১৬ দিনে চাঁদাবাজির ৬২৭ অভিযোগ দাবি ১৮ কোটি ৬৫ লাখ টাক

আমিনুল ইসলাম
Printed Edition

  • ঢাকায় অভিযোগ ও চাঁদার অঙ্ক সর্বোচ্চ
  • কম অভিযোগেই বড় অঙ্ক খুলনায়

মাত্র ১৬ দিনে সারাদেশ ৬২৭টি চাঁদাবাজির অভিযোগ পেয়েছে অনলাইনে বেনামে অভিযোগ গ্রহণকারী প্ল্যাটফর্ম ঈযধহফধইউ.পড়স। এসব অভিযোগে দাবিকৃত অর্থের সম্মিলিত পরিমাণ ১৮ কোটি ৬৫ লাখ ৭৩ হাজার ৬২ টাকা। গড় হিসাব করলে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ১৬ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ জমা পড়েছে।

গত ২৫ আগস্ট থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঈযধহফধইউ.পড়স-এ প্রকাশিত অভিযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। এতে অভিযোগের সংখ্যায় ঢাকা বিভাগ সবচেয়ে এগিয়ে। দাবিকৃত অর্থের পরিমাণেও শীর্ষে রয়েছে রাজধানীকেন্দ্রিক এই বিভাগ। তবে তুলনামূলক কম অভিযোগের মধ্যেও বড় অঙ্কের চাঁদা দাবির দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে খুলনা বিভাগের নাম। মাত্র ৪২টি অভিযোগে সেখানে দাবি করা হয়েছে দুই কোটি আট লাখ ৩১ হাজার ৭০ টাকা।

সূত্রের দাবি, দেশের বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে, সরাসরি গোপনে, অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে, জিম্মি করাসহ বিভিন্নভাবে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা ভয়ে থানায় অভিযোগ দিতে পারছেন না। আবার অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ দিলেও তা গ্রহণ করা হচ্ছে না। কোনো কোনো থানা অভিযোগ গ্রহণ করলেও তাতেও কোনো লাভ হচ্ছে। এসব ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়াতে বেসরকারিভাবে তৈরি করা হয়েছে অনলাইনে বেনামে অভিযোগ গ্রহণকারী প্ল্যাটফর্ম ঈযধহফধইউ.পড়স । যেখানে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ভুক্তভোগীরা তাদের অভিযোগ দিতে পারবেন। গত ১৬ দিনে এই প্লাটফর্মে ৬২৭টি অভিযোগ জমা পড়েছে।

ঈযধহফধইউ.পড়স কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, সাইটে প্রকাশিত প্রতিটি অভিযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠানো হয়। এ পর্যন্ত প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে মোট ৮৭৭টি ই-মেইল পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে সাইট কর্তৃপক্ষ। তবে ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অভিযোগকে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সাইট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দর্শনার্থীদের প্রতিক্রিয়া কোনো অভিযোগের আইনি বা চূড়ান্ত সত্যতা প্রমাণ করে না। ফলে প্রকাশিত অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ণ।

প্লাটফর্মের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৬২৭টি অভিযোগের মধ্যে ঢাকা বিভাগে রয়েছে ২৬৯টি। এসব অভিযোগে দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ ১২ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার ৯৬০ টাকা, যা মোট দাবিকৃত অর্থের প্রায় ৬৫ দশমিক ৯ শতাংশ; অর্থাৎ সারা দেশে দাবিকৃত মোট চাঁদার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের অভিযোগই এসেছে ঢাকা বিভাগ থেকে। অন্য দিকে খুলনা বিভাগে অভিযোগের সংখ্যা মাত্র ৪২টি হলেও দাবিকৃত অর্থ দুই কোটি আট লাখ ৩১ হাজার ৭০ টাকা। অভিযোগপ্রতি গড় দাবির অঙ্কের দিক থেকে এ বিভাগটি সবচেয়ে এগিয়ে। চট্টগ্রাম বিভাগে ১৩৭টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংখ্যার হিসাবে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এসব অভিযোগে দাবিকৃত অর্থ এক কোটি ৫৭ লাখ ৭৬ হাজার ৩৩ টাকা।

রাজশাহী বিভাগে ৫৬টি অভিযোগে দাবি করা হয়েছে এক কোটি সাত লাখ ৭৩ হাজার ২৮০ টাকা। রংপুরে ৪৩টি অভিযোগে দাবিকৃত অর্থ ৯৭ লাখ ৫৩ হাজার ৮৮০ টাকা। সিলেটে ২২টি অভিযোগে ৩৫ লাখ ৭১ হাজার ৫৬৪ টাকা, বরিশালে ৩৩টি অভিযোগে ১৫ লাখ ৭১ হাজার ৫৩৫ টাকা এবং ময়মনসিংহে ২৫টি অভিযোগে ১৪ লাখ ১৪ হাজার ৭৪০ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ এসেছে।

শুধু অভিযোগের সংখ্যা নয়, চাঁদাবাজির ধরন বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সরাসরি ‘হুমকি বা ভয় দেখানো’র মাধ্যমে চাঁদা দাবির অভিযোগের সংখ্যা তুলনামূলক কম- ৫৯টি। কিন্তু এসব ঘটনায় দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ ৪ কোটি ৬১ লাখ ৬৬ হাজার ৭০০ টাকা; অর্থাৎ সংখ্যায় কম হলেও এ ধরনের প্রতিটি অভিযোগে গড়ে দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। অন্য দিকে ‘চাঁদা দাবি’ শিরোনামে অভিযোগ এসেছে ২০৫টি। এসব ঘটনায় মোট দাবিকৃত অর্থ সাত কোটি ২৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮০৩ টাকা, যা মোট দাবিকৃত অর্থের প্রায় ৩৯ শতাংশ। সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ‘জোরপূর্বক অর্থ আদায়’-সংক্রান্ত। এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে ২৩৭টি; অর্থাৎ চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে শুধু হুমকি দিয়ে অর্থ দাবি নয়, জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের অভিযোগও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় রয়েছে।

সাইট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি প্রান্তে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগগুলো তদন্ত ও ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি আরো গুরুত্ব পাবে। মাত্র ১৬ দিনের তথ্যেই যখন সারা দেশে ১৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকার বেশি চাঁদা দাবির অভিযোগ সামনে এসেছে, তখন এর বাইরে থাকা অনিবন্ধিত বা প্রকাশ্যে না আসা অভিযোগের প্রকৃত চিত্র কতটা বিস্তৃত; তা নিরূপণে মাঠপর্যায়ে তদন্ত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ আরো জরুরি হয়ে উঠেছে।

এ ব্যাপারে পুলিশ সদর দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, পুলিশের পক্ষ থেকে ঈযধহফধইউ.পড়স প্লাটফর্মে জমা পড়া অভিযোগ গুলোর বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। একই সাথে এই প্লার্টফর্ম বিষয়েও স্টাডি করা হচ্ছে; যে কারণে এখনই কোনো মন্তব্য করা যাচ্ছে না।