মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
নদীটা আজ ফুঁসছে। এই নদীর নাম কালস্রোতা। গ্রামের প্রবীণরা বলেন, এই নদীর জল সাধারণ জল নয়; এ হলো ওপারের পাহাড় থেকে নেমে আসা এক আগ্রাসী ক্ষুধা। যখনই ওপারে বৃষ্টি হয়, তার সব তোড় এসে আছড়ে পড়ে এই বদ্বীপের নরম মাটিতে। গ্রামটির নাম ‘পললপুর’। নরম মাটির দেশ, কিন্তু এর মানুষের মেরুদণ্ড বড় শক্ত ছিল এককালে। তবে ইদানীং সেই মেরুদণ্ডেও যেন ঘুণ ধরেছে।
গ্রামের ঠিক শেষ প্রান্তে, যেখানে কালস্রোতা নদীটি সবচেয়ে হিংস্রভাবে বাঁক নিয়েছে, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি জরাজীর্ণ, প্রাচীন বাঁধ। আর সেই বাঁধের ওপর গত দুই দশক ধরে পাহারায় আছেন একজন মানুষ। গ্রামের লোকেরা তাকে ডাকে ‘দ্রুব’ বলে। ধ্রুব তারার মতোই অটল তিনি। ধ্রুব জানে, এই বাঁধ কেবল মাটি আর ইটের গাঁথুনি নয়; এটি পললপুরের অস্তিত্বের প্রাচীর।
ধ্রুবর বয়স হয়েছে, চুলে পাক ধরেছে, কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি যেন খাপখোলা তলোয়ার। তিনি জানতেন, কালস্রোতা নদী কেবল জল নিয়ে আসে না, সে নিয়ে আসে পলি-চাপা বিস্মৃতি। সে চায় পললপুরের নিজস্ব সংস্কৃতি, নিজস্ব কৃষি আর নিজস্ব পরিচয়কে ডুবিয়ে দিয়ে ওপারের পাহাড়ি আবর্জনা চাপিয়ে দিতে। একেই ধ্রুব বলতেন- ‘নিগড়’।
ধ্রুব প্রায়ই গ্রামের যুবকদের নিয়ে বাঁধের ওপর বসতেন। তিনি বলতেন, ‘শোন, জলকে ভয় পেও না। ভয় পাও সেই স্রোতকে, যা তোমার নিজের ঘরের মাটি ধুয়ে নিয়ে যায়, অথচ তুমি ভাবো সেটা তোমার তৃষ্ণা মেটাচ্ছে। ওরা চায় আমরা ভিখারি হয়ে থাকি, ওদের দয়ার জলের দিকে তাকিয়ে থাকি। কিন্তু মনে রাখিস, যে জাতি নিজের বাঁধ নিজে মেরামত করতে জানে না, সে জাতি মানচিত্র থেকে মুছে যায়।’
সমস্যা কেবল বাইরের কালস্রোতা নদী ছিল না। পললপুরের ভেতরেও একদল মানুষ ছিল, যারা গোপনে ওই নদীর সাথে মিতালি করেছিল। ধ্রুব তাদের ডাকতেন ‘উইপোকা’। গ্রামের মোড়ল শ্রেণীর কিছু লোক, যারা ওপার থেকে আসা সস্তা রঙিন কাঁচের পুতুল আর নেশাজাতীয় দ্রব্যের বিনিময়ে বাঁধের মাটি আলগা করে দিত।
একদিন গ্রামের সর্দার এসে ধ্রুবকে বলল, ‘ওহে ধ্রুব, তুমি কেন মিছেমিছি এই ভাঙা বাঁধ আগলে পড়ে আছ? ওপার থেকে ওরা বলেছে, যদি আমরা বাঁধটা একটু নিচু করে দিই, ওরা আমাদের জন্য পাকা ঘাট বানিয়ে দেবে। আমাদের আর কষ্ট করতে হবে না।’
ধ্রুব হেসেছিলেন। সে হাসি ছিল বড় করুণ, কিন্তু ইস্পাতের মতো কঠিন। তিনি বলেছিলেন, ‘সর্দার, ওরা ঘাট বানিয়ে দেবে, যাতে ওদের বড় নৌকাগুলো সহজে আমাদের গ্রামে ঢুকে আমাদের শস্যভাণ্ডার লুট করতে পারে। ওরা বাঁধ নিচু করতে চায় জল দেওয়ার জন্য নয়, আমাদের প্লাবিত করে নতজানু রাখার জন্য। তোমরা হয়তো পাকা ঘাট পাবে, কিন্তু গ্রামের মানুষ হারাবে তাদের পায়ের নিচের মাটি। আমি বেঁচে থাকতে এই বাঁধের এক মুঠো মাটিও সরতে দেবো না।’
সর্দার রাগে গদগদ হয়ে চলে গিয়েছিল। কিন্তু ধ্রুব জানতেন, এই অভ্যন্তরীণ শত্রুরা বাইরের জলের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। এরা মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে যুবকদের মেরুদণ্ড বাঁকা করে দিচ্ছে। ধ্রুব তাই দিনে বাঁধ মেরামত করতেন, আর রাতে মশাল জ্বালিয়ে যুবকদের শোনাতেন আত্মমর্যাদার গল্প। তিনি বলতেন, ‘অন্যের আধিপত্য মেনে নিয়ে রাজপ্রাসাদে থাকার চেয়ে, নিজের সার্বভৌম কুঁড়েঘরে মাথা উঁচু করে থাকা অনেক শ্রেয়।’
আকাশের কোনে কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। বাতাস ভারী হয়ে আসছে। ধ্রুব বুঝতে পারলেন, কালস্রোতা এবার তার চূড়ান্ত আঘাত হানবে। ওপারে বাঁধ খুলে দেওয়া হয়েছে, যাতে পললপুর তলিয়ে যায়। এটা কেবল প্রাকৃতিক বন্যা নয়, এ এক পরিকল্পিত আগ্রাসন।
ধ্রুব গ্রামের ঘরে ঘরে গেলেন। কিন্তু অনেকেই তখন ওপার থেকে আসা রঙিন মদের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। সর্দাররা বলে বেড়াচ্ছে, ‘ধ্রুব পাগল হয়ে গেছে। ও আমাদের বন্ধুত্বের জোয়ারকে বন্যা বলছে।’ কিন্তু সবাই ঘুমিয়ে ছিল না। একদল তরুণ, যাদের চোখে ধ্রুব বুনে দিয়েছিলেন স্বপ্নের বীজ, তারা এগিয়ে এল। তাদের নেতা ছিল ছোট্ট এক যুবক, নাম ‘অরুণ’। অরুণ জিজ্ঞেস করল, ‘গুরু, এতবড় জলের তোড় কি আমরা এই কজন মিলে ঠেকাতে পারব?’
ধ্রুব অরুণের কাঁধে হাত রাখলেন। বললেন, “বাঁধ ইট-পাথরে টিকে থাকে না রে অরুণ, বাঁধ টিকে থাকে মানুষের ইচ্ছাশক্তিতে। আমি যদি আজ ভেসেও যাই, মনে রাখিস-আমার শরীরটা হয়তো থাকবে না, কিন্তু আমার এই ‘না’ বলার সাহসটা তোদের মধ্যে রেখে গেলাম। এই যে ‘সীসা ঢালা প্রাচীর’ দেখছিস, এটা আমি নই, এটা তোদেরই আগামীকালের প্রতিচ্ছবি।”
অমাবস্যার রাত। কালস্রোতা নদীর গর্জন যেন হাজারটা ক্ষুধার্ত সিংহের হুঙ্কার। জল বাড়ছে হু হু করে। বাঁধের দুর্বল অংশগুলোতে ফাটল ধরছে। ধ্রুব তার ছোট দলটিকে নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লেন। কাঁধে মাটির বস্তা, হাতে কোদাল। ঝড়ো হাওয়ায় তার গায়ের চাদর উড়ে গেছে, কিন্তু তিনি দাঁড়িয়ে আছেন এক বিশাল মহীরুহের মতো।
হঠাৎ বাঁধের মাঝখানের একটা বড় অংশ ধসে পড়ার উপক্রম হলো। সর্দারদের অনুচরেরা আগেই সেখান থেকে মাটি সরিয়ে রেখেছিল। জল ঢুকতে শুরু করেছে। এই জল ঢুকলে পললপুরের ইতিহাস মুছে যাবে।
ধ্রুব মুহূর্তের জন্য থমকালেন না। তিনি অরুণদের চিৎকার করে বললেন, ‘তোরা পিছনের মাটি দে! আমি সামনে দাঁড়াচ্ছি!’
ধ্রুব ঝাঁপিয়ে পড়লেন সেই ভাঙা অংশে। বড় একটি পাথরের চাঁই আর নিজের শরীর দিয়ে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করলেন জলের তোড় আটকাতে। জলের আঘাত তার বুকে এসে লাগছে কামানের গোলার মতো। হাড় ভাঙার শব্দ শোনা গেল, কিন্তু ধ্রুব নড়লেন না। তিনি যেন মাটির সাথে মিশে গিয়ে নিজেই একটা প্রাচীর হয়ে গেলেন।
তিনি বিড়বিড় করে বলছিলেন, ‘তোমরা আমাদের শরীর ভাঙতে পারো, কিন্তু আমাদের চেতনাকে ভাসিয়ে নিতে পারবে না। এই মাটি আমার মায়ের, এই জল আমার রক্ত। এখানে কোনো আগ্রাসনের স্থান নেই।’
সারা রাত ধরে যুদ্ধ চলল। এক অসম যুদ্ধ। একদিকে প্রকৃতির রুদ্ররোষ আর আধিপত্যবাদের নীল নকশা, অন্যদিকে একজন মানুষ ও তার মুষ্টিমেয় কিছু শিষ্য।
সকাল হলো। ঝড় থেমেছে। কালস্রোতা নদীর জল নেমে গেছে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ক্ষতের দাগ স্পষ্ট। গ্রামের মানুষ ভীতপায়ে বাঁধের দিকে এগিয়ে এলো।
তারা দেখল, বাঁধটি ভাঙেনি। পললপুর রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু বাঁধের সেই ফাটল ধরা অংশে, যেখানে জলের তোড় সবচেয়ে বেশি ছিল, সেখানে পাথরের সাথে লেপ্টে আছে ধ্রুবর নিথর দেহ। তার হাত দুটো তখনো প্রসারিত, যেন তিনি বাতাসকে আলিঙ্গন করে আছেন। তার মুখটা শান্ত, কিন্তু চোয়ালটা শক্ত হয়ে আছে-যেন মৃত্যুর পরেও তিনি বলছেন, ‘না, আমি পথ ছাড়ব না।’
গ্রামের সর্দাররা নতমস্তকে দাঁড়িয়ে রইল। যে মানুষটাকে তারা পাগল বলত, সেই মানুষটাই আজ নিজের জীবন দিয়ে তাদের ঘর বাঁচিয়ে দিলো। কিন্তু ধ্রুবর মৃত্যু কি আসলেই মৃত্যু?
অরুণ এগিয়ে এলো। তার চোখে জল নেই, আছে আগুন। সে ধ্রুবর হাত থেকে শক্ত করে ধরে থাকা একটি পতাকা তুলে নিলো। পতাকাটি ছিঁড়ে গেছে, কাদায় মাখামাখি, কিন্তু উড়ছে পতপত করে।
অরুণ গ্রামের সমবেত জনতার দিকে ফিরে তাকাল। তার কণ্ঠে আর সেই কিশোরের চপলতা নেই, সেখানে ভর করেছে ধ্রুবর গাম্ভীর্য। সে বলল, ‘তোমরা ভাবছ ধ্রুব ভাই নেই? ভুল ভাবছ। এই বাঁধের প্রতিটি মাটির কণায় তিনি মিশে গেছেন। তিনি বলেছিলেন, তিনি চলে গেলে যেন আমরা কান্না না করি। তিনি বলেছিলেন, তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটা আদর্শ। আর আদর্শ কখনো মরে না।’
ধ্রুবর মৃত্যুর পর এক অদ্ভুত পরিবর্তন এলো পললপুরে। যে যুবকরা আগে নেশায় বুঁদ হয়ে থাকত, তারা এখন বাঁধ মেরামতের কাজ করে। তারা বুঝতে শিখেছে, ওপার থেকে আসা মিষ্টি হাওয়া আসলে বিষাক্ত গ্যাস। তারা এখন আর সর্দারদের মিথ্যা আশ্বাসে ভোলে না।
গ্রামের পাঠশালায় এখন নতুন করে ইতিহাস পড়ানো হয়। সেখানে বলা হয় না কোনো রাজার গুণগান। সেখানে বলা হয় এক ‘পাথর-মানুষের’ গল্প, যিনি শিখিয়েছিলেন-কীভাবে আধিপত্যবাদের চোখের দিকে তাকিয়ে ‘না’ বলতে হয়।
ধ্রুবর সেই ছোট কুঁড়েঘরটি এখন একটি বাতিঘর হয়েছে। সেখানে প্রতি সন্ধ্যায় আলো জ্বলে। সেই আলো কালস্রোতা নদীর ওপার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ওপারের পাহাড় থেকে যারা আগ্রাসনের ছক কষে, তারা এই আলো দেখে ভয় পায়। তারা বুঝতে পারে, পললপুর আর সেই নরম মাটির গ্রাম নেই। সেখানে এখন হাজার হাজার ‘ধ্রুব’ তৈরি হয়েছে।
গল্পের শেষে দেখা যায়, বাঁধের ওপর একটি বিশাল বটগাছ গজিয়ে উঠেছে। গ্রামের লোকেরা বলে, ধ্রুব যেখানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন, ঠিক সেখান থেকেই এই গাছের জন্ম। এই গাছের শিকড় মাটির অনেক গভীরে চলে গেছে, যা বাঁধকে আরও শক্ত করে ধরে রেখেছে।
বটগাছটির নিচে বসে অরুণ এখন নতুন প্রজন্মের শিশুদের গল্প শোনায়।
সে বলে, জানো দাদুভাইরা, এক ছিল জাদুকর। তিনি মন্ত্র জানতেন না, কিন্তু তার বুকে ছিল সাহসের পাহাড়। তিনি বলতেন, ‘তোমরা যখন অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে, তখন তোমরা একা নও। তোমাদের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস।’ সেই জাদুকর আমাদের শিখিয়ে গেছেন, শরীরের মৃত্যু হয়, কিন্তু যে সৈনিক ন্যায়ের জন্য, নিজের মাটির স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে, সে মিশে থাকে বাতধংব, জলে, আর আমাদের নিঃশ্বাসে।
শিশুরা অবাক হয়ে তাকায়। বাতাস বয়, বটগাছের পাতাগুলো ঝিরঝির করে শব্দ করে। মনে হয়, সেই পাতার শব্দে ধ্রুবর কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে-
‘মাথা নোয়াবার নয়, এ বাঁধ ভাঙবার নয়। আমি আছি, আমি থাকব-প্রতিটি প্রতিবাদে, প্রতিটি প্রতিরোধে, প্রতিটি স্বাধীনচেতা মানুষের স্পন্দনে।’
সূর্য অস্ত যায়, কিন্তু বাঁধের ওপরের সেই বাতিঘরের আলো নেভে না। কালস্রোতা নদী বয়ে চলে, কিন্তু সে জানে, এই প্রাচীর এখন আর কেবল মাটির নয়; এটি এখন এক অবিনাশী চেতনার নাম। সিসা ঢালা সেই প্রাচীর আজ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত হয়ে আছে, যা কোনো প্লাবনেই আর টলবে না।



