হাবিবুল বাশার
‘আমি যাবোই। দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আমি আর ঘরে ফিরব না। আমাকে আটকানোর চেষ্টা করবেন না।’ কথাগুলো বলছিল বাবাকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া কিশোর সৈয়দ মুনতাসির রহমান আলিফ। বাবা সৈয়দ মো: গাজীউর রহমান বলেন, শহীদদের বিভক্ত করা হচ্ছে, তাদের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করতে পারছে না সরকার। মাত্র ১৫ বছরের এক অদম্য কিশোর যাত্রাবাড়ীতে ফ্যাসিবাদের বুলেটের আঘাতে থেমে যায়।
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনে যাত্রাবাড়ী এলাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ওখানে বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া যাত্রাবাড়ী মাদরাসা ও আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাবেক এবং বর্তমান শিক্ষার্থীরা। তাদেরই একজন ছিলেন তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার আলিম প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থী মুনতাসির রহমান আলিফ।
কিশোর শহীদের বেড়ে ওঠা
২০০৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলার দৌলখাঁ দেওভান্ডারের গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আলিফ। সন্তানকে হাফেজ বানানোর তীব্র ইচ্ছায় বাবা তাকে মাদরাসায় ভর্তি করিয়েছিলেন। সম্পূর্ণ কুরআনে হাফেজ হতে না পারলেও পড়াশোনায় নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। জিপিএ ৫ পেয়ে কৃতিত্বের সাথে দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন । এরপর ঢাকার তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসায় আলিম প্রথম বর্ষে ভর্তি হন।
আলিম প্রথম বর্ষের পরীক্ষার পর বাবা যখন তাকে গ্রামের বাড়ি ঘুরে আসার প্রস্তাব দেন আলিফ তখন কম্পিউটার আর ইংরেজি ভাষা শিখতে কোচিংয়ে ভর্তি করে দেয়ার অনুরোধ জানায়। বাবা ছেলের ইচ্ছাকে প্রধান্য দিয়ে ভর্তি করিয়ে দেন। কিন্তু সেই কোচিং থেকেই শুরু হয় তার জীবনের এক অন্যরকম অধ্যায়; দেশের মুক্তির আন্দোলনে শামিল হওয়ার সুযোগ ।
১৮ জুলাই : গুলিতে ঝাঁঝরা আলিফ
ছোটবেলা থেকেই ইসলামী মূল্যবোধ ও আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন আলিফ। সে ছিল বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী। ২০২৪-এর ১৬ জুলাই যখন রংপুরে আবু সাঈদসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য ছাত্র-জনতা পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হন, তখন থেকেই কিশোর আলিফের মন আর ঘরে টিকছিল না। ১৮ জুলাই বাসা থেকে কোচিংয়ের কথা বলে বেরিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে যোগ দেয়। সেদিনই পুলিশের ছররা গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় তার শরীর। প্রাথমিক চিকিৎসা করিয়ে বাসায় ফিরলেও বাবা-মাকে সে বিষয়ে কিছুই জানায়নি। তীব্র যন্ত্রণা ও ক্ষত নিয়েই প্রতিদিন কোচিংয়ের বাহানায় সে আন্দোলনে ছুটে যেত। আলিফের বাবার সাথে সাথে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন মা শিরিন সুলতানাও।
যাত্রাবাড়ী এলাকায় পুলিশ, বিজিবি ও আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর বর্বরতা আলিফকে চরম ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। বড় ভাইদের প্রাণ বিসর্জন দিতে দেখে আলিফ ঘরের কোণে নিরাপদ আশ্রয় বেছে নিতে চায়নি। তার বাবা বলেন, যখনই তাকে বারণ করা হতো, আলিফ তখনই বলতো এভাবে দেশ চলতে পারে না। মানুষ, ছাত্র, শ্রমিক সবাই জীবন দিচ্ছে। আমি ঘরে বসে থাকতে পারব না।
৫ আগস্ট : ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ শাহাদতের সময়
৫ আগস্ট ছিল স্বৈরাচার পতনের ও আন্দোলনের চূড়ান্ত মুহূর্ত। ছেলের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে সেদিন সকালে বাবা তাকে ঘরের ভেতর তালা দিয়ে আটকে রেখেছিলেন, মায়েরও ছিল কঠোর নিষেধ। তার বাবা জানায়, আমরা কাজে ব্যস্ত হতেই আলিফ ছুটে যান ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে। জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া যাত্রাবাড়ী মাদরাসার সামনে ছাত্র-জনতার সাথে আন্দোলনে লড়ছিল সে। আর ঠিক সেখানেই ফ্যাসিবাদের দোসরদের বুলেট তার মাথায় আঘাত হানে। মাথার খুলি ফেটে গুলি ভেতরে ঢুকে যায়; থেমে যায় জীবনের পথচলা।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলেও আলিফ বাসায় ফিরছিল না। বাবা বন্ধুদের ফোন করলে তারা জানান, আলিফ হয়তো বিজয় মিছিলে গণভবনের দিকে গেছে। সন্ধ্যায় স্থানীয় মসজিদগুলো থেকে মাইকিং হতে থাকে অজ্ঞাতনামা লাশের বিবরণ দিয়ে। বাবা ছুটে যান বিভিন্ন স্থানীয় হাসপাতালে, কিন্তু সেখানে আলিফকে পাননি। অবশেষে চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে গিয়ে খোঁজ নিতে বলেন।
আলিফের বাবা বলেন, রাত তখন প্রায় ১১টা। ঢাকা মেডিক্যালে গিয়ে জানতে পারি, গুরুতর আহত ও নিহতদের অনেককে সেখানে আনা হয়েছে। একপর্যায়ে মর্গের ভেতরে গিয়ে দেখি, সারি সারি তরুণের লাশ। কোথা থেকে শুরু করব, বুঝতে পারছিলাম না। হঠাৎ একটি ডান হাত দেখে আমার বুক কেঁপে উঠল। দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বললাম, ‘এটা একটু দেখান।’ তারা কয়েকটি লাশ সরিয়ে তার একটি পা বের করলেন। পরনের সাদা পায়জামা, পায়ের নখের পরিচিত একটি দাগ দেখে বুঝে গেলাম, এটাই আমার আলিফ। তখনও তার মুখ পতাকায় ঢাকা ছিল। মুখ দেখতে চাইলেও দেখানো হয়নি। সেই মুহূর্তটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা যেন আমার সামনে থেমে গেছে।
লাশ নিয়ে তারা সেগুনবাগিচায় কোয়ান্টামে যান। অ্যাম্বুলেন্সের চালক বলেছিলেন, এত রক্তমাখা লাশ অনেকে গোসল দিতে চাইবে না। কোয়ান্টামে গোসল ও কাফন শেষে কর্তৃপক্ষ ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ ছাড়া লাশ দিতে অস্বীকৃতি জানালে, তাদেরকে পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে বন্ডসই দিয়ে ৬ আগস্ট ফজরের সময় কাজলার বাসায় ছেলের লাশ নিয়ে আসেন গাজীউর রহমান।
৬ আগস্ট ভোরেই আলিফের লাশ নিয়ে যাওয়া হয় তার স্থায়ী ঠিকানা কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলার দৌলখাঁ দেওভান্ডারের গ্রামে। সেখানে জোহরের নামাজের পর এক আবেগঘন পরিবেশে বাবা সৈয়দ গাজীউর রহমান নিজেই তার একমাত্র সন্তানের নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন। এরপর পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় দেশের জন্য প্রাণ দেয়া এই বীর কিশোরকে।
শহীদের পরিবারের দাবি
গাজীউর রহমান বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির পর প্রশাসন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কেউ আর তাদের সাথে যোগাযোগ করেনি। মামলার অগ্রগতি সম্পর্কেও পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি। যাদের রক্তের ওপরে সরকার তারা গণভোটের রায় মেনে নিচ্ছে না। তিনি বলেন, সরকারি অনুষ্ঠানে সব শহীদ পরিবারকে সমানভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। কিছু নির্দিষ্ট পরিবারকে নিয়ে অনুষ্ঠান করা হয়েছে, যেখানে বিশৃঙ্খলার ঘটনাও ঘটেছে। শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে বিভক্তির অনুভূতি তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। পরিবার দাবি করে, যাদের আত্মত্যাগে পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়েছিল, সময়ের সাথে সাথে সেই শহীদ পরিবারগুলোকেই মানুষ ভুলে যাচ্ছে। গণভোটও অস্বীকার করছে। সরকার বলছে গণভোট তখন মেনেছি শুধু নির্বাচনটা যাতে তাড়াতাড়ি হয়। গণভোটের পক্ষে তো আমরা ছিলাম না। তারা শহীদের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন না করে জাতির সাথে প্রতারণা করছেন।



