নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘ সময়ের অস্থিরতা ও আস্থার সঙ্কট কাটিয়ে দেশের পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা আরো স্পষ্ট হচ্ছে। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ঢাকা ও চট্টগ্রাম উভয় স্টক এক্সচেঞ্জেই সূচকের উল্লেখযোগ্য উত্থান, লেনদেন বৃদ্ধি এবং অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর বাড়ার মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক মূল্য সংশোধনের পর মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে, যা বাজারে আস্থা ফিরতে শুরু করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি জোরদার, বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগে ধীরে ধীরে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ছে। গত দুই বছরের তুলনায় বর্তমানে সূচক ও লেনদেন উভয় ক্ষেত্রেই বাজার তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
তারা বলছেন, বর্তমান ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকলে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ছয় হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। একই সাথে দৈনিক লেনদেনও তিন হাজার কোটি টাকার ঘরে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর জন্য বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্যে দেখা যায়, গতকাল প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৪৩ দশমিক ৫৫ পয়েন্ট বেড়ে পাঁচ হাজার ৭৮৭ দশমিক ৪১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক ৯ দশমিক ১৮ পয়েন্ট বেড়ে এক হাজার ১৭৮ দশমিক ১১ পয়েন্টে এবং ব্লু-চিপ কোম্পানির সূচক ডিএসই-৩০ ২৯ দশমিক ৩১ পয়েন্ট বেড়ে দুই হাজার ১৯১ দশমিক ৩২ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। তিনটি সূচকের একযোগে ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান বাজারে ইতিবাচক মনোভাবের প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিন ডিএসইতে ৩৮৯টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার ও ইউনিট লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে ১৭৭টির দর বেড়েছে, ১৫৩টির কমেছে এবং ৫৯টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। দর বৃদ্ধিকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি হওয়ায় বাজারে ক্রেতাদের সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে।
বাজারে লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে। গতকাল ডিএসইতে মোট এক হাজার ৫৩০ কোটি সাত লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে এ পরিমাণ ছিল এক হাজার ৪৩৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ৯০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, লেনদেন বৃদ্ধির এ প্রবণতা বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ার ইঙ্গিত বহন করে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই ধরনের ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। সেখানে ৬৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। মোট ২৫৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৪২টির শেয়ারদর বেড়েছে, ৯৬টির কমেছে এবং ১৮টির দর অপরিবর্তিত ছিল। দিন শেষে সিএএসপিআই সূচক ৯৭ দশমিক ২৮ পয়েন্ট বেড়ে ১৫ হাজার ৫০৫ দশমিক ৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের দরপতনের কারণে অনেক মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ার এখনো প্রকৃত মূল্যের তুলনায় কম দামে লেনদেন হচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য বর্তমান সময়কে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, শুধু বাজারের সাময়িক ঊর্ধ্বগতির ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ না করে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, মুনাফার ধারা, পরিচালনা পর্ষদের সক্ষমতা, করপোরেট সুশাসন এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।
এ দিকে ডিএসইর ব্লক মার্কেটে ৫৩টি প্রতিষ্ঠানের মোট ৪৮ কোটি ৪১ লাখ ৬৯ হাজার টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আট কোটি ২৪ লাখ ৫৯ হাজার টাকার লেনদেন হয়েছে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমসের শেয়ারে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা এনভয় টেক্সটাইলসের শেয়ার লেনদেন হয়েছে সাত কোটি ৩৮ লাখ ৮৮ হাজার টাকা এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকা ফাইন ফুডসের শেয়ার লেনদেন হয়েছে সাত কোটি ছয় লাখ ৬২ হাজার টাকার। এ ছাড়া অ্যাপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড নিটিং মিলস ও জি কিউ বলপেন ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারেও উল্লেখযোগ্য ব্লক লেনদেন হয়েছে।
দিনের সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে মালেক স্পিনিং মিলসের শেয়ারে, যার পরিমাণ ৫৩ কোটি ৪০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। এরপর রয়েছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস (৪১ কোটি ২৬ লাখ ৭৩ হাজার টাকা) এবং বেক্সিমকো লিমিটেড (৪১ কোটি ছয় লাখ ৭১ হাজার টাকা)। এ ছাড়া আইপিডিসি ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট, আইটি কনসালট্যান্টস, ফার ইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং, শাহজিবাজার পাওয়ার এবং বিএসআরএম স্টিলও লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় ছিল।
অন্য দিকে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে কয়েক দিন উৎপাদন বন্ধ থাকার পর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ফু-ওয়াং ফুডস সীমিত পরিসরে উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় শুরু করেছে। কোম্পানিটি ডিএসইকে জানিয়েছে, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে এবং পর্যায়ক্রমে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে ফেরার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ ঘোষণাকে বিনিয়োগকারীরা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক পরিবেশে তুলনামূলক স্বস্তি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা কিছুটা কমে আসার প্রভাবও পুঁজিবাজারে পড়তে শুরু করেছে। তবে এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে হলে বাজার কারসাজি দমন, দুর্বল কোম্পানির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর তথ্য প্রকাশে আরো স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তারা মনে করছেন, পুঁজিবাজারের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও বাজারের সুশাসনের ওপর। সেই আস্থা আরো সুদৃঢ় হলে এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আগামী মাসগুলোতে দেশের পুঁজিবাজার আরো শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে। একই সাথে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও নতুন আশাবাদ তৈরি হবে, যা বাজারের টেকসই উন্নয়নের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।



