সূচকের বড় পতনে সপ্তাহ শেষ পুঁজিবাজারে

দরপতনের শিকার প্রায় ৭০ শতাংশ কোম্পানি

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

বিগত কয়েকদিনের অনেকটা গতিহীন থাকা পুঁজিবাজারে সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে বড় ধরনের অবনতি ঘটল সূচকের। লেনদেনের শুরুটা কিছুটা ভালো হলেও তা স্থায়িত্ব ছিল আধা ঘণ্টারও কম। এর পরই বাজারে বিক্রয়চাপ সক্রিয় হয়ে ওঠে। দিনের বাকি সময় বেশ ক’বার চেষ্টা করেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বাজারগুলো। ধীরে ধীরে বড় পতনের দিকেই এগিয়ে যেতে থাকে। এভাবে সূচকের বড় অবনতি দিয়েই সপ্তাহ শেষ করে দেশের দুই পুঁজিবাজার। দুই বাজারেই লেনদেনের কিছুটা উন্নতি ঘটলেও লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানির বেশিরভাগ দর হারায়।

বাজার বিশ্লেষকরা নেতিবাচক বাজার আচরণের কারণ হিসাবে সম্প্রতি দেশের শিল্পখাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অপ্রতুলাকে দায়ী করছেন। সম্প্রতি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে গ্যাস ও বিদ্যুৎ স্বল্পতায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। কোন কোন কারখানায় ছুটি বাড়ানো এবং উৎপাদন সময় হ্রাস করার কথাও উঠে আসছে, যা বাজারে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। শিল্প খাতের এ উৎপাদন সংকট হ্র্রাস পেলে বাজার আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে এমনটিই মনে করেন তারা।

প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৩ দশমিক ১৬ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। পাঁচ হাজার ৮৯৪ দশমিক ১২ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার দিনশেষে নেমে আসে পাঁচ হাজার ৮৬০ দশমিক ৯৫ পয়েন্টে।

একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ৯ দশমিক ৯১ ও ৫ দশমিক ২৭ পয়েন্ট। অপর দিকে, দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৭৩ দশমিক ২২ পয়েন্ট হারায়। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১১৫ দশমিক ২৩ ও ৪৬ দশমিক ৭৯ পয়েন্ট।

সপ্তাহের শুরু থেকে পুঁজিবাজারে যে নেতিবাচক প্রবণতা ভর করে তারই পরিণতি ছিল গতকালের বাজার আচরণে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির একটি বড় অংশই শিল্প তথা উৎপাদন খাতের যার প্রবৃদ্ধির ওপরই নির্ভর করে ভালোমন্দ। সম্প্রতি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ উৎপাদন ব্যবস্থায় কমবেশি সঙ্কট তৈরি করে, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে যার প্রভাব ছিল পুঁজিবাজারে। স্বাভাবিক অবস্থায় পুঁজিবাজার যে গতি পাওয়ার কথা উৎপাদন সঙ্কটের কারণে তা ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় বিমা ও ও মিউচুয়াল ফান্ড খাত কিছুটা ভালো অবস্থানে থাকলে গতকাল সূচকের বড় অবনতির কারণে এ দু’খাতেও তার প্রভাব পড়ে। আর বাজারের সবচেয়ে বড় ব্যাংকিং খাত সম্প্রতি বিনিয়োগকারীদের খুব একটা সাড়া পাচ্ছে না।

সূচকের অবনতি ঘটলেও গতকাল দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেনের কিছুটা উন্নতি ঘটে। ঢাকা স্টক গতকাল এক হাজার ১৪৭ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিন অপেক্ষা ৩৬ কোটি টাকা বেশি। মঙ্গলবার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ১১১ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে গতকাল ২৯ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছে, যা আগের দিনের চাইতে ১১ কোটি টাকা বেশি। গত মঙ্গলবার সিএসইর লেনদেন ছিল ১৮ কোটি টাকা।

এ দিকে গতকাল বাজারের সব খাত ব্যাপক দরপতনের শিকার ছিল। কিছুটা ভালো অবস্থানে ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমা খাত। অন্যান্য খাতের কোনো কোনোটিতে শতভাগ কোম্পানিই দর হারায়। বিগত দিনগুলোাতে মিউচুয়াল ফান্ড ভালো অবস্থান ধরে রাখতে পারলেও গতকাল এ খাতেও একটি ছাড়া সব দর হারায়। ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানির ৭০ শতাংশই দরপতনের শিকার ছিল। এখানে লেনদেনে অংশ নেয়া ৩৯২টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৮৮টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ২৬৩টি। দর অপরিবর্তিত ছিল ৪১টির। অপর দিকে, চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া ২৩৭টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ৮৪টির দাম বাড়লেও দর হারায় ১২৫টির। এখানে ২৮টি সিকিউরিটিজের দর ছিল অপরিবর্তিত।

গতকাল ঢাকা স্টকে লেনদেনের শীর্ষস্থানটি দখলে রাখে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ। বেশ কিছুদিন টানা মূল্যবৃদ্ধির পর গতকাল দরপতনের শিকার হওয়া কোম্পানিটি ৪৮ কোটি ৮০ লাখ টাকায় এক কোটি ১৯ লাখ ৭১ হাজার শেয়ার হাতবদল করে। ২৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকায় ১৮ লাখ ৩২ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে দিনের লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানে ছিল সেনা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি। লেনদেনে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে একমি পেস্টিসাইডস, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, মালেক স্পিনিং, সায়হাম টেক্সটাইলস, বেক্সিমকো লি., ফার ইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং, মুন্নু ফেব্রিক্স ও বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার লি.।

ঢাকা বাজারে দিনের মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল সাধারণ বিমা কোম্পানি নিটল ইন্স্যুরেন্স। গতকাল ৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে কোম্পানিটির। ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল সমতা লেদার। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ফাস্ট প্রাইম ফিন্যান্স মিউচুয়াল ফান্ড, ঢাকা ইন্স্যুরেন্স, বিডি অটোকার, সোনারগাঁও টেক্সটাইলস, এমএল ডাইং, ইসলামী ইন্স্যুরেন্স, ইউনাইটেড ফিন্যান্স ও সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স।

একই সময় ডিএসইর দরপতনের শীর্ষে ছিল সেনা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি। সাধারণ বিমা খাতের এ কোম্পানি গতকাল ৭ দশমিক ৯১ শতাংশ দর হারায়। ৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ দরপতনের শিকার হওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের প্রিমিয়ার লিজিং ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে।

ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, সিএনএ টেক্সটাইল, কুইন সাউথ টেক্সটাইলস, আইসিবি সোনালী ব্যাংক ফান্ড, আরগন ডেনিমস, এআইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, নিউলাইন ক্লদিং ও আইসিবি অগ্রণী মিউচুয়াল ফান্ড।