জলবায়ু পরিবর্তনে দেশে উপকূলীয় অভিবাসন বা শহরগুলোতে নিত্যদিন ভাসমান মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এ সঙ্কট মোকাবেলায় গ্রামাঞ্চলে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ আরো বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছেন উপকূলীয় উন্নয়ন এবং অধিকার আদায়ের অন্যতম প্রধান এনজিও কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি মূলত উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ক্ষুদ্রঋণ এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুতে কাজ করেন।
নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ঢাকায় এখনই জনসংখ্যা দেড় কোটির মতো। আগামী দুই দশকে আরো এক কোটি মানুষ ঢাকায় এসে পড়বে। তাই এখন থেকে বহুমুখী কর্মসংস্থানের দিকে যেতে না পারলে শহরগুলোতে এত বিপুলসংখ্যক উপকূল অভিবাসন সামাজিক অস্থিরতা, অপরাধসহ নানামুখী সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে। এসব বিষয়ে এখনই নজর দেয়া দরকার।
নয়া দিগন্ত : উপকূল থেকে শহরমুখী মানুষের ভিড় বাড়ছে অনেকটা শরণার্থীর মতো।
রেজাউল করিম চৌধুরী : জলবায়ু শরণার্থী বলাটা ঠিক হবে না। শরণার্থীর সংজ্ঞা অনুযায়ী ১৯৫২ সালে জেনেভা কনভেনশনের ভিত্তিতে রাষ্ট্র কর্তৃক যারা নির্যাতিত হয় এবং সেই দেশ ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হয় যেমন ফিলিস্তিনি ও রোহিঙ্গা- তারা হলো শরণার্থী। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যারা বাসস্থান ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন এদেরকে বলা যায় জলবায়ু উদ্বাস্তু। দেশে জলবায়ু উদ্বাস্তু বাড়ছে কয়েকটি কারণে। উপকূলীয় এলাকায় সুন্দরবন হিরণ পয়েন্ট, সেন্টমার্টিনে সমুদ্রের পানির স্তর বেড়ে গেছে এবং প্রচুর ছোট ছোট সাইক্লোন হচ্ছে। বাংলাদেশে কী পরিমাণ বাস্তুচ্যুতি ঘটছে তার কোনো সায়েন্টিফিক ইনফরমেশন কোনো সংস্থা করে নাই। কিন্তু এটা হচ্ছে। ঢাকা শহরে প্রতিদিন উপকূলীয় এলাকা থেকে সদরঘাট হয়ে প্রায় দুই হাজার লোক চলে আসছে। কুতুবদিয়ার লোকজন কক্সবাজার শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। জলবায়ু বাস্তুচ্যুতটা এভাবেই হচ্ছে। ঢাকায় বিএনপি বস্তি, কড়াইল বস্তি, ভোলা বস্তি, এগুলো সব জলবায়ু উদ্বাস্তুদের আবাসস্থল। এদের জন্য স্পেসিফিক বিদেশী সহায়তা আসেনি। সরকারকে এ সমস্যা প্রগ্রেসিভলি সমাধান করতে হবে।
নয়া দিগন্ত : কিভাবে সমন্বয় করে এ সঙ্কট মোকাবেলা করা যায়?
রেজাউল করিম চৌধুরী : এ জন্য দুটো ইস্যুর একটি হচ্ছে উপকূলে প্রটেকশন দেয়া, বাঁধ দেয়া, ড্রাইভ করা- এগুলো খুব খরচসাপেক্ষ। তবে এ ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিনিয়োগ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষার পাশাপাশি পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার জন্য সহায়ক হতে পারে। সরকার পরিকল্পনা করেছে। এ ছাড়া খুলনা থেকে ঢাকা পর্যন্ত শহরগুলোকে বন্যার পানি থেকে নিরাপদ করতে হবে। দ্বিতীয়ত সুয়্যারেজ সিস্টেম উন্নত করতে হবে। তৃতীয়ত খাবার পানির বন্দোবস্ত এখানে খুব সিকিউরড করতে হবে। কারণ আমাদের অর্থনীতির ৭০ ভাগ অ্যাক্টিভিটি ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা শহরে কেন্দ্রীভূত। গ্রামে একটা লোক সহজে কাজ পায় না। ঢাকায় চলে এলে ছোট হোক বড় হোক কাজ পায়।
নয়া দিগন্ত : জলবায়ু সঙ্কট মোকাবেলার কাজ হচ্ছে কিন্তু এর সাথে পাল্লা দিয়ে বলা যায় শহরে মানুষ বাড়ছে।
রেজাউল করিম চৌধুরী : আমাদের দুই উপায়ে কাজ করতে হবে। শহরগুলোকে নিরাপদ করতে হবে কারণ কর্মসংস্থানের জন্য মানুষ এখানে ছুটে আসবেই। উপকূলে বড় বড় ড্রাইভ দিতে হবে। বিদ্যুৎসহ শহরের বিভিন্ন সুবিধা গ্রামের মানুষও চায়, এজন্যই তারা কাজের খোঁজে শহরে ছুটে আসে। ক্ষমতা বলেন, শিক্ষা বলেন, চিকিৎসা বলেন এসব সুবিধা নগরে কেন্দ্রীভূত। আবার নগরে মানুষের জন্য আলাদা ধরনের স্কিল বা সক্ষমতা দরকার। ইলেকট্রিক মেকানিক, প্লাম্বার, গাড়ির চালক দরকার। গ্রামে টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল এডুকেশন-ট্রেনিং বাড়াতে হবে। গ্রাম থেকে একটা ছেলে ইলেকট্রিক মেকানিকের ট্রেনিং নিয়ে, গাড়ি চালানো শিখে যেনো ঢাকায় আসতে পারে।
নয়া দিগন্ত : ব্লুমবার্গের এক রিপোর্টে বলা হচ্ছে আগামী ১০-২০ বছরে ঢাকায় আরো এক কোটি মানুষ আসবে, এত বিপুল লোকের কর্মসংস্থান, বাসস্থান কিভাবে সম্ভব?
রেজাউল করিম চৌধুরী : সরকার ছাড়াও বেসরকারি ব্যবস্থাপনা, সমন্বয় করেই আমাদের এগোতে হবে। জলবায়ু অভিঘাতের জন্য আমরা কোনোভাবেই দায়ী না। বাংলাদেশের জনগণ বছরে দুই কেজি কার্বনও উদগীরণ করি না। উন্নত দেশের একটা লোক বছরে প্রায় ২০ টন কার্বন উদগীরণের জন্য দায়ী। তাদের কাছ থেকে সহায়তা চাচ্ছি কিন্তু তারা দিচ্ছে না। আমরাও বসে থাকতে পারি না। প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১৪ শ’ মানুষ বাস করছে আমাদের দেশে। জনসংখ্যার গড় অনুযায়ী। ভারতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যা হচ্ছে তিন শ’। ঢাকার মোহাম্মদপুরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যা হচ্ছে ৯০ হাজার। কোনো না কোনোভাবে আমাদের এ লোকগুলোকে সংস্থান করতে হবে।
নয়া দিগন্ত : দক্ষ জনশক্তি রফতানি তো আরেক বিকল্প হতে পারে?
রেজাউল করিম চৌধুরী : অবশ্যই। ছেলেমেয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলে বিদেশে পাঠানো আরেক বড় উপায়। এটাও সহজ নয়। পরিস্থিতি মেনে নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। এখন ন্যাচারাল লেবার পাঠাচ্ছি। তাকে দক্ষ করতে তো কিছু বেসিক এডুকেশন দিতে হবে। কাজ চালানোর মতো ইংরেজি শেখাতে হবে। দুবাই গেলে দেখবেন মাস্টার্স পাস বাংলাদেশী ছেলেমেয়ে টয়লেটে কাজ করছে। শ্রীলঙ্কা বা কেরালার একটা লোক ভালো ইংরেজি জানে বলে সে দোকানে সেলসম্যান হিসেবে কাজ করছে। এসব ইস্যু নিয়ে ভাবতে হবে।
নয়া দিগন্ত : ঢাকায় এরই মধ্যে জনসংখ্যা দেড় কোটি ছাড়িয়ে গেছে, সারা দেশ থেকে মানুষের শহরে আসার চাপ অব্যাহত থাকলে তো সামাজিক অস্থিরতার কারণগুলো বেড়ে যায়
রেজাউল করিম চৌধুরী: হ্যাঁ, এটার অনেকগুলো সিকোয়েন্স আছে। অপরাধ বেড়ে যায়। ট্রাফিক জাম হচ্ছে। এগুলো যে সরকার বা বেসরকারি উপায়ে মোকাবেলার চেষ্টা হচ্ছে না তা নয়। জলবায়ু দূষণের জন্য বিদেশীদের বলতে হবে এটা তোমাদের দায়, সহায়তা চাইব কিন্তু ওরা না করলে আমাদের বসে থাকলে চলবে না। বহুমুখী কর্মসংস্থানের দিকে যেতে হবে।



