দালাল সিন্ডিকেটের খপ্পরে ৩০ কর্মী : ঢাকায় রুশ দূতাবাসে মানববন্ধনের প্রস্তুতি
নতুন শ্রমবাজার রাশিয়ার একটি নির্মাণ সংস্থায় কাজের কথা বলে ৩০ জন বাংলাদেশী শ্রমিককে ইউক্রেন সীমান্তের যুদ্ধকবলিত এলাকায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের পরিবারের দাবি, একটি দালাল সিন্ডিকেট কৌশলে এসব কর্মীকে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। বর্তমানে তারা চরম যুদ্ধঝুঁকির মধ্যে অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন।
উদ্বিগ্ন স্বজনরা তাদের প্রিয়জনদের সাথে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারছেন না। তবে দু-একজন কর্মী কোনোমতে যে খুদেবার্তা (এসএমএস) পাঠাতে পেরেছেন, তার বিবরণ অত্যন্ত ভয়াবহ। নিরুপায় হয়ে আতঙ্কিত পরিবারগুলো এখন তাদের স্বজনদের অক্ষত অবস্থায় উদ্ধারের দাবিতে ঢাকায় রাশিয়ান দূতাবাসের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচির পরিকল্পনা করছেন।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত : সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাশিয়ার নির্মাণ খাতে (কনস্ট্রাকশন কোম্পানি) নিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশী কর্মীদের কৌশলে ইউক্রেন সীমান্তবর্তী অজানা স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। বিষয়টি জানতে পেরে তাদের দ্রুত উদ্ধারের জন্য রিক্রুটিং এজেন্সির পক্ষ থেকে রাশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। তবে গত শনিবার পর্যন্ত ভুক্তভোগীদের উদ্ধারে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়নি। এদিকে, ঘটনার পর থেকেই ৩০ কর্মীকে পাঠানো ঢাকার রিক্রুটিং এজেন্সি ‘মেসার্স আর এস ইন্টারন্যাশনাল’ (আরএল নম্বর-১৪২৮)-এর স্বত্বাধিকারী মো: মোস্তাফিজুর রহমানের মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, রাশিয়ায় পাঠানোর নাম করে একাধিক এজেন্সির মালিক ও দালাল চক্র প্রতি শ্রমিকের কাছ থেকে সাত থেকে আট লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
সচিবের কাছে এজেন্সির আবেদন
গত ১৯ মে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: মোখতার আহমেদের কাছে লিখিত আবেদন করেন আর এস ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী। ‘রাশিয়ায় প্রেরিত কর্মীদের চাকরিজনিত সমস্যা সমাধানে জরুরি সহযোগিতা প্রসঙ্গে’ শিরোনামের ওই চিঠিতে বলা হয় : রাশিয়ার ওরানবাগে অবস্থিত ‘পিআরও টেকনোলজি লিমিটেড’ কোম্পানি থেকে তারা ৭০ জন কর্মীর একটি চাহিদাপত্র (ডিমান্ড লেটার) পেয়েছিলেন। রাশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস সরেজমিন যাচাই-বাছাই শেষে ৩৪ জন কর্মীর ভিসা সত্যায়ন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ জন কর্মীকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়।
কিন্তু মস্কো থেকে ওরানবাগ শহরে পৌঁছানোর পর কর্মীদের একটি ড্রোন সংযোজন (ড্রোন অ্যাসেম্বলিং) কারখানায় কাজ করতে বলা হয়। কর্মীরা পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় নির্মাণ খাতে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করলে, তাদেরকে কনস্ট্রাকশন কাজের আশ্বাসে বিতর্কিত ‘দোনেৎস্ক’ শহরে নিয়ে যাওয়া হয়। এলাকাটি ইউক্রেনীয় যুদ্ধক্ষেত্রের অত্যন্ত নিকটবর্তী হওয়ায় কর্মীরা বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন।
চিঠিতে এজেন্সি মালিক মোস্তাফিজুর রহমান রাশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মূল কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করে কর্মীদের দ্রুত নিরাপদ কর্মপরিবেশে ফিরিয়ে আনার জন্য অনুরোধ জানান।
‘তোমরা আমার আশা ছেড়ে দাও’
রাশিয়ায় গিয়ে ‘নিখোঁজ’ থাকা ৩০ কর্মীর মধ্যে একজনের বাড়ি রাজবাড়ী জেলায়। গতকাল তাঁর স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার স্বামী এখন কোথায়, কী অবস্থায় আছেন, আমি জানি না। কয়েক দিন আগে মোবাইলে একটা মেসেজ পাঠায়। সেখানে লিখেছে- ‘তোমরা আমার আশা ছেড়ে দাও। আমার মনে হয় আর বেঁচে দেশে ফেরা সম্ভব নয়। যদি আমি আর না ফিরি, তবে সন্তানদের মাদরাসায় লেখাপড়া করাইও। আমি যে মেসেজ পাঠাইছি, এটা যদি রাশিয়ার সেনাবাহিনী জানতে পারে, তবে আমাকে মেরেই ফেলবে।’
শুধু রাজবাড়ীর এই কর্মীই নন, বাকি ২৯ জনের পরিবারের চিত্রও একই রকম। এদিকে, এক কর্মীর আত্মীয় জানান, ঢাকার খিলক্ষেত থানায় অভিযুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করেনি। ওই জিডির কপিতে উল্লেখ ছিল, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পরপরই কর্মীদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়া হয়েছে এবং দালালরা তাদের সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছে।
বাজার হারানোর আশঙ্কা ব্যবসায়ী নেতাদের
কাকরাইলের ‘ফ্লেয়ার রিক্রুটিং এজেন্সি’র মালিক আনিসুর রহমান এই প্রসঙ্গে বলেন, “আরএস ইন্টারন্যাশনালসহ অন্যান্য এজেন্সির মাধ্যমে যাওয়া ৩০ কর্মী জিম্মি হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কর্মীরা তো বৈধভাবেই গিয়েছিলেন। এখন সেখানে গিয়ে কার খপ্পরে পড়েছেন, তা রাশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ভালো বলতে পারবে।”
তিনি আরো যোগ করেন, “এমনিতেই আমাদের বৈদেশিক শ্রমবাজারের অবস্থা ভালো না। রাশিয়ার মতো একটি সম্ভাবনাময় নতুন বাজার যদি দালালদের কারণে হাতছাড়া হয়, তবে দেশের বড় ক্ষতি হবে। একজন কর্মীর দেশটিতে যেতে সর্বোচ্চ চার লাখ টাকা খরচ হওয়ার কথা, সেখানে দালাল চক্রের কারণে তা আট লাখ টাকায় ঠেকছে।’
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই ৩০ কর্মীকে রাশিয়ায় পাঠানোর প্রক্রিয়ার সাথে ‘জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ (আরএল-২৫০৫)-এর চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান এবং ‘এস টি এস ওভারসিজ লিমিটেড’ (আরএল-১১৫৮)-এর স্বত্বাধিকারী মো: তাজ উদ্দিন শাহ-এর নামও জড়িয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, এই চক্রগুলোর মাধ্যমেই কর্মীরা রাশিয়ার ওই বিপজ্জনক অঞ্চলে পাড়ি জমিয়েছেন।



