আওয়ামী শাসন-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি যখন নানা চাপের মুখে, তখন নবনির্বাচিত সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে ব্যবসায়ী সমাজের বাড়তি প্রত্যাশা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারসঙ্কট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তায় শিল্প ও বাণিজ্য খাত কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এমন বাস্তবতায় ব্যবসায়ীরা চান দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ। তারা বলছেন, বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রাজস্ব ঘাটতি কমাতে হলে এখনই সমন্বিত ও ব্যবসাবান্ধব সংস্কার দরকার।
ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, অর্থনীতির বর্তমান সঙ্কট শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি সরাসরি উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বাজার সম্প্রসারণকে প্রভাবিত করছে। নতুন শিল্প স্থাপনে আগ্রহ কমে গেছে, বিদ্যমান শিল্পগুলোও সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারছে না। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কাক্সিক্ষত মাত্রায় বাড়ছে না; অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ ও কঠোর শর্তে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। ফলে বিনিয়োগ না বাড়ায় কর্মসংস্থানও স্থবির।
বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, দেশের অর্থনীতি খারাপ সময় পার করছে। শিল্প খাতে কার্যত ধস নেমেছে। নতুন শিল্প গড়ে উঠছে না, বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। বেসরকারি ঋণ প্রবাহ দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমুখী। ব্যবসায়ীরা আয় করতে না পারলে রাজস্ব পরিশোধ করবেন কীভাবে এ প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। তার মতে, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি বাড়ার পেছনে ব্যবসা-বাণিজ্যের এই দুরবস্থাই বড় কারণ। একই সাথে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা ও পুঁজিবাজারে আস্থাহীনতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানে নতুন সরকারের দৃঢ় ও সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
ব্যবসায়ী মহল বলছে, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এখন প্রথম প্রয়োজন। বিনিয়োগের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ দরকার। ঘন ঘন নীতিপরিবর্তন, কর ও শুল্ক কাঠামোয় আকস্মিক সংশোধন এবং প্রশাসনিক জটিলতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। তারা চান নীতিমালা প্রণয়নের আগে ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনা হোক, বাস্তবতা যাচাই করা হোক এবং প্রয়োগে সময়সীমা নির্ধারণ করা হোক।
তৈরী পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, বেসরকারি খাতে আস্থা ফেরাতে প্রথম কাজ হওয়া উচিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। তার মতে, ব্যবসা সহজীকরণে আমূল সংস্কার প্রয়োজন। লাইসেন্স, অনুমোদন ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ না হলে এবং সরবরাহ চেইন উন্নত না হলে উৎপাদন ব্যয় কমবে না। জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা ও ব্যাংকিং খাতে সংস্কার ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলে উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন।
ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) সভাপতি ও বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুপালী হক চৌধুরী বলেন, বিনিয়োগের জন্য স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ অপরিহার্য। নির্বাচিত সরকারের উচিত হবে সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে অর্থনৈতিক সংস্কারে ঐকমত্য গড়ে তোলা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা দূর করা এবং বিনিয়োগ-সম্পর্কিত নীতিতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিকভাবে সফল সরকার গড়তে হলে অর্থনীতিকে গতিশীল করতে হবে।
নারী উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকেও বিশেষ দাবি উঠেছে। তারা বলছেন, দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী; তাদের অর্থনৈতিক মূলধারায় যুক্ত না করলে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বড় অংশই নারী; কিন্তু তারা পুঁজিসঙ্কট, প্রশিক্ষণের অভাব ও বাজারে প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতায় ভুগছেন। নারীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, কর রেয়াত, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও সরকারি সুবিধাপ্রাপ্তিতে ভোগান্তি কমানোর আহ্বান জানান।
কর ও শুল্কনীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, বাস্তবভিত্তিক কর সংস্কার, ভ্যাট ও শুল্ক কাঠামো সহজীকরণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্রয়োজন। একই সাথে বৃহৎ শিল্পের জন্য সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা দিতে হবে। ব্যাংক খাতে তারল্য সঙ্কট ও উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে। ফলে শিল্প সম্প্রসারণে গতি আসছে না।
রফতানি খাতের প্রতিনিধিরাও নতুন বাজার সম্প্রসারণ ও বিদ্যমান বাজার ধরে রাখার ওপর জোর দিচ্ছেন। বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বেকারত্ব এখন অর্থনীতির বড় সমস্যা। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য শিল্পায়ন বাড়াতে হবে, কলকারখানা স্থাপন করতে হবে এবং পণ্যের নতুন বাজার খুঁজে বের করতে হবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান রপতানি বাজারে শুল্ক সুবিধা পুনর্বহাল ও সম্প্রসারণের কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানান। শ্রম আইন সংশোধনের ক্ষেত্রেও ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি। একই সাথে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় শিল্প খাতকে পর্যাপ্ত সময় ও সহায়তা দেয়ার দাবি জানান।
ওষুধ শিল্প খাত থেকেও নীতিগত সমন্বয়ের আহ্বান এসেছে। বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা: মো: জাকির হোসেন বলেন, খাতসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে পরামর্শ ছাড়াই কিছু নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, যা বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এসব নীতিমালা সংশোধন না করলে ওষুধ শিল্প চাপের মুখে পড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ব্যবসায়ী মহলের প্রত্যাশা অমূলক নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব আদায় বাড়ানো ও ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা। শিল্প ও বাণিজ্য খাতে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য কর ব্যবস্থাকে আরো ন্যায্য ও স্বচ্ছ করতে হবে। একই সাথে উৎপাদনমুখী খাতে বরাদ্দ বাড়ানো ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, ব্যবসায়ীদের সাথে পরামর্শ করে নীতি গ্রহণ করলে বিনিয়োগ বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
ব্যবসায়ী সমাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো প্রতিবেশী দেশের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করা এবং বন্দর ব্যবস্থাপনায় গতি আনা। আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়ায় বিলম্ব উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেয়। পাশাপাশি অর্থ পাচার রোধে কার্যকর নজরদারি জোরদারের আহ্বানও এসেছে।
দেশের ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, অর্থনীতিকে সুসংহত করতে হলে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মুদ্রা বাজারে স্থিরতা, জ্বালানি ও কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি প্রশাসনিক সংস্কার ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পারলে বিনিয়োগে নতুন গতি আসবে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন সরকারের জন্য এটি যেমন- বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি সুযোগও। ব্যবসাবান্ধব সংস্কার, স্বচ্ছতা ও অংশীদারত্বমূলক নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে সরকার যদি আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে, তবে স্থবির অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে এমন আশাই করছেন উদ্যোক্তারা।



