হেয়ারকাটকে শরিয়াপরিপন্থী বললেন বিশেষজ্ঞরা

ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারী বেকায়দায় ব্যাংকাররা

ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের অসাবধানতা, দুর্নীতি বা লুটের কারণে ক্ষতি হলে তার দায় গ্রাহক বা আমানতকারীরা বহন করবে না। বরং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষকেই দায়ভার নিতে হবে এবং ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই বিধান স্পষ্টভাবে শরিয়া আইনে রয়েছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

ইসলামী ব্যাংক শরিয়া বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে আমানতকারীদের দুই বছরের মুনাফা কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে শরিয়া বোর্ডের মতামত নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং শরিয়াপরিপন্থী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের অসাবধানতা, দুর্নীতি বা লুটের কারণে ক্ষতি হলে তার দায় গ্রাহক বা আমানতকারীরা বহন করবে না। বরং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষকেই দায়ভার নিতে হবে এবং ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই বিধান স্পষ্টভাবে শরিয়া আইনে রয়েছে।

দুই বছরের মুনাফা কাটার সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকাররাও বেকায়দায় পড়েছেন। প্রতিদিনই ব্যাংকে ভিড় করছেন অসন্তুষ্ট গ্রাহকরা, যারা ব্যাংকারদের কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইছেন। সাধারণ গ্রাহকরা বলছেন, ‘টাকা লুট করেছে এস আলম। আর এ লুটের সাথে সহযোগিতা করেছেন কিছু সুবিধাভোগী ব্যাংক কর্মকর্তা। তাই ব্যাংকগুলো আজ রুগ্ণ অবস্থায়। লুটের দায় কেন আমাদের নিতে হবে?’ ব্যাংকাররা গ্রাহকদের এই কঠিন প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারছেন না। তারা সমস্যার বিষয়টি প্রধান কার্যালয়কে অবহিত করছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সব আমানত হিসাব পুনর্গণনা করা হবে ২৮ ডিসেম্বর, বিদ্যমান স্থিতির ভিত্তিতে। ভয়াবহ দিক হলো, ১ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত প্রায় দুই বছরের সময়কালে আমানতের ওপর কোনো মুনাফা গণনা করা হবে না। উপরন্তু, আমানতের ওপর হেয়ারকাট প্রযোজ্য হবে এবং সেই অনুযায়ী চূড়ান্ত স্থিতি নির্ধারণ করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক রেজ্যুলেশন বিভাগ এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে চিঠি দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের শরিয়া বোর্ডের সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের ওপর যে নিরীক্ষা করা হয়েছে, সেই প্রতিবেদনগুলো বোর্ডের কাছে চাওয়া হয়েছে। বোর্ড বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। তবে এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত বা ফতোয়া দেয়া হয়নি। সূত্রটি আরো জানিয়েছে, তারা জানেন না কিসের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শরিয়া আইনে যিনি ব্যাংকে আমানত রাখেন তাকে ‘সাহেব আল-মাল’ বলা হয়। ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানকে বলা হয় ‘মুদারিব’। সূত্রটি জানায়, মুদারিব বা প্রতিষ্ঠানের অসতর্কতা বা দুর্নীতির কারণে লোকসান হলে তার দায় আমানতকারীদের নয়। এ দায় মুদারিব বা প্রতিষ্ঠানকেই বহন করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. জুবায়ের মুহম্মদ এহসানুল হক বলেন, ‘ব্যাংকের অবহেলার কারণে লোকসান হলে গ্রাহক দায়ী হবেন না। ইসলামী ব্যাংকগুলো থেকে এস আলম ঋণের নামে টাকা পাচার করেছে, যেখানে গ্রাহক বা আমানতকারীরা কোনো বোর্ডে ছিলেন না। তারা কেন এর দায় বহন করবে?’

ড. জুবায়ের আরো বলেন, শরিয়তে ক্ষতিপূরণের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে। ব্যাংক যদি ন্যায্যতার ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দেয়, সেটি শরিয়ায় ‘এহসান’ হিসেবে গণ্য হয়। তবে এখানে স্পষ্টভাবে টাকা লুট করা হয়েছে, যা গ্রাহকের দায়ের মধ্যে পড়ে না। তাই গ্রাহকদের এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত করা শরিয়াপরিপন্থী হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের সিদ্ধান্তে ব্যাংক খাতের নৈতিক ও সামাজিক বিশ্বাসহীনতা বৃদ্ধি পাবে। গ্রাহকরা ব্যাংকের ওপর আস্থা হারাবেন এবং ইসলামী ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ধাক্কা খাবে। শরিয়া বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া মুনাফা কাটার সিদ্ধান্ত গ্রাহকরা অগ্রহণযোগ্য মনে করছেন।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘আমরা গ্রাহকদের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারছি না। প্রতিদিনই ব্যাংকে ভিড় করছে অসন্তুষ্ট গ্রাহকরা। এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে প্রধান কার্যালয়ের সাথে সমন্বয় করছি।’

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গ্রাহকের ক্ষতি ব্যাংকের দায় এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা অপরিহার্য। এর ফলে গ্রাহক ও বাজারের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট শরিয়া বিশেষজ্ঞ ড. সাইফুল্লাহ মাদানী গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের দুই বছরের মুনাফা কাটার সিদ্ধান্ত শরিয়াপরিপন্থী। কারণ, শরিয়া আইন অনুযায়ী মুদারিব বা প্রতিষ্ঠানের অসতর্কতা, অবহেলা বা দুর্নীতির মাধ্যমে লোকসান হলে তার দায় সাহেব আল মাল বা আমানতকারী বহন করবেন না। এর দায় সম্পূর্ণভাবে বহন করবেন মুদারিব বা প্রতিষ্ঠান। এর বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হলে তা হবে শরিয়তবিরোধী।

এদিকে পাঁচ ব্যাংকের একীভূত হওয়া সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের উদ্বেগের কথা বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানো হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রশাসক বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তাদের মনোনীত করার পর তারা ব্যাংকে যোগদান করেছেন। বেশ ভালোভাবেই আমরা ব্যাংকগুলোকে গুছিয়ে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ হেয়ারকাটের সিদ্ধান্তে আবার আমানতকারীদের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

শরিয়া বোর্ডের অনুমোদন ব্যতীত গ্রাহকের মুনাফা কর্তনের সিদ্ধান্ত শুধু শরিয়া আইনের পরিপন্থী নয়, তা ব্যাংকিং খাতের নৈতিক মানদণ্ড ও গ্রাহক আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দ্রুত সমাধানের পথ বের করতে না পারলে, গ্রাহক আন্দোলন ও ব্যাপক অসন্তোষের ঝুঁকি রয়েছে।