আলমগীর কবির
২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে সংঘটিত গণহত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার আসামি সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব:) আজিজ আহমেদ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন বলে নিশ্চিত তথ্য পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিশ’ জারি করার জন্য পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিজ কক্ষে নয়া দিগন্তের সাথে আলাপে এসব তথ্য জানান চিফ প্রসিকিউটর আইনজীবী আমিনুল ইসলাম। এ সময় তিনি আসামি প্রত্যর্পণ, বন্দী বিনিময় চুক্তি এবং ইন্টারপোলের আইনি কার্যপ্রণালী নিয়ে বিশদ ব্যাখ্যা দেন। আজিজ আহমেদকে ফেরাতে এনসিবিতে চিঠি এবং ইন্টারপোলের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে চিফ প্রসিকিউটর স্পষ্ট করেন যে, ইন্টারপোল কোনো একক দেশের সংস্থা নয়, এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বহু দেশের একটি যৌথ চুক্তি ও চার্টার।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, এনসিবি মূলত বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের একটি বিশেষ শাখা, যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে। বাংলাদেশে ইন্টারপোলের কোনো সরাসরি পৃথক অফিস না থাকায়, এ দেশের সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে বিদেশসংক্রান্ত যেকোনো অপরাধীর যাতায়াত ও চিঠিপত্র আদান-প্রদান বা রেড নোটিশ পাঠানোর কাজগুলো এনসিবি-ই সম্পাদন করে থাকে। গত সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে আজিজ আহমেদের নাম উল্লেখ করে রেড নোটিশ জারির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে এই এনসিবিতে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
কোনো দেশের সাথে সরাসরি বন্দী বিনিময় বা এক্সট্রাডিশন চুক্তি না থাকলে কেন ইন্টারপোল অপরিহার্য, তা ব্যাখ্যা করে প্রসিকিউশন জানায়, ভারতের মতো নির্দিষ্ট দু-একটি দেশ ছাড়া বেশির ভাগ দেশের সাথেই বাংলাদেশের সরাসরি এক্সট্রাডিশন ট্রিটি নেই। যেসব রাষ্ট্রের সাথে সরাসরি বন্দী বিনিময় চুক্তি থাকে, সেগুলোর ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক চ্যানেলে চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু চুক্তি না থাকা দেশে (যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আজিজ আহমেদ কিংবা দুবাইয়ের ক্ষেত্রে বেনজীর আহমেদ) ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ওপরই নির্ভর করতে হয়।
ইন্টারপোলের চার্টারভুক্ত সদস্য রাষ্ট্রগুলো যখনই কোনো আসামির বিরুদ্ধে এই রেড নোটিশ দেখতে পায়, তখন বিশ্বব্যাপী তাদের ডেটাবেজে ওই অপরাধীর তথ্য হালনাগাদ হয়ে যায়। চার্টার অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দেশে আসামি শনাক্ত বা অবস্থান চিহ্নিত হওয়ামাত্রই সেই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হয়ে পড়ে ওই পরোয়ানা অনুযায়ী আসামিকে গ্রেফতার করা। পূর্বে কোনো আসামি এক দেশ থেকে অন্য দেশে পালিয়ে গেলেও রেড নোটিশের কারণে চার্টারভুক্ত সব দেশ তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবহিত থাকে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কাজের গুরুত্ব তুলে ধরে চিফ প্রসিকিউটর জানান, আন্তর্জাতিক পরোয়ানা কার্যকর করা একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় প্রক্রিয়া। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেমন এনসিবির মাধ্যমে ইন্টারপোলে বার্তা পাঠায়, একইভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষা করে থাকে।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের গণহত্যায় নিহত ৬১ জনের মধ্যে প্রসিকিউশন ৫৮ জন শহীদের পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এ মামলায় ৪২ জন আসামির বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) দাখিল করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে অন্যতম আসামি সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ বর্তমানে দুবাইতে অবস্থান করছেন এবং তার বিরুদ্ধে আগেই ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশের আবেদন করা হয়েছিল। আর সোমবার যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত আজিজ আহমেদের বিষয়ে ইন্টারপোলের এনসিবিকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেয়া হলো।
সাক্ষীদের নিরাপত্তা ও প্রসিকিউশনের বক্তব্য
এদিকে চট্টগ্রামে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষীদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম। সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে ‘জুলাই রেভুলেশনারি অ্যালায়েন্স’-এর দুই প্রতিনিধি লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে তারা জানান, মামলার আসামিপক্ষ থেকে তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি দেয়া হচ্ছে। এতে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পরপরই তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় ওসি ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোকে জানিয়ে অভিযোগকারীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আমাদের আইনে উইটনেস প্রোটেকশনের বিধান আছে। কোনো সাক্ষী কোথাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বা হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন বলে আমরা জানতে পারলে আইন অনুযায়ী তাদের সুরক্ষা দেয়া আমাদের দায়িত্ব। সেই অনুযায়ী তারা লিখিতভাবে অভিযোগ দেয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ প্রশাসনকে তাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছি।
সাক্ষীদের অভিযোগ, তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দী দেয়ার সময় তারা যে ঠিকানা ও অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য দেন, সেগুলো পরে আসামিপক্ষের হাতে চলে যাচ্ছে। এরপরই তাদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, মামলার (চট্টগ্রামের ওয়াসীম হত্যা মামলা) আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হয়ে গেলে সেটি পাবলিক ডকুমেন্টে পরিণত হয়। ফলে সেখান থেকে তথ্য আসামিপক্ষের কাছে যাওয়ার সুযোগ থাকে। তিনি বলেন, ফরমাল চার্জ দাখিল হওয়ার পরে এটা পাবলিক ডকুমেন্ট হয়ে গেছে। যে কেউ এটা নিতে পারেন। আমরা ম্যান-টু-ম্যান গিয়ে চেক করতে পারি না কে কোন জায়গা থেকে তথ্য দিচ্ছে। ফরমাল চার্জে আমরা যা বলেছি, সবই সেখানে বলা আছে। কেউ যদি সেটা আসামিপক্ষকে দিয়ে দেয়, আসামিপক্ষ তো এমনিতেও তা পাবে।
তবে সাক্ষীদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রসিকিউশন পক্ষকে নানা ধরনের হুমকি ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আপনি যখন একজনের বিরুদ্ধে একটি প্রসিকিউশন কেস প্রুভ করবেন, তখন এ ধরনের থ্রেট, হুমকি ও অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই কাজ করতে হয়। আমরা কি সব কিছু আপনাদের বলি? আমরা যেখানে কাজ করি, প্রতিনিয়ত কি খুব ভালোভাবে ঘুমাই? তদন্ত করতে গিয়ে আমরা নানা জায়গায় যাই। আমাদেরও অনেক অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে, যেগুলো আপনাদের বলতে পারব না।’ তিনি বলেন, ‘এই কাজটা চ্যালেঞ্জিং জেনেই আমি এখানে দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। এখন আমি এই চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছি। আমার দায়িত্ব পালন করতে হবে। দ্যাট ইজ দ্য নেচার অব মাই জব।’



