- তারল্য ফিরলেও বাড়ছে মন্দঋণ ও মূলধন সঙ্কট
- আমানতে আস্থা, ঋণে স্থবিরতা
- সংস্কার ছাড়া কাটছে না ঝুঁকি
দেশের ব্যাংকিং খাতে তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হলেও সামগ্রিক আর্থিক স্বাস্থ্য এখনো গভীর সঙ্কটে রয়েছে। একদিকে আমানত প্রবৃদ্ধি ও উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে, অন্যদিকে দ্রুত বাড়ছে খেলাপি ঋণ, অব্যাহত রয়েছে মূলধনের ঘাটতি এবং কমছে ব্যাংকগুলোর মুনাফা। ফলে অর্থনীতিতে অর্থের জোগান থাকলেও উৎপাদন ও বিনিয়োগে তার কাক্সিক্ষত প্রভাব পড়ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক আর্থিক স্থিতিশীলতা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিকে ছিল পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
খেলাপি ঋণের হার ৩২.২৬ শতাংশ
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩২.২৬ শতাংশে পৌঁছেছে। আগের প্রান্তিকে এই হার ছিল ৩০.৬০ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের প্রতি তিন টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় এক টাকা এখন খেলাপি। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি উভয় ধরনের ব্যাংকেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে। একই সাথে নিট খেলাপি ঋণের হারও ১৩.৯৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫.০১ শতাংশে উঠেছে। এর অর্থ হলো, সংরক্ষিত প্রভিশন ও সুদ স্থগিত রাখার পরও ব্যাংকগুলোর প্রকৃত ঝুঁকি বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এত উচ্চ খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর ঋণ দেয়ার সক্ষমতা কমিয়ে দেয়, নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করে এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
২ লাখ কোটি টাকার বেশি প্রভিশন ঘাটতি
খেলাপি ঋণ বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে প্রভিশনের চাপও। মার্চ ২০২৬ শেষে ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় প্রভিশন ছিল চার লাখ ৬১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা। বিপরীতে সংরক্ষিত হয়েছে মাত্র দুই লাখ ৫৬ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। ফলে প্রভিশনের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দুই লাখ পাঁচ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে। বিদেশী ব্যাংকগুলো সামান্য উদ্বৃত্ত প্রভিশন ধরে রাখতে সক্ষম হলেও পুরো খাতের চিত্র উদ্বেগজনক। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারলে ভবিষ্যতে ব্যাংকের মূলধন আরো ক্ষয় হবে এবং আমানতকারীদের স্বার্থও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
মূলধন সঙ্কট এখনো কাটেনি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধনের অনুপাত (সিআরএআর) সামান্য উন্নতি হলেও তা এখনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে অনেক নিচে। ২০২৬ সালের জুন শেষে পুরো ব্যাংকিং খাতের সিআরএআর ছিল ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশ, যেখানে বেসেল-৩ অনুযায়ী ন্যূনতম প্রয়োজন ১০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় মূলধনের তুলনায় ব্যাংকিং খাতে এখনো বিশাল ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষ করে ইসলামী ধারার বেসরকারি ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত মূলধন পরিস্থিতি অত্যন্ত দুর্বল। পাঁচটি একীভূত দুর্বল ইসলামী ব্যাংক-এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক-অন্তর্ভুক্ত করলে এই খাতের সিআরএআর নেমে আসে ঋণাত্মক ৪৩.১৮ শতাংশে। তবে এই পাঁচ ব্যাংক বাদ দিলে অন্য ইসলামী ব্যাংকগুলোর মূলধন অনুপাত ৭.৭০ শতাংশ, যা তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো। অন্যদিকে প্রচলিত ধারার বেসরকারি ব্যাংকগুলোর সিআরএআর বেড়ে ১০.৩৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আন্তর্জাতিক ন্যূনতম মান অতিক্রম করেছে। এতে বোঝা যায়, মূলধন সঙ্কট পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাজুড়ে সমানভাবে ছড়িয়ে নেই; বরং দুর্বল কয়েকটি ব্যাংকেই সঙ্কট বেশি কেন্দ্রীভূত।
মুনাফায় বড় ধস
ব্যাংকগুলোর আয়-ব্যয়ের চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। সম্পদের ওপর মুনাফার হার (আরওআর) ঋণাত্মক ০.৫৪ শতাংশ থেকে নেমে ঋণাত্মক ৪.৮১ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে শেয়ারহোল্ডারদের মূলধনের ওপর মুনাফার হার (আওই) ঋণাত্মক ১৫.১০ শতাংশ থেকে নেমে ঋণাত্মক ২৪৩.৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে নেট ইন্টারেস্ট মার্জিন (এনআইএম) সামান্য কমে ১.৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, খেলাপি ঋণের বিপরীতে বিপুল পরিমাণ প্রভিশন সংরক্ষণ করায় ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
আমানত বাড়ছে, ঋণ বিতরণ কমছে
খেলাপি ঋণ ও মূলধন সঙ্কটের মধ্যেও একটি ইতিবাচক দিক হলো- ব্যাংকে আমানত বাড়ছে। মার্চ ২০২৬ শেষে ব্যাংকিং খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি ছিল ১১.৬১ শতাংশ। মোট আমানতের পরিমাণ ডিসেম্বরের ২১ লাখ ৮০ হাজার ২৭০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২২ লাখ ২১ হাজার ২৭০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১১ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৫.৪৮ শতাংশ। এর ফলে অ্যাডভান্স-ডিপোজিট রেশিও (এডিআর) কমে ৭৭.৭২ শতাংশ থেকে ৭৫.৮০ শতাংশে নেমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, উচ্চ সুদহার, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের দুর্বল চাহিদা এবং ব্যাংকগুলোর সতর্ক ঋণনীতির কারণে ঋণ বিতরণে এই ধীরগতি দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, ব্যাংকে অর্থ জমা হলেও সেই অর্থ উৎপাদনমুখী খাতে প্রবাহিত হচ্ছে না। ফলে তারল্য বাড়লেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কাক্সিক্ষত গতি আসছে না।
উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতের তারল্য পরিস্থিতিরও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। মোট চাহিদা ও মেয়াদি আমানতের তুলনায় উদ্বৃত্ত এসএলআর ১৫.৪৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৭.১০ শতাংশে উঠেছে। ব্যাংকগুলো তুলনামূলকভাবে কম ঋণ বিতরণ করে বেশি অর্থ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করছে। নিরাপদ বিনিয়োগ এবং আকর্ষণীয় সুদের হার এই প্রবণতাকে উৎসাহিত করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এটি স্বল্পমেয়াদে ব্যাংকগুলোর তারল্য ঝুঁকি কমালেও বাস্তব অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
সংস্কারই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, বর্তমান সঙ্কট মোকাবেলায় শুধু তারল্য বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। ব্যাংক খাতকে টেকসই ভিত্তিতে দাঁড় করাতে প্রয়োজন গভীর কাঠামোগত সংস্কার। এ লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে রিস্ক-বেজড সুপারভিশন, ব্যাংক রেজুলিউশন ফ্রেমওয়ার্ক, দুর্বল ব্যাংকের মার্জার ও কনসোলিডেশন, এবং সুশাসন ও আইনি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ধীরে ধীরে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আসবে, মূলধন পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনগণের আস্থা আরো শক্তিশালী হবে। তবে সংস্কারের গতি শ্লথ হলে তারল্যের উন্নতি সত্ত্বেও ব্যাংকিং খাতের অন্তর্নিহিত ঝুঁকি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।



