নিজস্ব প্রতিবেদক
নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের রক্তে কম অক্সিজেন (হাইপোক্সিমিয়া) থাকায় তা অনেক সময় বিপজ্জনক অবস্থায় চলে যায় এবং শেষ পর্যন্ত নিউমোনিয়ার ৪০ শতাংশ শিশুর মৃত্যু হয়ে থাকে। বাংলাদেশে প্রতি ঘণ্টায় দুই থেকে তিনটি শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যায় এবং এ হিসেবে বছরে মৃত্যু হয় ২৪ হাজার। বৈশ্বিকভাবে রক্তে কম অক্সিজেন থাকা নিউমোনিয়ার রোগীদের মৃত্যুহার ৩১ শতাংশ। অপর দিকে রক্তে কম অক্সিজেন থাকা নিউমোনিয়ার রোগীদের মৃত্যু বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশে ২২ গুণ বেশি। এ মৃত্যুরোধে একটি সাধারণ অক্সিমিটার সহায়তা করতে পারে। রক্তে অক্সিজেন কম থাকলে সাথে সাথে যন্ত্রটি দিয়ে বাড়িতে বসেই নিউমোনিয়ার রোগীদের রক্তে কী পরিমাণ অক্সিজেন আছে তা মাপা যায় এবং অক্সিজেন কম থাকলে দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ড. আহমেদ এহসানুর রহমান বলেন, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ৯০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে অবশ্যই হাসপাতালে নিতে হয় এবং পরিমাণ মতো অক্সিজেন দিতে হবে। তিনি বলেন, জন্মের ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ (এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং) খাওয়ানো হলে ওই শিশুর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ১৫ শতাংশ কমে যায়। বিপরীতে শৈশবকালীন অপুষ্টি থাকলে ওই শিশুর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার হার ১৫ গুণ বেড়ে যায়।
ড. আহমেদ এহসানুর রহমান বলেন, নিউমোনিয়া এখনো বিশ্বব্যাপী পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ, প্রতি বছর প্রায় সাত লাখ শিশুর মৃত্যু হয়। পাঁচ বছর ধরে প্রতি হাজার জীবিত জন্মের ৭.৪ শিশুর মৃত্যু হয় নিউমোনিয়ায়। নিউমোনিয়ার কারণে বছরে ছয় লাখ ৭৭ হাজার শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়। নিউমোনিয়া হয়ে থাকে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কারণে। কিন্তু অনেক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে যাওয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করছে না। ফলে নিউমোনিয়ার অনেক শিশুকে অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া হলে শুধুমাত্র প্রতিরোধী হয়ে যাওয়ায় শিশুরা মারা যাচ্ছে। এ অবস্থা এড়িয়ে যেতে হলে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি দূর রকরতে হবে।
কেবল সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ২১ শতাংশ নিউমোনিয়া সংক্রমণ কমানো যায়। কারণ হাত দিয়ে নানা কিছু স্পর্শ করায় হাতে প্রচুর মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া হাতে লেগে যায়। এ হাত সাবান দিয়ে হাত না ধুয়ে শিশুকের কোনো কিছু খাওয়ানো হলে শিশুর শরীরে ব্যাকটেরিয়া গিয়ে মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যায়। সে জন্য সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে নিলে শিশু নিউমোনিয়াসহ পেটের পীড়া থেকে মুক্ত থাকতে পারে। আইসিডিডিআরবির গবেষণায় দেখা গেছে গর্ভবতীদের আরএসভি ভ্যাকসিন দেয়া হলে তা নবজাতক শিশুদের গুরুতর নিউমোনিয়া এবং হাইপোক্সেমিয়া প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এ ছাড়া খুব স্বল্প দামে আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ড. যুবায়ের চিশতীর আবিষ্কৃত বাবল সিপ্যাপ সফলতার শিশুর অক্সিজেন স্বল্পতায় উপকারী প্রমাণিত হয়েছে। এ বাবল সিপ্যাপ যন্ত্রটি আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ায় পরীক্ষা করে শিশুদের অক্সিজেন স্বল্পতা দূর করতে সহায়তা করছে। এ যন্ত্রটি দিয়ে অক্সিজেন স্বল্পতাহেতু ৭৫ শতাংশ শিশুর মৃত্যুহার কমানো যাচ্ছে। স্বল্প দামের এ ডিভাইসটি ইথিওপিয়ার ১৬টি হাসপাতালে সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেখানে কার্যকরভাবে অক্সিজেন স্বল্পতারোধ করা গেছে। হাইপোক্সেমিয়ায় মৃত্যু বেশির ভাগই প্রতিরোধযোগ্য এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ঘটে। বাংলাদেশে বার্ষিক আনুমানিক ৪০ লাখ নিউমোনিয়ার ঘটনা ঘটে।



