পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার আগুনমুখা নদীর তীরে দাঁড়ালে দূর থেকেই চোখে পড়ে উঁচু মাস্তুল আর কাঠের গায়ে টুকটুক শব্দ। শীতের নরম রোদ মাথায় নিয়েই দেশীয় কারিগরদের নিপুণ হাতে গড়ে উঠছে একের পর এক সমুদ্রগামী মাছ ধরার ট্রলার। নদীতীরজুড়ে যেন এক নীরব শিল্পাঞ্চল, যেখানে কাঠ, লোহা আর মানুষের ঘাম মিলেমিশে জন্ম নিচ্ছে সাগরে ভাসার নতুন স্বপ্ন।
এ শিল্পের অন্যতম অভিজ্ঞ কারিগর হেডমিস্ত্রি রাখাল মণ্ডল। চার দশকের বেশি সময় ধরে ট্রলার নির্মাণের সাথে যুক্ত তিনি। জানালেন, প্রতিটি ট্রলার তৈরির আগে মালিকের চাহিদা অনুযায়ী নকশা ও মাপ ঠিক করা হয়। ‘ট্রলার যেমন হবে, সেটার ছবিটা আগে মাথায় আঁকা থাকে। তারপর ধাপে ধাপে কাঠামো দাঁড় করাই’, বললেন তিনি। রাখালের ভাষায়, একটি বড় সমুদ্রগামী ট্রলার বানাতে সময় লাগে তিন থেকে সাড়ে তিন মাস। খরচ পড়ে গড়ে ৮০-৯০ লাখ টাকা। তবে কাজ শেষ হলেও দায়িত্ব শেষ হয় না। সমুদ্রে নামানোর পর পরীক্ষামূলকভাবে চালিয়ে দেখে তবেই কারিগরদের কাজ সম্পন্ন বলে ধরা হয়।
এ কর্মযজ্ঞে যুক্ত শতাধিক শ্রমিক। কেউ চুক্তিভিত্তিক, কেউ দৈনিক মজুরিতে কাজ করেন। শ্রমিক সুজিৎ জানান, দৈনিক এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা সাধারণ মজুরি হলেও দক্ষ শ্রমিকরা পান দুই হাজার টাকার কাছাকাছি। আবার নতুন বা সহকারী শ্রমিকদের আয় তুলনামূলক কম। তবু এ পেশাই অনেক পরিবারের জীবিকার একমাত্র ভরসা।
আরেক হেডমিস্ত্রি ফারুখ জানান, একটি আধুনিক ট্রলারের দৈর্ঘ্য সাধারণত ৫০-৫৫ ফুট, উচ্চতা ১০ ফুটের কাছাকাছি। মাস্তুল তৈরি হয় বড় ও শক্ত গাছ দিয়ে। কাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হয় রেইনট্রি, মেহগনি, কড়ই ও চাম্বল। কাঠের সাথে শক্ত কাঠামোর জন্য ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন মাপের লোহা। এসব উপকরণের দাম বাড়ায় নির্মাণ ব্যয়ও দিন দিন বাড়ছে।
ট্রলার মালিক মাছুম মল্লিক বলেন, একটি ট্রলার বানাতে তার প্রায় ৭৫ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। তবে বিনিয়োগের ঝুঁকি কম নয়। ‘এক সময় এক মৌসুমেই খরচ উঠে যেত। এখন তিন বছরেও পুরো খরচ ওঠে না। সমুদ্রে গেলে ভাগ্য ভালো হলে বড় লাভ, আর খারাপ হলে লোকসান গুনতে হয়,’ বললেন তিনি। তবুও সাগরের টান আর জীবিকার প্রয়োজনে এ ঝুঁকি নিয়েই এগিয়ে যান উপকূলের মানুষ।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জহিরুন্নবী জানান, বৈরী আবহাওয়া ও নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও জেলেরা নতুন ট্রলার নির্মাণে আগ্রহী। তার মতে, এ শিল্পে পরিকল্পিত পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়া গেলে মৎস্য আহরণ বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতিতেও বড় অবদান রাখা সম্ভব হবে।আগুনমুখা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এ কাঠের দেহ আর লোহার কাঠামো কেবল ট্রলার নয়, এগুলো উপকূলের মানুষের শ্রম, ঝুঁকি আর সম্ভাবনার প্রতীক। সাগরের ঢেউয়ের মতোই এ শিল্পের পথচলা উত্থান-পতনে ভরা, তবু থেমে নেই কারিগরদের হাত।



