তীব্র গ্যাসসঙ্কটে নগরবাসী

গ্যাসসঙ্কটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে নগরজীবনের ব্যয় ও সময় ব্যবস্থাপনায়। কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা সকালবেলা রান্না করতে না পেরে বাইরে থেকে খাবার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে প্রতিদিন বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য এই ব্যয় বহন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

  • ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছাড়িয়েছে ২ হাজার টাকা
  • জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে জরুরি বৈঠক আজ

দেশজুড়ে আবার তীব্র আকার ধারণ করেছে গ্যাসসঙ্কট। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ বড় বড় শহরের আবাসিক এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা। নিয়মিত বিল দিয়েও ন্যূনতম গ্যাসসুবিধা না পাওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে গ্রাহকদের মধ্যে। রান্না থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসসঙ্কট আরো বহুমাত্রিক রূপ দিয়েছে এলএনজি সঙ্কট। গত দুই সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশের তরলিকৃত পেট্রলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে ভয়াবহ সরবরাহ সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ফলে নগরাঞ্চলের হাজারো পরিবার প্রতিদিনের রান্না নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি সঙ্কট দেখা দিয়েছে বাসাবাড়িতে বহুল ব্যবহৃত ১২ কেজির সিলিন্ডারে, যা বহু খুচরা দোকানেই পাওয়া যাচ্ছে না। সরবরাহ কমে যাওয়ায় সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ২৫৩ টাকার পরিবর্তে কোথাও কোথাও সিলিন্ডারের দাম প্রায় ২ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। বাড়তি দাম দিয়েও অনেক ক্ষেত্রে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। এমনি পরিস্থিতিতে জ্বালানি মন্ত্রণালয় আজ জরুরি বৈঠক ডেকেছে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সঙ্কটের মূল কারণ এলপিজি আমদানির বড় ধরনের পতন। ডিসেম্বরে এলপিজি আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে, যার পেছনে রয়েছে এলপিজি পরিবহনকারী জাহাজের তীব্র সঙ্কট। নিয়মিত ব্যবহৃত বেশ কয়েকটি জাহাজ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ায় জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজি পরিবহনে ২৯টি জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আর এটা হয়েছে হঠাৎ গত ১৮ ডিসেম্বর থেকে। ফলে সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তিনি ইতোমধ্যে এ খাতের উদ্যোক্তাদের সাথে কথা বলেছেন। বিকল্প উৎস হিসেবে সিঙ্গাপুর থেকে আমদানির জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। অপর দিকে সার্বিকভাবে পর্যালোচনার জন্য আজ জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে বৈঠক ডাকা হয়েছে। আশা করছি শিগগিরই বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হবে।

ডেলটা এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, ডিসেম্বরে কিছু কোম্পানি নিষ্ক্রিয় থাকায় আমদানি কমেছে। আমরা পরিবেশকদের কাছে বিইআরসি নির্ধারিত দামে সরবরাহ করছি, তবে খুচরা পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে নেই।

ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, শনিরআখড়া, রামপুরা ও বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বড় অংশজুড়ে গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম কিংবা একেবারেই থাকছে না। কোথাও কোথাও ভোর বা গভীর রাতে কয়েক ঘণ্টার জন্য গ্যাস মিললেও তা দিয়ে স্বাভাবিক রান্না সম্ভব হচ্ছে না। অনেক পরিবার দিনে একবেলা রান্না করতেই হিমশিম খাচ্ছে।

গ্যাসসঙ্কটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে নগরজীবনের ব্যয় ও সময় ব্যবস্থাপনায়। কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা সকালবেলা রান্না করতে না পেরে বাইরে থেকে খাবার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে প্রতিদিন বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য এই ব্যয় বহন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

একই সাথে চরম সঙ্কটে পড়েছে তরলিকৃত পেট্রলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বাজার। পাইপলাইনে গ্যাস না থাকায় এলপিজির চাহিদা হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। সেই সুযোগে অনেক এলাকায় এলপিজির দাম বেড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। কোথাও কোথাও পর্যাপ্ত সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

নগরবাসীরা অভিযোগ করছেন, গ্যাসসঙ্কট নতুন নয়, কিন্তু এবার পরিস্থিতি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভয়াবহ। রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, মাসের পর মাস ঠিকমতো গ্যাস পাই না, অথচ বিল দিতে কোনো ছাড় নেই। দিনের পর দিন রান্না করতে না পেরে পরিবারের সবাই মানসিকভাবে চাপে আছে।” একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের অনেক গ্রাহক।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের পেছনে একাধিক কাঠামোগত সমস্যা কাজ করছে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে গতি না থাকায় আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বৈশ্বিক বাজারে এলএনজির উচ্চমূল্য এবং সরবরাহ চুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী এলএনজি আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ ছাড়া গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা সঙ্কটকে আরো তীব্র করছে। পাইপলাইনের লিকেজ, অবৈধ সংযোগ এবং পুরনো অবকাঠামোর কারণে বিপুল পরিমাণ গ্যাস অপচয় হচ্ছে। অন্য দিকে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেয়ায় আবাসিক গ্রাহকরা বরাবরের মতোই বঞ্চিত হচ্ছেন।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, শীত মৌসুমে গ্যাসের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার চাহিদা মেটাতে গিয়ে আবাসিক খাতে সরবরাহ সীমিত করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে এই সঙ্কট চলতে থাকায় প্রশ্ন উঠেছে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার সক্ষমতা নিয়ে।

পেট্রোবাংলা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিতরণ লাইনের কারিগরি ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলমান রয়েছে। তবে কবে নাগাদ নগরবাসী স্বস্তি পাবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি কর্মকর্তারা।

ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, শুধু স্বল্পমেয়াদি সমাধানে সঙ্কট কাটবে না। তাদের মতে, নতুন গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং গ্যাসব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সাথে আবাসিক গ্রাহকদের ন্যূনতম সেবা নিশ্চিতে আলাদা পরিকল্পনা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে নগরজীবনে গ্যাসসঙ্কট আরো ঘন ঘন দেখা দেবে। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে, সামাজিক চাপ তৈরি হবে এবং নি¤œ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এই প্রেক্ষাপটে নগরবাসীর দাবি একটাই দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা। তা না হলে তীব্র এই গ্যাসসঙ্কট নগরজীবনের নিত্যদিনের দুর্ভোগে পরিণত হবে, যার প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থায়।