স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণে চাপ হ্রাস বাণিজ্য অর্থায়নে বড় পরিবর্তন

বায়ার্স ক্রেডিট কমছে, বাড়ছে এক্সপোর্ট বিল ডিসকাউন্টিং; মে শেষে বেসরকারি খাতের স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ ১০.২৫ বিলিয়ন ডলার

বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য। ২০২৬ সালের মে শেষে মোট স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০.২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা মার্চের তুলনায় কিছুটা বেশি হলেও জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির তুলনায় নিম্নমুখী। তবে সামগ্রিক ঋণের আকার স্থিতিশীল থাকলেও অর্থায়নের উৎস ও ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য। ২০২৬ সালের মে শেষে মোট স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০.২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা মার্চের তুলনায় কিছুটা বেশি হলেও জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির তুলনায় নি¤œমুখী। তবে সামগ্রিক ঋণের আকার স্থিতিশীল থাকলেও অর্থায়নের উৎস ও ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের এফআইইডি ম্যানেজমেন্ট সেলের তথ্যানুযায়ী, এক সময় বৈদেশিক বাণিজ্য অর্থায়নের প্রধান উৎস হিসাবে ক্রেতার ক্রেডিট হিসাবে কমছে। রফতানি বিল ডিসকাউন্টিং দ্রুত রফতানি, যা রফতানিকারদের নগদ প্রবাহের চাহিদা বৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করছে।

বায়ার্স ক্রেডিটে বড় পতন

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্রেতার ক্রেডিট ছিল ৫.০৮৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের মে মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৩৪৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রায় ৭৩৪ মিলিয়ন ডলার বা ১৪.৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

এটি ইঙ্গিত করে যে বিদেশী সরবরাহকারীদের কাছ থেকে সহজ শর্তে ঋণনির্ভর আমদানি আগের তুলনায় কমেছে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে- আন্তর্জাতিক সুদের হার এখনো তুলনামূলক বেশি; বৈদেশিক ঋণ গ্রহণে ব্যাংকগুলোর সতর্কতা; আমদানিতে নিয়ন্ত্রিত প্রবৃদ্ধি এবং ডলারের ব্যয় বৃদ্ধি।

রফতানি বিল ডিসকাউন্টিংয়ে শক্তিশালী উত্থান

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে রফতানি বিল ডিসকাউন্টিংয়ে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এর পরিমাণ ছিল ২.০৫৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের মে মাসে তা বেড়ে হয়েছে ২.৮৯৪ বিলিয়ন ডলার। মাত্র ১৬ মাসে বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ।

এটি বোঝায়, রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো রফতানি বিলের অর্থ দ্রুত হাতে পেতে আগের তুলনায় বেশি ডিসকাউন্টিং সুবিধা নিচ্ছে। বৈশ্বিক বাজারে দীর্ঘতর পেমেন্ট সাইকেল এবং কার্যকর মূলধনের চাহিদা বৃদ্ধিও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

ডিফার্ড পেমেন্টেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা

বিলম্বিত অর্থপ্রদান ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ছিল ৬২৯ মিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের মে মাসে তা বেড়ে হয়েছে ৭৪০ মিলিয়ন ডলার। যদিও প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক ধীর, তবুও এটি নির্দেশ করে আমদানিকারকরা পরিশোধের সময় বাড়ানোর সুবিধা বেশি ব্যবহার করছে।

বিদেশী ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ২০২৫ সালের শুরুতে ছিল ১.৩২৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের মে মাসে তা ১.২৬০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এটি তৈরী পোশাকসহ রফতানিমুখী শিল্পে কাঁচামাল আমদানির অর্থায়নে বড় ধরনের পরিবর্তন না থাকার ইঙ্গিত দেয়।

মোট ঋণ স্থিতিশীল, কিন্তু ওঠানামা রয়েছে

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মোট স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ ছিল ৯.৮০৪ বিলিয়ন ডলার। এক বছর পর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০.৪৬৬ বিলিয়ন ডলার। এরপর ফেব্রুয়ারিতে সর্বোচ্চ ১০.৬০১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও মার্চে তা নেমে আসে ১০.১৯৯ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৬ সালের মে শেষে মোট ঋণ ১০.২৫৪ বিলিয়ন ডলারে অবস্থান করছে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে ঋণের পরিমাণ ১০ থেকে ১০.৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, যা তুলনামূলক স্থিতিশীল প্রবণতা নির্দেশ করে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ২.৭৪ শতাংশ; ফেব্রুয়ারিতে ১.২৮ শতাংশ; মার্চে -৩.৭৯ শতাংশ; এপ্রিলে ১.২৯ শতাংশ; মে মাসে -০.৭৪ শতাংশ। এ থেকে বোঝা যায়, বড় ধরনের ঋণ সম্প্রসারণের পরিবর্তে বাজার এখন সমন্বয় পর্যায়ে রয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা কী বলছেন

অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্রেতা ঋণ কমে যাওয়া এবং রফতানি বিল ডিসকাউন্টিং বাড়া বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য অর্থায়নের কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত। উচ্চ বৈশ্বিক সুদের হার, ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের পরিবর্তে বিকল্প অর্থায়নব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।

তাদের মতে, যদি রফতানি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকে এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজার স্থিতিশীল হয়, তবে রফতানি বিল ডিসকাউন্টিংয়ের প্রবণতা আরো বাড়তে পারে। তবে একই সাথে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের গুণগত মান এবং পরিশোধ সক্ষমতার ওপর নিবিড় নজর রাখা জরুরি।

অর্থনীতিবিদদের প্রধান পর্যবেক্ষণ হলো-মোট স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ এখনো ১০ বিলিয়ন ডলারের ওপর; ক্রেতার ক্রেডিট প্রায় ১৪.৪ শতাংশ আছে; রফতানি বিল ছাড় প্রায় ৪১ শতাংশ। আমদানি অর্থায়নের পরিবর্তে রফতানিভিত্তিক অর্থায়নের গুরুত্ব বাড়ছে; ঋণের মোট আকারের তুলনায় অর্থায়নের কাঠামোগত পরিবর্তনই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

এই তথ্যগুলো ইঙ্গিত দেয় যে বাংলাদেশের বেসরকারি খাত বৈদেশিক অর্থায়নে আগের তুলনায় আরো সতর্ক ও বৈচিত্র্যময় কৌশল গ্রহণ করছে। একই সাথে রফতানিমুখী অর্থায়নের গুরুত্ব বাড়ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি ও আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।