৪ নদীর পানি বিপদসীমার উপরে ৫ জেলায় আগাম বন্যার শঙ্কা

বন্দরে ৩ নম্বর সঙ্কেত বহাল

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

বৈশাখী মেঘের ঘনঘটা আর টানা ভারী বর্ষণে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাঁচ জেলায় আগাম বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে নেত্রকোনা ও মৌলভীবাজারের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বন্যা শুরু হয়েছে। নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলার নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে দেশের চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সঙ্কেত বহাল রাখা হয়েছে।

পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য মতে, দেশের অভ্যন্তরে ও উজানে অতিভারী বৃষ্টির কারণে নেত্রকোনা ও মৌলভীবাজারে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ প্রতীম বড়ুয়া জানিয়েছেন, বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় সিলেট বিভাগের তিন জেলা- সিলেট, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জেও পানি বাড়ছে। মৌলভীবাজারের মনু এবং নেত্রকোনার সোমেশ্বরী, কংস ও মগরা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পাহাড়ি নদী হওয়ায় বৃষ্টির তীব্রতা বাড়লে পানি অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে বাড়ে, তবে বৃষ্টি কমলে পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনাও থাকে।

বিপদসীমার ওপরে ৪ নদী

বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র গতকাল বুধবার সকালে জানিয়েছে, দেশের চারটি প্রধান নদীর পানি বর্তমানে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে নেত্রকোনার ভুগাই-কংস নদী বিপদসীমার ৮২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। এ ছাড়া সোমেশ্বরী নদী ৫০ সেন্টিমিটার, মগরা নদী ২ সেন্টিমিটার এবং মৌলভীবাজারের মনু নদী বিপদসীমার ৭২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানিও গত ২৪ ঘণ্টায় এক থেকে দেড় মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাত থেকেই দেশের আট বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ ১৬১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে কিশোরগঞ্জের নিকলীতে। এ ছাড়া ভোলায় ১৫১ মিমি, ফেনীতে ১৪৮ মিমি, ময়মনসিংহে ১১৫ মিমি, পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় ১১৪ মিমি এবং কুমিল্লায় ১০৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। রাজধানী ঢাকায় গতকাল সকাল থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে; ভোর ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ঢাকায় ১৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত নথিবদ্ধ করা হয়েছে।

আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক ও কাজী জেবুন্নেসা সংবাদদাতা জানিয়েছেন, এই বৃষ্টির প্রবণতা আগামী ৪ মে (সোমবার) পর্যন্ত থাকতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে। বৃষ্টির ফলে সারা দেশে দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে।

উত্তর বঙ্গোপসাগর এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সঙ্কেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর জন্য ১ নম্বর সতর্ক সঙ্কেত জারি করা হয়েছে, কারণ বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা বা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।

হঠাৎ এই অকাল বর্ষণ ও বন্যার আশঙ্কায় বোরো ধান কাটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হাওরাঞ্চলের কৃষকরা। অনেক নিচু এলাকার রাস্তাঘাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানি থই থই করছে। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে বৃষ্টির কারণে যানজট ও সাধারণ মানুষের চলাচলে ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদফতর ও পাউবো সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।

কুয়াকাটায় ভারী বৃষ্টিপাত

এ দিকে কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য এবং বজ্রমেঘের প্রভাবে কুয়াকাটাসহ উপকূলীয় অঞ্চলে বিরূপ আবহাওয়া বিরাজ করছে। এর ফলে পটুয়াখালী জেলার বিভিন্ন স্থানে গতকাল দুপুর থেকে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে।

আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় ১১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা বৃষ্টিপাতের কারণে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এবং নদ-নদীর পানির উচ্চতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এ দিকে কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর উত্তাল হয়ে উঠেছে। সাগরে বায়ুচাপের পার্থক্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বাতাসের গতিবেগও বেড়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, পটুয়াখালীসহ দেশের অন্তত ১৬টি জেলার ওপর দিয়ে অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে, যার গতিবেগ ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সঙ্কেত দেখাতে বলা হয়েছে।