মুহা. আব্দুল আউয়াল রাজশাহী
উত্তরাঞ্চলের কৃষি, সেচ ও ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবস্থাপনায় প্রায় চার দশক ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। সময়ের সাথে প্রতিষ্ঠানটির প্রকল্প ও কার্যক্রম বহুগুণ বেড়ে গেলেও এখনো তাদের অনুমোদিত পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো (অর্গানোগ্রাম) না থাকায় জনবল ব্যবস্থাপনা, পদোন্নতি, নিয়োগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে।
বিএমডিএ সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠার সময় সীমিত পরিসরের কাজের জন্য যে জনবল কাঠামো ছিল, তা আর হালনাগাদ হয়নি। অথচ বর্তমানে সেচ সম্প্রসারণ, জলাধার নির্মাণ, পুকুর খনন, খাল পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ এবং জলবায়ু সহনশীল বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সংস্থাটি। প্রয়োজনভিত্তিক স্থায়ী পদ সৃষ্টি না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক ও প্রকল্পভিত্তিক জনবলের ওপর নির্ভর করে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অর্গানোগ্রাম, নিয়োগ বিধিমালা ও পদোন্নতি নীতিমালার অভাবে কর্মকর্তাদের পেশাগত অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে। একই সাথে পদায়ন, দায়িত্ব বণ্টন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিএমডিএর ১২৫ জন কর্মকর্তার মধ্যে প্রায় ৯৫ জন বিভিন্ন পদে চলতি দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করলেও তারা নিয়মিত পদোন্নতি বা সংশ্লিষ্ট পদের বেতনভাতা পাচ্ছেন না। এমনকি প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে থাকা অনেক কর্মকর্তাও মূল পদের বেতনেই কাজ করছেন।
প্রতিষ্ঠানটিতে সর্বশেষ নিয়োগ হয়েছে ২০০৩ ও ২০০৮ সালে। একসময় কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ছিল প্রায় এক হাজার ২৫০ জন। বর্তমানে তা কমে ৭০৩ জনে দাঁড়িয়েছে। জনবল সঙ্কট মোকাবেলায় আউটসোর্সিং ও অস্থায়ী নিয়োগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিএমডিএ এক হাজার ৯১১টি পদের প্রস্তাব দিলেও মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিয়েছে মাত্র ৬৫০টি পদ। ফলে বাস্তব চাহিদা ও অনুমোদিত জনবল কাঠামোর মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালনার জন্য অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম অপরিহার্য। এর মাধ্যমেই জনবল, দায়িত্ব, পদোন্নতি ও জবাবদিহির কাঠামো নির্ধারিত হয়। এটি না থাকলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়।
তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির সঙ্কট ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনার বর্তমান বাস্তবতায় বিএমডিএ’র জন্য প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, তথ্যপ্রযুক্তি কর্মকর্তা এবং গবেষণা সংশ্লিষ্ট পদ অন্তর্ভুক্ত করে সময়োপযোগী সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বিএমডিএ’র একটি দায়িত্বশীল সূত্রের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অর্গানোগ্রাম অনুমোদনের বিষয়ে যথেষ্ট উদ্যোগও নেয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানের ভেতরের একটি প্রভাবশালী পক্ষ এ প্রক্রিয়ায় অনাগ্রহী বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বিএমডিএ’র নির্বাহী পরিচালক আবু সাঈদ মো: কামরুজ্জামান বলেন, অর্গানোগ্রাম অনুমোদনের বিষয়ে তিনি আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। তার বলেন, ‘শুনেছি একটি পক্ষ অর্গানোগ্রাম চায় না। কিন্তু এটি বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন। বিষয়টি এগিয়ে নিতে আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, দীর্ঘদিনের এই কাঠামোগত সঙ্কট নিরসনে দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ অর্গানোগ্রাম, নিয়োগ বিধিমালা ও পদোন্নতি নীতিমালা অনুমোদন করা প্রয়োজন। তাদের মতে, তা না হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কাক্সিক্ষত সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে না।



