তরুণদের নির্বাচন-পরবর্তী ভাবনা

ক্ষমতার পালাবদল না কাঠামোগত পরিবর্তন?

জাতীয় নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে তরুণদের ভাবনার জগতও। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-আন্দোলন থেকে শুরু করে ভোটের বাক্স পর্যন্ত যে পথচলা- তা এক প্রজন্মকে সরাসরি রাজনীতির কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছে। নির্বাচনের পর এখন প্রশ্ন একটাই- তরুণরা কী দেখছে? তারা কি আশাবাদী, নাকি নতুন হতাশার ভিত গড়ে উঠছে?

হারুন ইসলাম
Printed Edition

সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে তরুণদের ভাবনার জগতও। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-আন্দোলন থেকে শুরু করে ভোটের বাক্স পর্যন্ত যে পথচলা- তা এক প্রজন্মকে সরাসরি রাজনীতির কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছে। নির্বাচনের পর এখন প্রশ্ন একটাই- তরুণরা কী দেখছে? তারা কি আশাবাদী, নাকি নতুন হতাশার ভিত গড়ে উঠছে?

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, জেলা শহর ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কথা বলে যে চিত্র পাওয়া গেছে, তা একরৈখিক নয়। বরং সেখানে রয়েছে আশাবাদ, সংশয়, সতর্কতা এবং কিছু ক্ষেত্রে গভীর হতাশার মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অনেক তরুণের ভাষায়, ‘আমরা ভোট দিয়েছি পরিবর্তনের জন্য; এখন আমরা ফলাফল দেখতে চাই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের সময় আমরা রাজপথে ছিলাম। তখন মনে হয়েছিল, রাজনীতি শুধু দলীয় বিষয় নয়- এটা আমাদের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। নির্বাচনের পর অন্তত একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে- রাষ্ট্রকে নতুনভাবে ভাবার। তবে এখনই বড় পরিবর্তন চোখে পড়ছে না। মনে হচ্ছে একটা ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিট থেকে বেশ খানিকটা দূরে সরে এসে ক্ষমতা নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করেছে রাজনৈতিক দল । এটা অবশ্যই হতাশার।

রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর কয়েকজন তরুণ ভোটারের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিবেশ কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে বলে মনে করেন। বিশেষ করে সহিংসতা তুলনামূলক কমে আসা এবং প্রশাসনিক ভাষ্যে ‘সংলাপ’ শব্দের ব্যবহার বেড়েছে- এগুলোকে ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন অনেকে। তবে তাদের দাবি, এই স্থিতিশীলতা যদি কেবল উপরিভাগে সীমাবদ্ধ থাকে এবং বাস্তব জীবনে বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি ও শিক্ষাখাতে সঙ্কট অব্যাহত থাকে, তাহলে হতাশা দ্রুত ফিরে আসবে।

নির্বাচনের পর তরুণদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল জবাবদিহিমূলক রাজনীতি। জুলাই আন্দোলনের সময় যে ‘নৈতিক রাষ্ট্র’-এর স্বপ্ন সামনে এসেছিল, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর তা কতটা বাস্তবায়নের পথে- এ প্রশ্নই এখন তাদের আলোচনার কেন্দ্রে। অনেকেই বলছেন, নতুন সংসদ ও সরকারকে সময় দেয়া উচিত; আবার অন্য একটি অংশ মনে করে, আন্দোলনের দাবি যেহেতু স্পষ্ট ছিল, তাই দ্রুত কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ আসা প্রয়োজন। কিন্তু তারা স্পষ্টত কিছু দেখছে না। গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে জুলাই অভ্যুত্থানে পতিত সরকার আবার রাজনৈতিক দলগুলোর ছত্রছায়ায় উঠে আসছে।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাকিব বলেন, ‘আমাদের প্রজন্ম দীর্ঘদিন ধরে ভোট নিয়ে অনাস্থা দেখেছে। এবার আমরা অনেকেই ভোটকেন্দ্রে গেছি। তাই প্রত্যাশাও বেশি। নির্বাচনের পর যদি একই পুরনো চিত্র দেখি- দলীয়করণ, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ- তাহলে মানুষ আবার বিমুখ হবে।’ তার মতে, তরুণদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এখন আর আবেগনির্ভর নয়; এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইস্যুভিত্তিক হওয়া উচিত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের পর তরুণদের মনোভাব বোঝার জন্য তাদের রাজনৈতিক আচরণের পরিবর্তন লক্ষ করা জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এই প্রজন্ম দল নয়, নীতি দেখে। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়, তথ্য সংগ্রহে দক্ষ এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল। নির্বাচনের পর তারা দেখছে- কথা আর কাজে মিল আছে কি না।’

তার মতে, নির্বাচনের ফল যাই হোক, তরুণদের মধ্যে একধরনের রাজনৈতিক আত্মপরিচয় গড়ে উঠেছে, যা সহজে মুছে যাবে না।

অনেকে নির্বাচনের পর ‘স্বস্তি’ শব্দটি ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে অনিশ্চয়তার সময় পার করে একটি নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকার গঠন- এটিকে তারা ইতিবাচক মনে করছেন। তবে এই স্বস্তি স্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করছে প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার ওপর।

জুলাইয়ের আন্দোলন তরুণদের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিল- তার একটি ছিল রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন। নির্বাচনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লক্ষ করা গেছে, তরুণরা সংসদের কার্যক্রম, বাজেট প্রস্তাব, এমনকি নীতিনির্ধারণী বক্তব্য বিশ্লেষণ করছে। অনেকেই লাইভ আলোচনা আয়োজন করছেন, তথ্যভিত্তিক পোস্ট দিচ্ছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এটি একটি নতুন নাগরিক অংশগ্রহণের ধারা।

তবে হতাশার কথাও কম শোনা যাচ্ছে না। কিছু শিক্ষার্থী মনে করেন, নির্বাচনের পরও প্রশাসনিক নিয়োগ ও সিদ্ধান্তে পুরনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য রয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, আন্দোলনের সময় যে আদর্শিক ঐক্য দেখা গিয়েছিল, তা দলীয় বাস্তবতায় ভেঙে যেতে পারে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তুলি বলেন, ‘আমরা রাজপথে ছিলাম নিরপেক্ষ অধিকারের দাবিতে। এখন যদি আবার দলীয় বিভাজন প্রাধান্য পায়, তাহলে সেই আত্মত্যাগের মূল্য কোথায়?’ গ্রামের তরুণ ভোটারদের দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ। তারা বলছেন, তারা নির্বাচনের পর স্থানীয় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও কৃষিনীতিতে পরিবর্তন দেখতে চান। তাদের কাছে জাতীয় রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও দৈনন্দিন জীবনের প্রশ্ন আরো জরুরি।

যশোর এম এম কলেজের শিক্ষার্থী সাব্বির বলেন, ‘রাজনীতি বড় কথা; কিন্তু চাকরি না থাকলে সবকিছুই অর্থহীন।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের পর তরুণদের মনোভাবকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, ‘সতর্ক আশাবাদী’- যারা মনে করছেন পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে, তবে নজরদারি প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, ‘শর্তসাপেক্ষ সমর্থক’- যারা ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে অবস্থান বদলাতে প্রস্তুত। তৃতীয়ত, ‘নিরাশ সংশয়ী’- যারা মনে করেন কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া রাজনৈতিক পালাবদল খুব বেশি কিছু বদলায় না।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে তরুণদের ভূমিকা নতুন নয়; কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ। এই জনগোষ্ঠী যদি দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থাকে, তাহলে তা রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচনের পর তাই তরুণদের মধ্যে একধরনের ‘প্রহর গোনা’ মনোভাব কাজ করছে। তারা অপেক্ষা করছে প্রতিশ্রুত সংস্কার, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও ন্যায়বিচারের দৃশ্যমান অগ্রগতির জন্য। একই সাথে তারা প্রস্তুত- প্রয়োজনে আবারো প্রশ্ন তুলতে।

শেষ পর্যন্ত তরুণরা হতাশ না আশাবাদী- এই প্রশ্নের সরল উত্তর নেই। তারা একই সাথে দুটোই। তারা আশাবাদী, কারণ তারা অংশ নিয়েছে। তারা সতর্ক, কারণ ইতিহাস তাদের সাবধান হতে শিখিয়েছে। নির্বাচনের পরের বাংলাদেশে তরুণদের চোখ এখন খোলা- এবং সেই চোখের দৃষ্টি ভবিষ্যতের রাজনীতিকে নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।