নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণখেলাপির তালিকা থেকে নিজেদের নাম বাদ দেয়া এবং সিআইপি মর্যাদা বজায় রাখার জন্য উচ্চ আদালতের চেম্বার জজ আদালতের আদেশ ও তথ্য গোপন করে হাইকোর্টে আবারো আবেদন করায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান জিপিএইচ ইস্পাতকে পাঁচ কোটি টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সাথে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলকে সরাসরি অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে মামলা হাতিয়ে নেয়ার অপচেষ্টার গুরুতর ঘটনাও উন্মোচিত হয়েছে বিচারালয়ে।
আদালতের নির্দেশে আগামী এক মাসের মধ্যে এই জরিমানার পাঁচ কোটি টাকা সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে। জমাকৃত অর্থ ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ছাত্র-জনতার উন্নত চিকিৎসার খরচে ব্যয় করার জন্য প্রধান বিচারপতির পরামর্শক্রমে ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। এ-সংক্রান্ত এক আবেদনের শুনানি শেষে গতকাল বুধবার হাইকোর্টের বিচারপতি মো: নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি মাহমুদ হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই নজিরবিহীন আদেশ দেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে অত্যন্ত শক্ত অবস্থান নিয়ে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২৭টি ব্যাংকে জিপিএইচ ইস্পাতের প্রায় দুই হাজার ১০০ কোটি টাকার দেনা ও ঋণ রয়েছে। আইন অনুযায়ী তারা ঋণখেলাপি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত হন; কিন্তু নিজেদের ঋণখেলাপি থেকে অব্যাহতি ও সিআইপি মর্যাদা ধরে রাখতে গত ৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে জিপিএইচ ইস্পাত হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে। হাইকোর্ট প্রথমে একটি রুল জারি করে নাম প্রকাশে অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেন। তবে রাষ্ট্রপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করলে গত ৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত হাইকোর্টের সেই স্থগিতাদেশ বাতিল করে দেন। এর ফলে সিআইবি ডাটাবেজে জিপিএইচ ইস্পাত ঋণখেলাপি হিসেবেই বহাল থাকে এবং কোনো ছাড় পাওয়ার আইনি সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ সত্ত্বেও জিপিএইচ ইস্পাত অস্বচ্ছ উদ্দেশ্যে ঘটনা ঘুরিয়ে নিম্ন আদালতে ২১ কোটি ২৭ লাখ ৩৯ হাজার ৫৪৩ টাকা মূল্যমানের একটি নতুন টাইটেল সুট দায়ের করে একই ধরনের সুবিধা পাওয়ার আবেদন করে। নিম্ন আদালত আইনগত সুযোগ না থাকায় তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। সেখানে ব্যর্থ হয়ে তারা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্টের আগের কোনো আদেশের কথা উল্লেখ না করে সম্পূর্ণ তথ্য গোপন করে হাইকোর্টে একটি মিসলেনিয়াস আপিল দায়ের করে। বিষয়টি রাষ্ট্রপক্ষের নজরে এলে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল বিস্তারিত তথ্য ও এফিডেভিট আদালতের সামনে তুলে ধরেন এবং জানান যে, এটি আদালতের প্রতি সুস্পষ্ট প্রতারণা।
এই শুনানিকালেই প্রকাশ্যে আসে আরো এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। অ্যাটর্নি জেনারেল নয়া দিগন্তকে স্পষ্টভাবে জানান, মামলাটিতে অনৈতিক ও অবৈধ সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্যে জিপিএইচ ইস্পাত অ্যাটর্নি জেনারেলকেই অনৈতিক প্রস্তাব দেয়ার চেষ্টা করে। আদালতের সামনে এই বিষয়টি অ্যাটর্নি জেনারেল তুলে ধরার পর জিপিএইচ ইস্পাতের পক্ষে আগে নিয়োজিত তিনজন সুপরিচিত ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নৈতিকতার স্বার্থে তৎক্ষণাৎ মক্কেলের হয়ে মামলা পরিচালনা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেন। পরবর্তী সময়ে নতুন আইনজীবীরা লিখিতভাবে আদালতে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে জানান যে, আগের আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ ও অনৈতিক প্রস্তাবের বিষয়টি তাদের কাছে মক্কেল পুরোপুরি গোপন রেখেছিল।
সব তথ্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট অস্বচ্ছ উদ্দেশ্যে তথ্য গোপনের আবেদনটি সরাসরি খারিজ করে দেন এবং আদালতের সাথে প্রতারণার দায়ে জিপিএইচ ইস্পাতকে পাঁচ কোটি টাকা খরচা বা জরিমানা করেন। জরিমানা মওকুফের কোনো সুযোগ না দিয়ে আদালত আগামী ৩০ দিনের সময় বেঁধে দেন। সেই জরিমানার অর্থ জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসায় ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়া হয়।
আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, এটি কেবল একটি মামলা নয়; বরং দেশের বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা রক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় দৃষ্টান্ত। কোনো অর্থবিত্তশালী মানুষ আদালতে এসে তথ্য গোপন করে অবৈধ সুবিধা হাসিলের অপচেষ্টা করলে কিংবা অনৈতিক প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিলে যে পার পাওয়া যায় না, এই রায়ের মাধ্যমে সমাজ ও করপোরেট অঙ্গনে সেই শক্ত বার্তাটিই পৌঁছে দেয়া হয়েছে।



