ওষুধ শিল্প ৪০০ এপিআই ব্যবহার করলেও দেশে উৎপাদন হয় ৪১টি

হামিম উল কবির
Printed Edition

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প ওষুধ উৎপাদনে ৪০০ অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট বা এপিআই ব্যবহার করলেও দেশীয় উৎপাদিত মাত্র ৪১টি এপিআই ব্যবহার করতে পারে। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় সরকার একটি এপিআই শিল্প পার্কের জন্য স্থান নির্ধারণ করে দিলেও এপিআই উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিতে পারেনি। ফলে অনেক শিল্প মালিক প্লট নিলেও সুযোগ সুবিধা না থাকায় তারা এপিআই উৎপাদনে আর কোনো বিনিয়োগ করেননি। এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ এপিআই শিল্প পার্ক প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি।

একটি পূর্ণাঙ্গ এপিআই শিল্প পার্কের জন্য সরকারকে কী করতে হতো প্রশ্ন করা হলে বাংলাদেশ ওষুধ সমিতির মহাসচিব ড. মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, মোটা দাগে গ্যাস সরবরাহ, এপিআই উৎপাদনের কাঁচামালের ওপর আরোপিত শুল্ক ও ভ্যাট যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে হবে যাতে ওষুধ শিল্পের মতো এপিআই শিল্পটাও দাঁড়িয়ে যায়। ওষুধ শিল্পের এপিআই শিল্পের জন্যও একটু সুন্দর নীতিমালা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের এপিআই উৎপাদনের বর্তমান পরিস্থিতি দেশের বৃহত্তর ওষুধ খাতের সাথে অঙ্গীভূত হয়ে এক অনিশ্চিত ও অপ্রত্যাশিত পর্যায়ে প্রবেশ করছে। দেশে ফিনিশড ওষুধ উৎপাদন প্রায় স্বনির্ভর, স্থানীয় কোম্পানিগুলো দেশীয় চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধ তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে এবং এসব ওষুধ বিশ্বব্যাপী ১৫০টিরও বেশি দেশে রফতানি হচ্ছে, এটা শিল্পের জন্য সফলতার গল্প।

এই সাফল্যের পেছনে একটি দীর্ঘদিনের দুর্বলতা এখনো দৃশ্যমান, অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট বা এপিআই, অর্থাৎ ওষুধের কার্যকর উপাদানগুলোর স্থানীয় উৎপাদন অত্যন্ত সীমিত মাত্রায় এগিয়ে আসছে। যে ৪১টি এপিআই দেশী কারখানায় তৈরি হচ্ছে এবং এই উৎপাদনটিও কয়েকটি কোম্পানি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। ফলে ৮০-৮৫ শতাংশ এপিআই বিদেশ থেকে আমদানি করে প্রয়োজন মেটাতে হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হয়ে গেলে বিদেশ থেকে অবাধে এপিআই পাওয়া যাবে না। এখন যারা এপিআই বানায় তারা ওষুধ তৈরি করে না নানা বাধ্যবাধকতায়। একটা সময় আসবে তারা এপিআই থেকে ওষুধ তৈরি করে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী হবে, বাংলাদেশ তখন সস্তায় এপিআই পাবে না। ফলে বাংলাদেশের ওষুধের দামও বেড়ে যেতে পারে।

এপিআই আমদানির ওপর নির্ভরতা শুধু বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং ডলারের ওঠানামা ও গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের উদ্বেগও দেশের ওষুধ উৎপাদন খাতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক পরিবেশে মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহে বাধা এলে স্থানীয় উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। এই কাঁচামাল আমদানিকেই এখনো কার্যকর উপায়ে চালিয়ে নিতে হয়।

২০০ একরের এপিআই শিল্প পার্কে বহু কোম্পানিকে প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে যাতে তারা কাঁচামালের উৎপাদন বাড়াতে পারে। প্রকল্পটি এক দশক আগে অনুমোদিত হলেও অনেক প্লটেই শিল্প স্থাপন করা হয়নি। গ্যাস ও অন্যান্য জরুরি সুবিধা এখনো পুরোপুরি পাওয়া যায়নি।

ওষুধ শিল্প সেক্টরের অভিজ্ঞরা বলছেন, এপিআই উৎপাদন শুধু ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ নয়, এটি বাংলাদেশকে বিশ্ব বাজারে আরো প্রতিযোগিতামূলক করতে পারে। তবে নীতিগত বাধা, প্রশাসনিক জটিলতা ও গ্যাস বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাব এই আকাক্সক্ষাকে স্থগিত করেছে।

বিগত কয়েক বছরে কিছু কোম্পানি স্থানীয় কাঁচামাল তৈরিতে ধাপে ধাপে উন্নতি করেছে। একই সাথে শিল্পসংশ্লিষ্টরা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে জোর দিয়েছেন কারণ জটিল রাসায়নিক সিন্থেসিস ও উন্নত প্রযুক্তি ছাড়া এপিআই উৎপাদনকে বিস্তৃত করা কঠিন।

যদিও এপিআই শিল্পের অগ্রগতি এখনো কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবু এপিআই শিল্পের সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে সমাধান করতে পারলে মূল্য সংযোজন ও রফতানি সক্ষমতার ক্ষেত্রে শিল্পটি আরো বিস্তৃত হতে পারে।