নিজস্ব প্রতিবেদক
- ৪ সিটিতে টিকাদান কর্মসূচি শুরু
- ময়মনসিংহে চরম আইসিইউ সঙ্কট
দেশে হামের প্রকোপ ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করছে। সারা দেশে নতুন করে আরো ছয় শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। একই সাথে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ২৬৮ জন শিশু। এর মধ্যে কেবল ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালেই নতুন করে প্রাণ হারিয়েছে দুই শিশু, ফলে সেখানে হামে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ জনে। এমন সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে প্রাণঘাতী এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ চারটি সিটি করপোরেশনে একযোগে শুরু হয়েছে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি।
ময়মনসিংহ অফিস জানিয়েছে, ময়মনসিংহ ও এর আশপাশের জেলাগুলোতে হামের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মমেক হাসপাতালে প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। হাসপাতালের হাম মেডিক্যাল দলের ফোকাল পারসন সহযোগী অধ্যাপক ডা: মোহা: গোলাম মাওলা জানান, শনিবার রাতে ফুলপুর ও গৌরীপুর উপজেলা থেকে আসা ৯ ও ১০ মাস বয়সী দুই শিশু চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। তারা উভয়েই নিউমোনিয়া, হার্ট ফেইলিউরসহ হামের তীব্র উপসর্গে ভুগছিল। গত ১৭ মার্চ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত মমেক হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৩৯৭ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৩১২ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ২৮ জন, তবে নতুন করে ভর্তি হয়েছে আরো ২৬ শিশু। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৭৩ জন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মমেক হাসপাতালে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের জন্য আইসিইউ ওয়ার্ড প্রস্তুত থাকলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও দক্ষ জনবলের অভাবে তা এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা: মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান জানান, বর্তমানে তিনটি মেডিক্যাল টিম গঠন করে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। আইসিইউ সুবিধা না থাকায় হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডেই বাবল সিপ্যাপ পদ্ধতিতে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুদের অক্সিজেন সাপোর্ট দেয়া হচ্ছে। আইসিইউ চালুর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদা পাঠানো হলেও তা কবে নাগাদ কার্যকর হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। চোখের সামনে প্রস্তুত আইসিইউ থাকতেও উন্নত চিকিৎসা থেকে সন্তানদের বঞ্চিত হতে দেখে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা।
অন্য দিকে সারা দেশের পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, নতুন করে যে ছয় শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, তাদের মধ্যে চারজনের মৃত্যু হামের কারণেই হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ছাড়া হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এক হাজার ২৬৮ জন শিশুর মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ১৫০ জনকে নিশ্চিতভাবে হাম আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। রোগটির বিস্তার রোধে দেশের সকল পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে রোগীদের জন্য বিশেষ আইসোলেশন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
হামের এই ভয়াবহ বিস্তার রোধে এবং শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিতে গতকাল রোববার থেকে ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল- এই চারটি সিটি করপোরেশনে একযোগে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নগর ভবন অডিটোরিয়ামে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানান, গত ৫ এপ্রিল দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় এই টিকাদান শুরু হয়েছিল। আগামী ২০ এপ্রিল থেকে দেশের বাকি অংশেও কার্যক্রম চলবে, যা শেষ হবে আগামী ২০ মে। এই কর্মসূচির আওতায় ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রতিটি শিশুকে হামের টিকা প্রদান করা হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে হামসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রতিটি শিশুকে সফলভাবে টিকার আওতায় আনতে পারলে আমরা এই ঘাতক রোগ থেকে রক্ষা পাব।’ পাশাপাশি তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘হাম নিয়ন্ত্রিত হলেও সামনে ডেঙ্গুর একটি বড় ধাক্কা আসতে পারে। আমরা তা মোকাবেলার জন্য এখন থেকেই কাজ শুরু করেছি।’ অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা: প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস আইসোলেশনের গুরুত্ব তুলে ধরে টিকাদান কর্মসূচিকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার আহ্বান জানান। সভাপতির বক্তব্যে ডিএসসিসির প্রশাসক মো: আব্দুস সালাম মন্তব্য করেন, বিগত সরকারের অসাবধানতার কারণেই আজ এই সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে। অনুষ্ঠানে রেলপথ, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। এ দিকে রোববার সকালে রাজধানীর বনানীর এরশাদ মাঠে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা: এম এ মুহিত। তিনি হার্ড ইমিউনিটি নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে বলেন, ‘হামের প্রাদুর্ভাব চিরতরে কমাতে হলে কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। মানুষের সুবিধার জন্য স্থায়ী কেন্দ্রের পাশাপাশি বহু অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রও স্থাপন করা হয়েছে। এই কর্মসূচি সফল করতে হলে অভিভাবকদের সবচেয়ে বেশি সচেতন হতে হবে।’



