোকাবেলা করতে হতে পারে।
প্রথমার্ধের রাজস্ব প্রাপ্তি : লক্ষ্য বনাম বাস্তবতা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে এক লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ২.১৪ লাখ কোটি টাকার চেয়ে ৫৮ হাজার কোটি টাকা কম।
টেবিল থেকে দেখা যায়, মূল ঘাটতি এসেছে শুল্ক আয়ের হ্রাসে, যা আমদানি সঙ্কোচন ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের কারণে হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শুল্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং অভ্যন্তরীণ করভিত্তি সম্প্রসারণে ধীরগতি দেশের রাজস্ব ঘাটতির মূল কারণ। ডলার সঙ্কটের ফলে কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের আমদানি কমে গেছে, ফলে বন্দরে রাজস্ব প্রবাহ বাধাগ্রস্ত। একই সাথে রফতানিমুখী শিল্পও কাঁচামাল সঙ্কটে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে, যা ভ্যাট ও আয়কর দুই খাতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
কর প্রশাসন ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা
রাজস্ব ঘাটতি শুধু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব নয়, বরং কাঠামোগত কারণেও গভীর।
প্রথমত-করজাল ও করদাতার সীমিত বিস্তার : নতুন করদাতাদের অন্তর্ভুক্তি ধীর এবং বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী এখনও করজালের বাইরে।
দ্বিতীয়ত-প্রশাসনিক অদক্ষতা : মাঠপর্যায়ে দক্ষ জনবল কম; ডিজিটাল রিটার্ন ও রিফান্ড প্রক্রিয়া অর্ধেক-অনলাইনে এবং কাস্টমসে পণ্যের মূল্যায়ন নিয়ে বিরোধ লেগে থাকে।
তৃতীয়ত-ভ্যাট ও আয়কর খাতের মন্থর প্রবৃদ্ধি : ভ্যাট আদায় কমেছে ভোক্তা চাহিদার হ্রাসের কারণে; আয়কর প্রবৃদ্ধি সীমিত; নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্তির গতি ধীর এবং করজাল বাইরে থাকা মধ্যবিত্ত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এখনো কর পরিশোধে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
নির্বাচনী বছরে ব্যয়ের চাপ
নির্বাচনী বছর অর্থনীতির জন্য বিশেষ চাপ তৈরি করে। সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা, কৃষি প্রণোদনা, জ্বালানি ভর্তুকি ও অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয়ের চাপ বেড়ে যায়। এ সময় সরকারি ব্যয় কমানো রাজনৈতিকভাবে কঠিন। রাজস্ব ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস, বিশেষ করে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করছে। আর ব্যাংক খাতে ইতোমধ্যে তারল্য সঙ্কট এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্কোচনমূলক নীতির ফলে সুদের হার বেড়ে গেছে, যা বেসরকারি বিনিয়োগকে সঙ্কুচিত করছে।
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘রাজস্ব কমলে সরকার ঋণ বাড়ায়, আর ঋণ বাড়লে বিনিয়োগ কমে যায়- এই চক্রে অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়ে পড়ে।’
বাজেট বাস্তবায়ন ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি
এই পরিস্থিতির উন্নয়ন কর্মসূচিতে প্রভাব পড়বে। এতে এডিপি প্রকল্পে বরাদ্দ স্থগিত বা ধীরগতি নামবে; স্থানীয় সরকার ও গ্রামীণ অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থপ্রবাহ কমে গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য ব্যাহত হতে পারে এবং নির্বাচনী বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
এতে অর্থনীতিতে দ্বিমুখী চাপ পড়বে। রাজস্ব ঘাটতি বেড়ে গেলে মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার ও বিনিময় হারে চাপ সৃষ্টি হয়। আর অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আরো সঙ্কুচিত হবে।
এ অবস্থায় শুল্ক ও আমদানি নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। শুল্ক দেশের প্রধান রাজস্ব উৎস, কিন্তু আমদানির সঙ্কোচনের কারণে আয়ের প্রবাহ হ্রাস পায়। আর রফতানিমুখী শিল্প কাঁচামাল সঙ্কটে উৎপাদন কমাতে বাধ্য।
প্রস্তাবিত সমাধান
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বল্পমেয়াদি চাপ প্রয়োগে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন: কর প্রশাসন সংস্কার; করভিত্তি সম্প্রসারণ; নগদ লেনদেন কমানো; সম্পদ ও সম্পত্তি কর কার্যকর করা এবং ডিজিটাল লেনদেন ট্র্যাকিং বৃদ্ধি।
করদাতা অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রয়োজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ টার্নওভার ট্যাক্স এবং পেশাজীবীদের জন্য স্বঘোষণাভিত্তিক ব্যবস্থা।
সে সাথে কর ছাড় ও প্রণোদনা পুনর্মূল্যায়নে বড় প্রকল্পে কর ছাড়ের কার্যকারিতা মূল্যায়ন প্রয়োজন। নিশ্চিত করা দরকার যে কর ছাড় বিনিয়োগে কাজে লাগছে, মুনাফা স্থানান্তরে নয়।
প্রশাসনিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে দরকার-ভ্যাট রিটার্ন সহজ করা; শুল্কায়নে স্বচ্ছ মূল্য তালিকা ও দ্রুত রিফান্ড এবং অনানুষ্ঠানিক খাতকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে আনা।
নির্বাচনী বছরে সরকারকে কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। এক দিকে জনপ্রিয় ব্যয় বজায় রাখা, অন্য দিকে আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। রাজস্ব ঘাটতি না বাড়ালে মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার ও বিনিময় হারে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। তাই কার্যকর সংস্কার ও বাস্তবসম্মত ব্যয় অগ্রাধিকারই এখন বাজেট বাস্তবায়নের একমাত্র উপায়।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন : শুধু চাপ প্রয়োগ বা ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। রাজস্ব ব্যবস্থায় বিশ্বাসযোগ্যতা, সেবামুখী প্রশাসন এবং তথ্যভিত্তিক নীতি ছাড়া কাক্সিক্ষত ফলাফল অর্জন করা সম্ভব নয়।



