দুবাই লেবানন কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যে চতুর্মুখী সঙ্কটে বাংলাদেশীরা

Printed Edition

মনির হোসেন

ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রেক্ষিতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের পাল্টা হামলার ঘটনার পর থেকে সৌদি আরব, দুবাই, লেবানন, কাতার, কুয়েতসহ অন্যান্য দেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশীদের দিন কাটছে এখন ভয় আর শঙ্কার মধ্যে। শুধু ভয় নয়, যুদ্ধের দুই সপ্তাহ না পেরোতে বাংলাদেশী কর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চতুর্মুখী সঙ্কট।

এর মধ্যে কোনো দেশে বাংলাদেশী কর্মীর চাকরি হারানো, কোনো দেশে কর্মীর কোম্পানিতে চাকরি থাকলেও মিলছে না ঠিকমতো বেতন-ভাতা, আবার কোনো দেশে ফাইট চলাচল বন্ধ থাকায় অনেক প্রবাসীকর্মী বিমানের টিকিট কেটেও দেশে ফিরতে না পারাসহ চতুর্মুখী সঙ্কটে পড়ে অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। যুদ্ধবিধ্বস্তের মধ্যে আবার কোনো কোনো দেশে প্রবাসীদের স্বাভাবিকভাবে মৃত্যু হলেও তাদের লাশও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ দেশে পাঠাতে পারছে না। বাধ্য হয়ে পরিবারের সম্মতি নিয়ে ওই প্রবাসীর লাশ স্থানীয়ভাবেই দাফন করে দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ ইসরাইল ইরানের ওপর আক্রমণ করে বসে। এর সাথে যোগ দেয় বিশ্বের প্রধান পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র। তাদের যৌথ হামলায় প্রথম দিনই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্নীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শত শত ইরানি নিহত হওয়ার সংবাদ পাওয়া যায়। সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই ইরান ওই দিন ভোর রাতেই ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ইরাক, লেবাননসহ ১৬টি দেশে আমেরিকার ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে মিসাইল ও ড্রোন হামলা শুরু করে। হামলায় বিদেশী নাগরিকসহ কোনো কোনো দেশে প্রবাসী বাংলাদেশীরা হতাহত হয়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরব, দুবাই, বাহরাইনে পাঁচজন বাংলাদেশী নিহত এবং অর্ধশত আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তাদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

গতকাল কুয়েত হাসাবিয়া এলাকার এবিই মানি এক্সচেঞ্জ হাউজের ব্র্যাঞ্চ ম্যানেজার এ কে এম আজাদ যুদ্ধ-পরবর্তী কুয়েতের প্রবাসী বাংলাদেশীদের অবস্থা সম্পর্কে বলেন, আমরা সবাই সাইরেনের ভয় আর আতঙ্কের মধ্যে আছি। যুদ্ধের কারণে গত মাসেও যে হারে রেমিট্যান্স পাঠাতো সেভাবে পাঠাতে পারছে না। তিনি বলেন, এবার ঈদে একজন প্রবাসীকর্মীর মেয়ে তার বাবাকে টেলিফোনে বলছিল, বাবা তুমি আমাদের ঈদের কাপড় কেনার টাকা পাঠাবে না? কিন্তু ওই প্রবাসী তার মেয়ের কথার কোনো উত্তর দিতে পারেননি। শুধু বলেছে, পাঠাবো মা। আজাদ বলেন, বাপ মেয়ের কথা শুনে আমার খুবই কষ্ট লেগেছে। পরে আমি যতটুকু পেরেছি ওই মেয়েটির জন্য করার চেষ্টা করেছি। শুধু একজন প্রবাসী নয়, এমন অসংখ্য প্রবাসী সমস্যার কারণে এবার দেশে টাকা পাঠাতে পারছে না। এভাবে চললে সামনের দিনগুলো আরো খারাপ হতে পারে। গত দু’দিন আগে কুয়েতের প্রধানমন্ত্রী এয়ারপোর্ট ভিজিট করেছেন। কিন্তু এখনো ফাইট চালু করার কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। কুয়েত এয়ারপোর্টেও মিসাইল হামলা হয়েছিল। এতে চার বাংলাদেশী আহত হন। এর আগে কুয়েতের প্রবাসী বাংলাদেশী জালাল উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি গত ফেব্রুয়ারি মাসের ২২ তারিখে কোম্পানি থেকে বেতন পেয়েছিলাম। এরপর আর কোনো বেতন পাইনি। ডিউটি করছি প্রতিদিন। তবে আজকে ১২ তারিখ। মনে হচ্ছে এবার ঈদের আগে কোন বেতন পাবো না। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যুদ্ধের কারণে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থাই খারাপ। সামনে কি যে হয় জানি না। তার মতে, যুদ্ধের পর অনেক কর্মীর চাকরি নাই। যাদের কাজ তারা ঠিকমতো বেতন পাচ্ছে না। এসব ভেবে আমি এখন দিশেহারা। কুয়েতের মতোই কাতার, দুবাই, লেবানন, ওমান, বাহরাইন, সৌদি আরবে বিরাজ করছে চরম অস্থিরতা।

গত রাতে লেবাননের বাংলাদেশ দূতাবাসের দূতালয় প্রধান ফেসবুক পেজে এসে বলেন, ইরান থেকে যেকোনো সময় লেবাননে হামলা হতে পারে এ তথ্য আমরা জেনেছি। তাই হামলা এলাকা ছেড়ে প্রবাসীদের নিরাপদ স্থানে যাওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। লেবাননেও ব্যাপক হামলা ঘটনার পর চতুর্মুখী সঙ্কটের আছে বাংলাদেশীরা। এদিকে কাতারের বাংলাদেশ দূতাবাস দেশটিতে আটকে পড়া প্রবাসী বাংলাদেশী যাত্রী এবং তাদের পরিবারকে ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের সুবিধার্থে একটি বিশেষ ফাইটের ব্যবস্থা করার জন্য কাতার এয়ারওয়েজের সাথে যোগাযোগ রাখছে। এই ফাইটে মহিলা ও শিশুদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। দূতাবাসের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ এবং অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে গুগল ফরম পূরণ করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়।

গতকাল বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান নয়া দিগন্তকে মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীকর্মীদের চতুর্মুখী সঙ্কটের বিষয়ে বলেন, মিডলইস্ট ক্রাইসিস কারো হাতে নেই। ওই সব দেশে যেসব বিদেশী নাগরিক, ব্যবসায়ী ছিল তারাও দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। বিমান চলাচল সেফ না। তাই ইচ্ছা থাকলেও প্রবাসীদের দেশে ফেরানো সম্ভব নয়। তবে আমাদের পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছেন সঙ্কট থেকে উত্তরণে। আমি আশা করছি দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কট শেষ হবে। এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীদের চতুর্মুখী সঙ্কট নিয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় বিদেশের বাংলাদেশ মিশনগুলো যেন আরো বেশি তৎপরতা বৃদ্ধি করে সে জন্য তাদেরকে উৎসাহিত করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বিশেষ করে টেলিফোনে, ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে তাৎণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বিভিন্ন শ্রম কল্যাণ উইংয়ের কর্মকর্তাদের সাথে।

এ প্রসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ সচিব ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া গত বুধবার মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেছেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের কাছে অর্থের চেয়ে মানুষের জীবনের মূল্য অনেক বেশি, পরিস্থিতি যেখানে যাই ঘটুক না কেন, যত টাকা-পয়সাই লাগুক না কেন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে থাকা আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশীদের বিপদ হতে উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হবে। তাদেরকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে, প্রয়োজনে তাদের দেশে আনার ব্যবস্থা করা হবে। আর দুর্ভাগ্যবশত যদি কারো মৃত্যু হয়ে থাকে, তাহলে সেই লাশ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।