স্ব-ঘোষিত কমিটি, আমলাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, পদায়ন-বাণিজ্য ও কোটি টাকার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে এ বি এম আব্দুস সাত্তার
ঢাকার রাজনৈতিক অঙ্গন যখন নির্বাচনী পোস্টার, সভা-সমাবেশ আর স্লোগানে মুখর, তখন আরেকটি রাজনীতি চলছে নীরবে- কোনো মাইক নেই, ব্যানার নেই, জনসভা নেই। তবু সেই রাজনীতির শক্তি বেশি। কারণ সেখানে ব্যালট নয়, কাজ করছে টাকা। প্রতিশ্রুতি নয়, কাজ করছে প্রভাব। আর ভোট নয়, নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে ভবিষ্যৎ সরকার।
১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এমন এক নীরব ‘অপারেশন’-এর অভিযোগ উঠেছে, যার লক্ষ্য শুধু কে জিতবে তা নয়- বরং যে কেউ জিতলেও সরকার কাদের কথায় চলবে।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সূত্র, ব্যবসায়িক মহলের অভ্যন্তরীণ তথ্য এবং সংশ্লিষ্টদের কথোপকথন মিলিয়ে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দেয়। অভিযোগ- এই নেটওয়ার্ক অর্থায়ন, ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও কূটনৈতিক সংযোগ ব্যবহার করে নির্বাচন-পরবর্তী সরকারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।
এই বলয়ের কেন্দ্রে উঠে এসেছে বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের কর্ণধার এস আলম মাসুদের নাম।
দৃশ্য এক : চট্টগ্রামের একটি বাড়ি
চট্টগ্রামের বোয়ালখালী এলাকায় একটি নিরিবিলি আবাসিক বাড়ি। বাইরে থেকে সাধারণ। কিন্তু স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি- নির্বাচনের আগে রাত-বিরাতে সেখানে নিয়মিত গাড়ি আসা-যাওয়া করছে। কখনো করপোরেট কর্মকর্তারা, কখনো রাজনৈতিক মুখ।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এটা সাধারণ বাড়ি না। এখানে ‘মিটিং’ হয়। অনেক সময় ব্যাগ নিয়ে লোক ঢোকে আর বের হয়।”
এই বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে একাধিক সূত্র একই ধরনের তথ্য দিয়েছে- যা এই অনুসন্ধানের সূচনা করে।
নির্বাচন নয়, ‘পলিসি ক্যাপচার’ : একজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘এটা ভোট কারচুপি না। এটা অনেক বড়। এটা পলিসি ক্যাপচার- সরকার গঠনের আগেই তাকে নিয়ন্ত্রণে নেয়া।’
‘পলিসি ক্যাপচার’- অর্থাৎ ভবিষ্যৎ সরকারের নীতি, সিদ্ধান্ত, আর্থিক খাত ও কৌশলগত অবস্থানকে আগাম প্রভাবিত করা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শুরুতে পরিকল্পনা ছিল নির্বাচন প্রক্রিয়াকে অকার্যকর বা বিতর্কিত করা। কিন্তু বাস্তবতায় সেই পথ কঠিন হওয়ায় কৌশল বদলায়। এখন লক্ষ্য- যারা জিততে পারে, তাদের বিনিয়োগের তালিকায় আনা।
নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দু : এস আলম সাম্রাজ্য
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও বিদ্যুৎ-আমদানি খাতে এস আলম গ্রুপের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক আছে। ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা, ঋণ বিতরণ, খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা- এসব নিয়ে বহুবার প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সেই পুরনো প্রভাব হারানোর পর এখন নতুন করে ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরতে চাইছে এই বলয়। একজন অর্থনীতিবিদ বলেন, “ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো সবসময় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চায়। কিন্তু যখন তারা সরকারকে ‘কন্ট্রোল’ করতে চায়, তখন সেটা শুধু ব্যবসা থাকে না- রাষ্ট্রীয় ঝুঁকি হয়ে যায়।” সূত্রগুলো বলছে, এস আলম মাসুদের পাশাপাশি কয়েকজন করপোরেট ও রাজনৈতিক ব্যক্তি সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছেন। তাদের কাজ- যোগাযোগ তৈরি, সমঝোতা, আর্থিক সহায়তা ও কূটনৈতিক সংযোগ।
অর্থের স্রোত : কারা পাচ্ছেন?
মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, বিএনপির একাধিক ‘উইনেবল’ বা সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থীর সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তার অভিযোগও উঠেছে। বিশেষ করে কক্সবাজার-১ আসনের প্রার্থী ও একটি দলের প্রভাবশালী নেতার নাম স্থানীয়ভাবে বেশি আলোচিত।
অভিযোগ অনুযায়ী- একাধিকবার নগদ সহায়তা; ব্যক্তিগত প্রতিনিধির মাধ্যমে যোগাযোগ এবং ভবিষ্যৎ নীতিগত প্রতিশ্রুতি।
সূত্রগুলোর দাবি, এর বিনিময়ে যে প্রতিশ্রুতিগুলো আলোচনা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- ভারতের অনুকূলে কৌশলগত অবস্থান; ইসলামী ব্যাংকিং খাতে পূর্ববর্তী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং এস আলম গ্রুপের আর্থিক স্বার্থ সুরক্ষা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
অন্যান্য ‘হেভিওয়েট’ যোগাযোগ : চট্টগ্রাম ও ঢাকার কয়েকজন শক্তিশালী প্রার্থীর সাথেও যোগাযোগের কথা জানিয়েছে সূত্রগুলো।
তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী।
একজন দলীয় নেতা বলেন, ‘এটা কোনো এক দলের বিষয় না। যে জিততে পারে- তাকে ধরার চেষ্টা হচ্ছে।’
অর্থাৎ কৌশলটি দলনিরপেক্ষ; লক্ষ্য শুধু ক্ষমতা।
কূটনৈতিক মাত্রা : বিদেশী সংযোগ
সবচেয়ে স্পর্শকাতর অভিযোগটি এখানেই। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কয়েকজন প্রার্থীকে চট্টগ্রামে অবস্থিত একটি বিদেশী কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিদের সাথে পরিচয় করানো হয়েছে। এই বৈঠকগুলোতে নির্বাচন-পরবর্তী নীতি ও আঞ্চলিক স্বার্থ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের দাবি। যদি তা সত্য হয়, তবে বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক নয়- সরাসরি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক বলেন, ‘বিদেশী কূটনীতিকদের সাথে প্রার্থীরা দেখা করতেই পারে। কিন্তু যদি নীতিগত প্রতিশ্রুতি বা ব্যবসায়িক সুরক্ষার চুক্তি হয়, তাহলে সেটা অস্বাভাবিক ও উদ্বেগজনক।’
কূটনৈতিক মহল এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
অর্থ বিতরণের কাঠামো : অভিযোগ অনুযায়ী, পুরো অর্থব্যবস্থাপনা তিন স্তরে পরিচালিত হচ্ছে- ১. করপোরেট অফিস; ২. ব্যক্তিগত প্রতিনিধি; ৩. নগদ বিতরণ কেন্দ্র। একাধিক সূত্রের দাবি, নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা এই অর্থ লেনদেন তদারক করছেন। যদিও এখনো পর্যন্ত কোনো ব্যাংক লেনদেনের নথি প্রকাশ্যে আসেনি।
একজন সাবেক ব্যাংকার বলেন, ‘নগদ ব্যবহার মানেই ট্রেইল লুকানো।’
‘আওয়ামী পুনর্বাসন’ ইস্যু : এই অনুসন্ধানের আরেকটি মাত্রা- রাজনৈতিক পুনর্বাসন। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতা হারানোর পর আওয়ামী ঘনিষ্ঠ কিছু অর্থনৈতিক বলয় নতুন সরকারেও প্রভাব বজায় রাখতে চাইছে।
এ জন্য তারা সরাসরি নিজেদের প্রার্থী দাঁড় করাচ্ছে না; বরং সম্ভাব্য বিজয়ীদের ‘সমর্থন’ দিচ্ছে। একজন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক বলেন, ‘এটা ব্যাকডোর রিটার্ন। সামনে অন্য দল, পেছনে পুরনো বলয়।”
কেন এত আগ্রহ ব্যাংক খাতে?
বিশ্লেষকদের মতে, মূল লড়াই রাজনীতি নয়- ব্যাংকিং। ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ মানে- বড় অঙ্কের ঋণ; আমদানি-রফতানি সুবিধা; রাজনৈতিক প্রভাব এবং করপোরেট শক্তি। অর্থাৎ ব্যাংক দখল মানেই অর্থনীতি দখল।
নীরব লবিং নাকি প্রভাব বিস্তার অপারেশন?
ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো সাধারণত লবিং করে- এটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যখন অর্থায়ন, গোপন বৈঠক, বিদেশী সংযোগ ও নীতিগত প্রতিশ্রুতি একসাথে আসে- তখন সেটি আর লবিং থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে প্রভাব অপারেশন। একজন সাবেক আমলা বলেন, ‘এটা সফট পাওয়ার দিয়ে সরকার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা।’
রাষ্ট্রের সামনে যে প্রশ্নগুলো : রাষ্ট্রের সামনে যে প্রশ্নগুলো আসছে- প্রার্থীদের অর্থের উৎস কী? বিদেশী প্রভাব আছে কি? ব্যাংক খাতে গোপন চুক্তি হয়েছে কি? নির্বাচন কমিশন কি তদারকি করছে? দুদক কি নজরদারি করছে?
স্বচ্ছতা ছাড়া এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে না।
শেষ দৃশ্য : ভোটের আগে অদৃশ্য যুদ্ধ
ভোটের দিন মানুষ লাইনে দাঁড়াবে, আঙুলে কালি লাগবে, ফলাফল আসবে। কিন্তু তার আগেই যদি ভবিষ্যৎ সরকার কারো কাছে ‘ঋণী’ হয়ে যায়- তাহলে সেই ভোটের মূল্য কতটুকু? নির্বাচন শুধু ব্যালটের লড়াই নয়; এটি প্রভাব, পুঁজি ও ক্ষমতার অদৃশ্য যুদ্ধও। যদি অর্থ দিয়ে নীতি কেনা যায়, তবে গণতন্ত্র কাগজে থাকে- বাস্তবে নয়।
এই অনুসন্ধান তাই কেবল একটি ব্যবসায়ী বা কয়েকজন প্রার্থীর গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অর্থনীতি ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি- কারণ ব্যালটের আগেই যদি সরকার বন্দী হয়ে যায়, তাহলে নির্বাচনের অর্থ কী?



