নয়া দিগন্ত ডেস্ক
দেশের বিভিন্ন জেলায় আকস্মিক শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে ঠাকুরগাঁও, সুন্দরগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও হোসেনপুরে বোরো ধান ও ভুট্টাসহ মৌসুমি ফল আম, লিচুর মুকুলে বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন দুর্যোগে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে কৃষি বিভাগ। তারা ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব করছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় প্রণোদনার আশ্বাস দিয়েছেন।
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে ঠাকুরগাঁও সদরসহ হরিপুর, বালিয়াডাঙ্গী, রানীশংকৈল ও পীরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দমকা হাওয়া ও শিলাবৃষ্টি হয়। সন্ধ্যার আগ থেকেই বাতাসের গতি বাড়তে থাকে, পরে ঝড়ের সাথে শুরু হয় বড় আকারের শিলাবৃষ্টি। স্থানীয়দের ভাষ্য, এবারের শিলাগুলো আকারে বড় হওয়ায় ক্ষতির পরিমাণও বেশি হয়েছে।
জেলা কৃষি অফিস জানায়, এতে প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমির গম, এক হাজার ৭১৭ হেক্টর জমির ভুট্টা, ২৫৭ হেক্টর আলু এবং ৬৬ হেক্টর জমির পেঁয়াজ বীজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি আম ও লিচুর মুকুল ঝরে পড়ায় ফলন নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সদর উপজেলার কালিতলা এলাকার কৃষক পরিতোষ বলেন, তিন বিঘা জমির ভুট্টা প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতি বিঘায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে, যার বড় অংশ ঋণ। তিনি বলেন ‘এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে’। একই এলাকার কৃষক গোপেন চন্দ্র জানান, তার চার বিঘা ভুট্টা জমি মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। গমের ক্ষেত ও আমের বাগানেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রস্তুতের কাজ চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত প্রণোদনার আওতায় এনে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হবে।
কিশোরগঞ্জের প্রতিনিধি জানান, একই দিন বিকেল ও রাতে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ে বোরো ধান ও ভুট্টার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মিঠামইন, ইটনা, অষ্টগ্রাম, নিকলী, পাকুন্দিয়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় এই দুর্যোগ আঘাত হানে। অনেক স্থানে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটের শিলাবৃষ্টিতেই ফসলের বড় ক্ষতি হয়।
কৃষকদের ভাষ্য, বোরো ধানের শীষ বের হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন দুর্যোগে অনেক জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। মিঠামইন উপজেলার ঢাকী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান জানান, তিনি ৩০ একর জমিতে বোরো চাষ করেছেন। এর মধ্যে ক্ষতি হয়েছে ২০ একরেরও বেশি জমির ধান। তার ইউনিয়নে কৃষকের শতকরা ২৫/৩০ ভাগ জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি। ইটনার এক কৃষক বলেন, কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ে আবাদ করা ভুট্টা ও ধান এখন প্রায় নষ্ট, উৎপাদন খরচই উঠবে কিনা আশঙ্কা হচ্ছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, প্রাথমিক হিসাবে প্রায় তিন হাজার ৮৬৪ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি হতে পারে বলে ধারণা করেন তিনি।
হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে গত মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় বোরো ধান, ভুট্টা ও মৌসুমী ফলগাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উপজেলার জিনারী, সিদলা, গোবিন্দপুর, পুমদী ও সাহেদল ইউনিয়নে শিলাবৃষ্টি বেশি হয়েছে। এতে বোরো ধান, সবজি, আম ও লিচুর মুকুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিলার আকার এতোটাই বড় ছিল যে, কোথাও কোথাও বসতঘরের টিনের চালও ফুটো হয়ে গেছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শিলাবৃষ্টির কারণে ফসলি জমিতে পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে বোরো ধানের জমিতে ঝড়ো হাওয়ার প্রভাব বেশি পড়েছে সবচেয়ে বেশি। চরাঞ্চলের অনেক জমিতে ধানের গাছে এখনো থোড় আসেনি, গাছ নরম থাকায় শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন চাষিরা।
জিনারী এলাকার কৃষক সামসুল ও চর হাজীপুরের রুকন উদ্দিন জানান, তারা দুই একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছেন। পরিবারের প্রধান আয়ের উৎসই এটি। হলিমা গ্রামের আবদুল কাইয়ুম বলেন, প্রথম দিকের বৃষ্টি ফসলের জন্য ভালোই ছিল। কিন্তু পরে শিলাবৃষ্টিতে ভুট্টাসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষতি হয়ে গেছে। জমিতে পানি জমে থাকায় ধানের গোড়া পচে যাওয়ার ভয় হচ্ছে। এছাড়া শিলাবৃষ্টির পানি ঠাণ্ডা হওয়ায় তা জমিতে বেশিক্ষণ থাকলে গাছ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: মোহসীন বলেন, শিলাবৃষ্টিতে কিছু বোরো ধান ও আমের গুটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার তেমন আশঙ্কা নেই। ক্ষতির সঠিক চিত্র পেতে সময় লাগবে।
সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় মঙ্গলবার বিকেলের শিলাবৃষ্টিতে ভুট্টা, মরিচ, বেগুনসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একই সাথে আম ও লিচুগাছের মুকুল ঝরে পড়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অনেক জায়গায় ভুট্টা, ধান ও সবজির গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। কৃষকরা ক্ষেতে জমে থাকা পানি সরানোর পাশাপাশি পড়ে যাওয়া গাছগুলো উঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন।
সোনারায় ইউনিয়নের ভুট্টাচাষি শাহজাহান মিয়া বলেন, হঠাৎ দেখি বৃষ্টির সাথে শিল পড়তে শুরু করছে। বৃষ্টি থামার পর মাঠে গিয়ে দেখি, জমির অধিকাংশ ভুট্টাগাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে।
উপজেলা কৃষি বিভাগ জানায়, চলতি মৌসুমে সুন্দরগঞ্জে চার হাজার ৩৯৫ হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। এছাড়া ১২২ হেক্টর জমিতে মরিচ এবং ৬৫ হেক্টর জমিতে বেগুনের আবাদ হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাশিদুল কবির বলেন, শিলাবৃষ্টি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তবে কৃষকদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ফসল রক্ষার উপায় শেখানো হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ক্ষতি কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।



