ঢাবিতে ফল প্রকাশে বিলম্ব সেশন জটের আশঙ্কা

Printed Edition

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

  • যথাসময়ে খাতা দেখেন না শিক্ষকরা
  • নিয়ম মানছে না বেশির ভাগ বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষার ফল প্রকাশ না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে স্নাতক চতুর্থ বর্ষের চূড়ান্ত ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেকে সরকারি চাকরির নিয়োগ, উচ্চশিক্ষা ও অন্যান্য ক্যারিয়ার সংশ্লিষ্ট সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সাথে বিভিন্ন বিভাগে সেমিস্টারের ফল প্রকাশে বিলম্ব হওয়ায় পরবর্তী সেমিস্টারের ক্লাস-পরীক্ষা পিছিয়ে যাচ্ছে এবং তৈরি হচ্ছে সেশনজটের আশঙ্কা।

তথ্য অধিকার আইনে প্রাপ্ত নথি ও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফল প্রকাশে বিলম্বের অন্যতম প্রধান কারণ শিক্ষকদের যথাসময়ে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে নম্বর জমা না দেয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা অনুযায়ী, বর্ষভিত্তিক পদ্ধতিতে তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হওয়ার আট সপ্তাহ এবং সেমিস্টার পদ্ধতিতে ছয় সপ্তাহের মধ্যে ফল প্রকাশের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি একাডেমিক বিধিতেও সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার ফল ৪২ দিনের মধ্যে প্রকাশের কথা উল্লেখ রয়েছে।

তবে বাস্তবে এ সময়সীমা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না। ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের ৭৫টি চূড়ান্ত পরীক্ষার মধ্যে মাত্র ছয়টির ফল নির্ধারিত সময়ে প্রকাশিত হয়। ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত ৬১টি পরীক্ষার একটিরও ফল নির্ধারিত সময়ে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।

শুধু চূড়ান্ত ফল নয়, সেমিস্টারভিত্তিক ফল প্রকাশেও দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের সাম্প্রতিক নোটিশ পর্যালোচনাতেও দেখা যায়, একাধিক সেমিস্টারের ফল আলাদা সময়ে প্রকাশ করা হচ্ছে। গত ১ ও ২ সেপ্টেম্বরও বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে বিভিন্ন বর্ষের সেমিস্টার ফাইনাল ফল প্রকাশের নোটিশ দেয়া হয়েছে।

খাতা মূল্যায়নে দীর্ঘসূত্রতা

পরীক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দফতরে ফল তৈরির প্রক্রিয়ার চেয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও নম্বর জমা দেয়ার পর্যায়েই বেশি সময় যাচ্ছে। নিয়মানুযায়ী পূর্ণ ইউনিটের পরীক্ষায় একজন পরীক্ষকের প্রতিদিন ছয়টি এবং অর্ধ ইউনিটের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ১০টি উত্তরপত্র মূল্যায়নের কথা। পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় নিলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই খাতা মূল্যায়ন শেষ করা সম্ভব।

কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা নির্ধারিত সময়ে খাতা মূল্যায়ন শেষ করে নম্বর জমা না দেয়ায় পরবর্তী ধাপগুলো আটকে থাকে। এর আগে পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ২০২৪ এক্সাম ইয়ারের অনার্স চতুর্থ বর্ষের ৪০৭ নম্বর কোর্স এর একটি উদাহরণ। ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকের ১২ ডিসেম্বরের মধ্যে নম্বর জমা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি প্রায় ছয় মাস পর চলতি বছরের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে নম্বর জমা দেন।

এর আগে ২০২৪ সালেও ঢাবির ফল প্রকাশে বিলম্ব নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে সেমিস্টার পদ্ধতিতে ছয় সপ্তাহ এবং কোর্সভিত্তিক পরীক্ষায় আট সপ্তাহের মধ্যে ফল প্রকাশের নিয়ম থাকলেও তা যথাযথভাবে অনুসরণ না করার বিষয়টি উঠে আসে।

মিডটার্মের নম্বরও সময়মতো মিলছে না

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শুধু ফাইনাল পরীক্ষার ফল নয়, অনেক বিভাগে মিডটার্ম বা ইনকোর্স পরীক্ষার নম্বরও যথাসময়ে জানানো হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা সেমিস্টারের মাঝামাঝি সময়ে নিজেদের একাডেমিক অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পান না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফাইনাল পরীক্ষার আগেও মিডটার্মের নম্বর দেয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

এতে এক দিকে শিক্ষার্থীরা নিজেদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ হারাচ্ছেন, অন্যদিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন প্রক্রিয়াতেও স্বচ্ছতার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এমন সমস্যা চলতে থাকায় এক সেমিস্টারের বিলম্ব পরবর্তী সেমিস্টারেও প্রভাব ফেলছে।

২০২৫ সালে ঢাবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগ নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। সেখানে একটি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা প্রায় ৯ মাস পর পঞ্চম সেমিস্টারের ফল পেয়েছিলেন। একই সময়ে ষষ্ঠ সেমিস্টারের ক্লাস চললেও ইনকোর্স পরীক্ষা শেষ হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা অন্যান্য বিভাগের তুলনায় কয়েক মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। আবার ষষ্ঠ সেমিস্টারের এক্সামও চলতি বছরের ডিসেম্বর ও আগামী বছরের জানুয়ারিতে হওয়ার কথা রয়েছে।

চাকরি ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ হারাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা

ফল প্রকাশে বিলম্বের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থীদের ওপর। ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী আরমান (ছদ্মনাম) বলেন, স্নাতক চতুর্থ বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষার ফল প্রকাশে দেরি হওয়ায় তিনি ৫০তম বিসিএসসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি চাকরিতে আবেদন করতে পারেননি।

তিনি বলেন, ‘অনেক শিক্ষক বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে এতটাই ব্যস্ত যে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। আবার রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় অনেকেই নিজেদের জবাবদিহির ঊর্ধ্বে মনে করেন।’

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট একাডেমিক ক্যালেন্ডার ও ফল প্রকাশের সময়সীমা থাকলেও বাস্তবে তার কার্যকর তদারকি নেই। ফলে একজন শিক্ষক খাতা বা নম্বর জমা দিতে দেরি করলে পুরো ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ফল আটকে যাচ্ছে।

যা বলছে প্রশাসন

ঢাবির ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. হিমাদ্রি শেখর চক্রবর্ত্তী বলেন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসের কোনো প্রক্রিয়ায় ফল প্রকাশে দেরি হয় না। মূলত উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে দেরিতে জমা দেয়া এবং নম্বর সময়মতো না দেয়াই ফল প্রকাশে বিলম্বের কারণ।

প্রোভিসি (শিক্ষা) ড. আবদুস সালাম বলেন, চতুর্থ বর্ষের ফল চূড়ান্ত করতে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের ফল প্রয়োজন হয়। কোনো শিক্ষার্থীর মাইনর কোর্সের ফল বাকি থাকলেও অপেক্ষা করতে হয়। এ ছাড়া পরীক্ষক ছুটিতে থাকা, অন্য কাজে ব্যস্ত থাকা কিংবা খাতা মূল্যায়নে অপারগতা প্রকাশ করার কারণেও প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘পুরো প্রক্রিয়া তুলনামূলক জটিল হওয়ায় অনেক সময় চতুর্থ বর্ষের ফল প্রকাশে কিছুটা দেরি হয়। তবে আমরা এখন রেজাল্ট সময়মতো প্রকাশ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’ সতবে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, নিয়ম ও সময়সীমা নির্ধারিত থাকার পরও যদি বছরের পর বছর একই সমস্যা চলতে থাকে, তাহলে দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহির ব্যবস্থা কোথায়? তাদের দাবি, উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও নম্বর জমার জন্য নির্ধারিত সময় কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, মিডটার্মের নম্বর দ্রুত প্রকাশ এবং ফল প্রকাশের পুরো প্রক্রিয়ায় কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা হলে এই দীর্ঘসূত্রতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।