ইসরাইলি গোয়েন্দা তথ্যে আস্থা হারাচ্ছে সিআইএ

গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে বোমাবর্ষণে ক্ষমতা বদল নিয়ে ইসরাইলের গোয়েন্দা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও সিআইএ-র মনে সংশয় তৈরি করেছিল

Printed Edition

ইন্ডিপেন্ডেন্ট

ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দোরগোড়ায় রয়েছে- মিত্র দেশ ইসরাইলের দেয়া এমন একটি গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই মূলত এই দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এই সঙ্ঘাতের ছয় মাস পার হওয়ার পর, বিশ্ব-অর্থনীতিকে ওলটপালট করে দেয়া এবং নিজের দেশে তার জনপ্রিয়তা কমিয়ে দেয়া এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না ট্রাম্প। অন্য দিকে যে ইসরাইল একসময় তাকে এই যুদ্ধের জন্য প্ররোচিত করেছিল, তারা এখন আর ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে কোনো হামলা চালাচ্ছে না।

বিগত তিন মাসে ট্রাম্প ও তার দীর্ঘদিনের বন্ধু বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যকার সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। লেবাননে ইসরাইলের হামলা এবং ইরানের সাথে একটি শান্তি চুক্তি বিপন্ন করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট গোপনে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে প্রকাশ পায় যে, ইসরাইলি গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ইরানের একটি হত্যাচেষ্টার হুমকি থেকে বাঁচতে তুরস্ক থেকে গোপনে একটি সামরিক বিমানে চড়েছিলেন ট্রাম্প। আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন থেকে নিরাপদে ব্রিটেনে যাওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টকে একটি ক্যাটারিং ট্রাকে করে এক বিমান থেকে অন্য বিমানে স্থানান্তরের মতো এক নজিরবিহীন নাটকীয় গোপন অপারেশন চালানো হয়েছিল।

তবে ট্রাম্পের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই তথ্যের সত্যতা নিয়ে নিশ্চিত ছিল না। গত বুধবার ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ এক রিপোর্টে জানিয়েছে, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ) এই তথ্যের ওপর ‘কম আস্থা’ প্রকাশ করেছিল- তা সত্ত্বেও মার্কিন কর্মকর্তারা এর ওপর ভিত্তি করে ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। একটি সূত্র সংবাদপত্রটিকে জানায়, কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, এসব ইসরাইলি গোয়েন্দা তথ্য শুধু প্রেসিডেন্টকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করার জন্য নয়; বরং তার সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করার উদ্দেশেও দেয়া হয়।

বিশেষজ্ঞরা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’-কে জানিয়েছেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার গভীর সম্পর্কটি মূলত নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। উভয় নেতাই ইরানে তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং একই সাথে অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।

১৯৭৮ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে ছয়জন মার্কিন পররাষ্ট্র সচিবের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা অভিজ্ঞ মার্কিন কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরাইলি বোমাবর্ষণ ইরানে ক্ষমতার পরিবর্তন সহজ করবে বলে ইসরাইলের যে ‘চরম আত্মবিশ্বাস’ ছিল, তা মূলত তাদের গোয়েন্দা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সিআইএর মনে সংশয় তৈরি করেছিল।

তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহু প্রায়শই তার নিজের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য গোয়েন্দা মূল্যায়ন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেন, বিশেষ করে যখন এটি ইরান ও হামাসের মতো শত্রুদের ক্ষেত্রে ঘটে।’ তিনি আরো যোগ করেন, ‘তবে ট্রাম্পকে হত্যার একাধিক চেষ্টা এবং ২০২৪ সালের নভেম্বরে তাকে হত্যার আইআরজিসির একটি ষড়যন্ত্রের তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর, ইসরাইলি গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে সিআইএর সংশয় থাকলেও সিক্রেট সার্ভিস কোনো ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিল না।’

চ্যাথাম হাউজের মার্কিন-ইসরাইল সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইয়োসি মেকেলবার্গ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট-কে বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত এই গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো যতটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে, তা হয়তো নাও হতে পারে। তিনি বলেন, ‘সিআইএ হয়তো মনে করছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তারা গুরুত্ব হারিয়েছে এবং এখন আবার নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।’ তার মতে, এখন পর্যন্ত যুদ্ধে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে একের পর এক ব্যর্থতা দেখা গেছে। এর মধ্যে ইরানের মিনাব শহরের একটি স্কুলে হামলাও রয়েছে, যাতে ১৭০-এর বেশি শিশু নিহত হয়। ঘটনাটি বর্তমানে মার্কিন সরকার তদন্ত করছে।

তিনি আরো বলেন, এটি মনে রাখাও জরুরি যে ট্রাম্পের মনে এখনো নেতানিয়াহুর জন্য একটি ‘দুর্বলতা’ রয়েছে, যদিও গণমাধ্যমে তাদের মধ্যকার উত্তপ্ত ফোনালাপের বিবরণ ফাঁস হয়েছে। গত মাসে, লেবাননে ইসরাইলের ক্রমাগত বোমাবর্ষণ (যা তারা হিজবুল্লাহকে পরাস্ত করার জন্য বলে দাবি করে আসছে) নিয়ে উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে অষ্টম রাষ্ট্রীয় সফর করেছিলেন নেতানিয়াহু, যা প্রমাণ করে যে তাদের সম্পর্ক এখনো শক্তিশালী রয়েছে। গাজায় ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনাকে নেতানিয়াহুর জনসমক্ষে প্রত্যাখ্যান করা এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র কখনোই গঠিত হবে না বলে তার দাবির মুখে ট্রাম্পের নীরব থাকাকেই সম্পর্কের শক্তির প্রমাণ হিসেবে দেখছেন অধ্যাপক মেকেলবার্গ। তবে ট্রাম্পের সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন (যা রিপাবলিকানদের জন্য ক্ষতিকর ফল বয়ে আনতে পারে) এবং অন্য দিকে অক্টোবরে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে নেতানিয়াহুর টিকে থাকার লড়াইয়ের মুখে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, তাদের সম্পর্ক অনিবার্যভাবেই আরো বড় চাপের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।

লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক অ্যান্ড্রু মোরান বলেন, একটি বড় স্তরে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটছে। এই সপ্তাহের শুরুর দিকে, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক কর্মকর্তা বলেছিলেন যে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি লেবানন সরকারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় করা চুক্তির প্রতিশ্রুতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রীকরণ না হওয়া পর্যন্ত লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার না করার ঘোষণা দেয়ার পরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিক্রিয়া এলো।

অধ্যাপক মোরান বলেন, ‘ইসরাইলি গোয়েন্দা তথ্যকে দীর্ঘকাল ধরে একটি গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে দেখা হতো, তাই এটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য যে মার্কিন কর্মকর্তারা এই সতর্কবার্তার ওপর ভিত্তি করে ব্যবস্থা নিলেও একই সাথে তারা এটি বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে সঙ্কেত দিয়েছেন।’ ভয়াবহ বিপর্যয় এড়াতে প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে নেয়া একটি প্রয়োজনীয় সতর্কতা ছিল যা তারা উপেক্ষা করতে পারতেন না, তবে জনসমক্ষে এই মূল্যায়নের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা একটি অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ।

তিনি বলেন, ‘জনসাধারণকে আশ্বস্ত করার জন্য হয়তো এটি করা হয়েছে যে, সেখানে কোনো হুমকি ছিল না। তবে এটি নির্দেশ করে যে ইসরাইলি গোয়েন্দা তথ্যের ওপর আস্থা এখন আর আগের মতো প্রশ্নাতীত নয়; বিশেষ করে ৭ অক্টোবরের হামলার পর থেকে, যা ইসরাইলি গোয়েন্দারা আগে থেকে অনুমান করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল।’ তিনি আরো যোগ করেন, ‘আমি মনে করি না যে, ট্রাম্প ইসরাইলের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন, তবে তাদের এই সম্পর্কটি এখন দিন দিন আরো বেশি অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।’