ফেনীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত হত্যা

অধ্যক্ষ সিরাজসহ ২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, খালাস ১০

Printed Edition
অধ্যক্ষ সিরাজসহ ২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, খালাস ১০
অধ্যক্ষ সিরাজসহ ২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, খালাস ১০

নিজস্ব প্রতিবেদক

ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির মধ্যে চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে এবং বাকি ১০ জনকে মামলার দায় থেকে খালাস দিয়েছেন আদালত। একইসাথে নিম্ন আদালতে ঢালাওভাবে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়ায় তৎকালীন বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা খর্ব করে তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

গতকাল সোমবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানির পর এই আদেশ দেন।

মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা দুই আসামি হলেন- সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীম। সাজা কমে যাবজ্জীবন পাওয়া চার আসামি হলেন- নূর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জুবায়ের ও উম্মে সুলতানা ওরফে পপি।

অন্যদিকে খালাস পেয়েছেন- কামরুন নাহার মনি, হাফেজ আবদুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, আবদুর রহিম শরীফ, মোহাম্মদ শামীম, ইফতেখার উদ্দিন রানা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি ও মাদরাসার সাবেক সহসভাপতি রুহুল আমিন, আবছার উদ্দিন এবং তৎকালীন কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর।

রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, নিম্ন আদালতে একসাথে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়াকে ‘মাইন্ডলেস সেন্টেন্স’ বা বিবেচনাহীন দণ্ড হিসেবে উল্লেখ করেছেন হাইকোর্ট। কার কতটুকু সম্পৃক্ততা তা আমলে না নিয়ে বিচারিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ায় সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর ওপর বিপর্যয় নেমে এসেছে বলে পর্যবেক্ষণ দেন আদালত। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই রায় প্রদানকারী তৎকালীন বিচারক মামুনুর রশিদকে ফৌজদারি মামলার বিচার কাজ থেকে অবিলম্বে সরিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। ওই ঘটনায় মামলা হলে সিরাজ গ্রেফতার হন। পরবর্তীতে চাপের মুখেও মামলা তুলে না নেয়ায় ওই বছরের ৬ এপ্রিল মাদরাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান নুসরাত।

এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানের দায়ের করা মামলায় ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ১৬ জন আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তৈরি পেপারবুক, ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের পৃথক আপিল শুনানি শেষে গতকাল হাইকোর্ট চূড়ান্ত এই আদেশ দিলেন। রায় ঘোষণার সময় আদালতে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবীসহ ভুক্তভোগী এবং আসামিদের স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন।

রায়ে সন্তুষ্ট, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন নুসরাতের মা

সোনাগাজী (ফেনী) সংবাদদাতা জানান, হাইকোর্টের রায় ঘোষণার পর নুসরাত জাহান রাফির মা আদালতের রায়ে সন্তুষ্টির কথা জানিয়ে পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছেন। সোনাগাজী পৌরসভার বাড়িতে গণমাধ্যমের সামনে রাফির মা শিরিন আক্তার বলেন, আমরা আদালতের রায়ের প্রতি সন্তুষ্ট। কিন্তু পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে, দেশবাসীর কাছে আমি আমার পরিবারের নিরাপত্তা চাই। তারা আমার ছেলেদের বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। যেকোনো সময় যেকোনো ক্ষতি করতে পারে। ঘর বাড়িতেও হামলা করতে পারে। আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিতে পারে। তাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের পরিবারের নিরাপত্তা চাই। আর কিছু চাই না। প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ, আমাদের নিরাপত্তা দিন।

তিনি বলেন, আমরা কারো ক্ষতি করি নাই। আমার মেয়েকে তারা হত্যা করেছে। আবার তারা বলেছে, আমার মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। আমরা আত্মহত্যার কথাকে নাটক অভিযোগ করে মামলা করেছি। দেশের সর্বোচ্চ আদালতও বলেছে, আমার মেয়ে আত্মহত্যা করেনি, তাকে হত্যা করা হয়েছে। এখন আমি আমার পরিবারের নিরাপত্তা চাই। এভাবেই বিলাপ করতে করতে আবেদন জানাচ্ছিলেন নুসরাতের মা।

এর আগে রোববার থেকে ফেনীর সহকারী পুলিশ সুপারের নির্দেশে সোনাগাজী মডেল থানা পুলিশ নুসরাত জাহান রাফির বাড়িতে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল।

সোনাগাজী মডেল থানার ওসি আবুল হাসিম বলেন, নুসরাত জাহান রাফির পরিবারকে যতদিন প্রয়োজন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ততদিন নিরাপত্তা দেয়া হবে। নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। সব সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে থাকবে তাদের পরিবার।