নেপালের বন্যা চীন ও ভারতের ভারসাম্যকে ব্যাহত করছে

ডিপ্লোম্যাট বিশ্লেষণ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

বন্যায় নেপালের বাণিজ্যিক অবকাঠামো ভেসে গেছে। চীনের সাথে নেপালের সীমিত বাণিজ্য আরো সঙ্কুুচিত হয়ে পড়বে। ফলে নেপালের বন্যা চীন ও ভারতের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে। নেপালের উত্তরাঞ্চলীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্গঠনের বিষয়টি নিজেই ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত সীমান্ত অবকাঠামো পুনরুদ্ধারের জন্য কাঠমান্ডুর চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া এই সংবেদনশীল অঞ্চলে পুনর্গঠন কাজে অন্য কোনো দেশকে যুক্ত করার বিষয়ে চীনও অনাগ্রহী হতে পারে। ফলে বন্যা পরিস্থিতি এক অদ্ভুত দ্বৈত নির্ভরতার জন্ম দিতে পারে : একদিকে তাৎক্ষণিক বাণিজ্য ও যাতায়াত ব্যবস্থার জন্য ভারতের ওপর অধিক নির্ভরতা; অন্য দিকে, সেই নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো পুনর্গঠনে চীনের দ্বারস্থ হওয়া।

৩৬ বছর বয়সী নেপালি প্রধানমন্ত্রীর জন্য এটি একটি ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক উভয়সঙ্কট তৈরি করেছে। বাণিজ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে শাহকে যেমন ভারতের ওপর আরো বেশি নির্ভর করতে হবে, তেমনি তার ওপর নয়াদিল্লির সাথে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখারও চাপ থাকবে- যা তার মূল জাতীয়তাবাদী সমর্থকগোষ্ঠীর আকাক্সক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

চীনের সাথে সংযোগকারী পাহাড়ি বাণিজ্য পথগুলো দীর্ঘকাল ধরেই ভূমিধস ও ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে, যার ফলে ভারতের বিকল্প হিসেবে বাণিজ্য ও যাতায়াতের ক্ষেত্রে এই উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিবেশীর উপযোগিতা সীমিত হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক দুর্যোগ এই দুর্বলতাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রকট করে তুলেছে।

বন্যা পরিস্থিতি ভারত ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে নেপালের প্রয়োজনীয়তাকে বদলে দেবে না। তবে এই কৌশলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের বাস্তবায়নযোগ্যতার ওপর তা প্রভাব ফেলবে।

গত ২৮ আগস্ট নেপালের নুয়াকোটে ভোতেকোশি নদীতে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় নদীর তীরবর্তী এলাকা ও সংলগ্ন বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়; এর ফলে ওই অঞ্চলের ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। নেপালে সাম্প্রতিক বন্যায় প্রাথমিক হিসেবে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ২.৫৬ বিলিয়ন ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই দুর্যোগের প্রভাব কেবল তাৎক্ষণিক মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি ২০১৫ সালের পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারের ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য অর্জনের প্রচেষ্টাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে- যে প্রচেষ্টা মূলত চীনের সাথে নতুন পরিবহন, বাণিজ্য ও ট্রানজিটসুবিধা গড়ে তোলার মাধ্যমেই চালানো হচ্ছিল।

ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত স্থলবেষ্টিত দেশ হিসেবে নেপাল দীর্ঘকাল ধরে তার দুই প্রতিবেশীর প্রভাবের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষার চেষ্টা করে আসছে। বিভিন্ন কারণে, তিন দিক থেকে নেপালকে ঘিরে রাখা ভারত ১৯৬৯ সালের পর থেকে তিনবার- সর্বশেষ ২০১৫ সালে- নেপালের সাথে উন্মুক্ত সীমান্ত অবরোধ করেছে। ওই বছর নেপাল একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করেছিল, যা ভারতের উদ্বেগের বিষয়গুলোর যথাযথ সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছিল। এ ছাড়া অন্যান্য সময়েও নয়া দিল্লি নেপালের রাজনীতিতে প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপ করেছে।

ভারতের চাপের মুখে এই দুর্বলতা কমানোর লক্ষ্যে নেপালের শাসকরা তাদের উত্তর দিকের প্রতিবেশী চীনের সাথে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন। ২০১৫ সালের অবরোধের পর, তৎকালীন কে. পি. শর্মা ওলির সরকার চীনের সাথে নতুন বাণিজ্য ও ট্রানজিট সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে বেশ কিছু চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে, কেরুং সীমান্ত পয়েন্টটিকে (যা চীনা অংশে ‘গিয়িরং’ নামে পরিচিত) সব ঋতুতে ব্যবহারযোগ্য একটি আন্তর্জাতিক ক্রসিংয়ে উন্নীত করার জন্য উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করা হয়েছিল। চীন-নেপাল বাণিজ্যের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে তাতোপানি থেকে কেরুং-এ স্থানান্তরিত হয়েছে; উল্লেখ্য, তাতোপানি ছিল দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রধান পথ যা ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত, সাম্প্রতিক বন্যায় কেরুং এলাকার বিপুল বিনিয়োগ কার্যত ভেসে গেছে। সীমান্তের উভয় পাশেই কাস্টমস ভবন বা কাস্টমস ইয়ার্ডের কোনো চিহ্নই আর অবশিষ্ট নেই।

কেরুং সীমান্ত প্লাবিত হওয়ার পর, নেপালের দিকে ভূমিধসের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে চীন তাতোপানি সীমান্তও বন্ধ করে দিয়েছে। (উল্লেখ্য, ‘ফ্রি তিব্বত’ বা তিব্বতের স্বাধীনতার পক্ষের কর্মীদের দ্বারা তাতোপানি রুটটি ব্যবহৃত হতে পারে- এমন আশঙ্কা নিয়েও বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক ছিল।) সীমান্ত-পারাপারের সমস্ত কার্যক্রম এখন কোরালার দিকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে, যা নেপাল ও চীনের মধ্যে তৃতীয় আন্তর্জাতিক সীমান্ত পথ। কিন্তু কোরালা দিয়ে যাতায়াত সহজ নয় এবং সেখানে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোরও অভাব রয়েছে। এই তিনটি ছাড়াও নেপাল-চীন বাণিজ্যের জন্য নির্ধারিত অন্য তিনটি পয়েন্ট অত্যন্ত ছোট এবং সেগুলো কেবল স্থানীয় বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

সামগ্রিক বিচারে, চীনের সাথে নেপালের বাণিজ্য- যা আগে থেকেই সীমিত ছিল- বন্যার পর তা আরো সংকুচিত হয়ে পড়বে। ভারত নেপালের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার; চীন এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি বিদ্যমান বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতাকে আরো প্রকট করে তুলবে। অথচ কাঠমান্ডুর সামনে বিকল্পের সুযোগ খুবই সীমিত। কেরুং-এর পুনর্নির্মাণ কিংবা অধিকতর পণ্য ও যানবাহন চলাচলের উপযোগী করে কোরালা সীমান্তের উন্নয়ন- উভয় ক্ষেত্রেই প্রচুর সময় ও অর্থের প্রয়োজন হবে। চীন থেকে পণ্য পরিবহন একটি বিকল্প হতে পারে, তবে তা বেশ ব্যয়বহুল। ফলে ভারতের ওপর দেশটির নির্ভরতা আরো বৃদ্ধি পাবে। নেপালের বাজারে চীনা পণ্যের জায়গায় ভারতীয় পণ্যের আধিপত্য বিস্তারের সম্ভাবনার পাশাপাশি, চীন থেকে জরুরি পণ্য আমদানির জন্যও নেপালকে এখন ভারতীয় বন্দরগুলো ব্যবহার করতে হবে।

বন্যার কারণে নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভারতের ওপর জ্বালানি-নির্ভরতাও বেড়ে যেতে পারে। রাসুয়ার বন্যা এই যুক্তিকেই আরো জোরালো করবে যে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রধান বাণিজ্যিক ও ট্রানজিট অংশীদার হিসেবে ভারতের কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প নেপালের নেই; চীন এ ক্ষেত্রে মূলত একটি সম্পূরক বা অতিরিক্ত বিকল্প হিসেবেই কাজ করে। আর নেপালে ভারতের বাণিজ্যিক প্রভাব বাড়ার সাথে সাথে কৌশলগত প্রভাবও বৃদ্ধি পাবে। সর্বোপরি, ভারতের সাথে নেপালের দীর্ঘ, সমতল ও উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে এবং উভয় দেশই সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ তার প্রথা-বহির্ভূত কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে দেশটির বৈদেশিক সম্পর্ককে আগেই জটিল করে তুলেছিলেন; শুরুতে তিনি বিদেশী দূত এবং সফররত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে ব্যক্তিগত বৈঠক এড়িয়ে চলতেন। সীমান্তবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের জন্য নেপালকে এখন বেইজিংয়ের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে; অথচ ‘এক চীন’ নীতি মেনে চলার ক্ষেত্রে নেপাল সরকারের বারবার ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত বিষয়টিতে বেইজিং বিশেষ অসন্তুষ্ট ছিল।