নির্বাচনে আটঘাট বেঁধে মাঠে নামছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দল। এ লক্ষ্যে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। তৈরি হচ্ছে ইশতেহার। বিভাগ-জেলা থেকে নির্বাচনী এলাকাগুলোতে সভা-সমাবেশের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে দেয়া হবে নতুন বার্তা। এ দিকে নির্বাচনী সমঝোতার কাজও প্রায় সেরে এনেছে ১১ দল। আগামীকাল ১৩ জানুয়ারি আসন সমঝোতার চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে বলে দলগুলোর সূত্রে জানা গেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বর্তমানে বাতিল হওয়া প্রার্থীদের আপিল শুনানি চলছে। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করা হবে ২০ জানুয়ারি। ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর শুরু হবে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা। আর ভোট গ্রহণ করা হবে ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার।
জানা যায়, আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের জন্য সবধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতসহ জোটে থাকা শরিক দলগুলো। এ জন্য প্রতিটি দলই নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করছে। জামায়াত সূত্রে জানা যায়, ইতোমধ্যে দলটি ইশতেহার তৈরির কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে। দলটির নেতারা বলছেন, এবারের ইশতেহার হবে স্মরণকালের সবচেয়ে আধুনিক ও যুগপোযোগী। ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সভা থেকে এ বিষয়ে কিছু ইঙ্গিতও দিয়েছে দলটি। গত বছর জুলাই আন্দোলন সফলে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন জেন জি তথা তরুণরা। আর এ আন্দোলন শুরু হয়েছিল কোটার অভিশাপ থেকে বাঁচতে। এ কারণে জামায়াত তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে তরুণদের কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দিয়েছে। দলটি বিজয়ী হলে এমন একটি বাস্তবমুখী শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে চায়, যাতে অনার্স-মাস্টার্স পাস করার পরপরই তরুণরা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারেন। বেকার থাকার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে পারেন লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার। এ ছাড়া নারীরা যাতে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও উপযুক্ত সুযোগ পেতে পারেন সে জন্যও রয়েছে পরিকল্পনা। জামায়াত আমির ইতোমধ্যে কর্মজীবী নারীদের মধ্যে যারা মা রয়েছেন তাদের কর্মঘণ্টা শিথিল করার আভাস দিয়েছেন, যাতে বর্তমানে প্রচলিত গর্ভবতী নারী চাকুরেদের ছয় মাস ছুটির পর সন্তান লালন-পালনের সুবিধার্থে এ সুযোগ সৃষ্টি করা হতে পারে। এ ছাড়া নারীরা যাতে কর্মক্ষেত্রে হয়রানির শিকার না হন, নারী নির্যাতন বন্ধসহ নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতেও নেয়া হবে পরিকল্পনা। দেশে প্রায় আট ভাগ জনসংখ্যা সংখ্যালঘু। তবে জামায়াত তাদেরকে সংখ্যালঘু ভাবতে নারাজ। তাদের দেশের নাগরিক হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের মতোই একই রকম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে চায় দলটি। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে জামায়াত আমির প্রকাশ্য ঘোষণাও দিয়েছেন। একইভাবে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে নানা পদক্ষেপের কথা থাকবে নির্বাচনী ইশতেহারে।
এ দিকে জামায়াতের মতোই এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ জোটের শরিক অন্যান্য দলও তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রস্তুত করছে, যাতে অনেক জনবান্ধব কর্মসূচি থাকবে বলে দলগুলোর নেতারা জানিয়েছেন।
নির্বাচনে বিএনপি জোট ইতোমধ্যে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করতে পারলেও জামায়াত জোট এখনো সমঝোতার চূড়ান্ত ঘোষণা দিতে পারেনি। তবে জানা গেছে, আসন সমঝোতার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে জামায়াত জোট। আগামীকাল মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে এর ঘোষণা আসতে পারে। এর আগে চলছে সর্বশেষ চুলচেরা বিশ্লেষণ। জানা যায়, জোটের পক্ষ থেকে অনেক আগেই নিরপেক্ষ জরিপ করা হয়েছে। তার ভিত্তিতেই আসন সমঝোতা করা হচ্ছে। এ জরিপে দলগুলোর মধ্যে প্রায় সব আসনেই জামায়াত শীর্ষে রয়েছে বলে জানা যায়। এরপর ইসলামী আন্দোলনের দেশের সব আসনেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোট থাকলেও এককভাবে তা বিজয়ী হওয়ার জন্য উপযুক্ত নয়। অন্যান্য দলের এলাকাভিত্তিক ভোটার থাকলেও সারা দেশে বিজয়ী হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। এসব বিষয় বিবেচনা করেই আসন বণ্টন করা হবে। কোন দল কত আসন পাচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, চূড়ান্ত ঘোষণার আগে সুনির্দিষ্টভাবে আসন সংখ্যা বলা যাচ্ছে না। বিভিন্ন গণমাধ্যমে যা আসছে তার সব সত্য নয় বলেও জানান তিনি। কারণ আলোচনা এখনো চলমান রয়েছে। সে ক্ষেত্রে চূড়ান্ত হওয়ার আগে সুনির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয় বলে তিনি জানান। এ সময় আগামীকাল মঙ্গলবার আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হতে পারে বলেও তিনি আভাস দেন। ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করীম জানিয়েছেন, সমঝোতার আলোচনা এখনো চলমান রয়েছে।
জানা যায়, আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হলে একযোগে মাঠে নামবে দলগুলো। নির্বাচন কমিশনের দেয়া সময় অনুযায়ী জেলা-উপজেলা, বিভাগ ও আসনভিত্তিক সভা-সমাবেশের আয়োজন করবে দলগুলো। সেখানে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নেয়াসহ জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী করতে দলগুলোর ভোটারদের প্রতি আহবান জানাবে। এ ছাড়া বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা, লিফলেট বিতরণ, এলাকাভিত্তিক নানা উদ্যোগও থাকবে এর মধ্যে। জানা যায়, জামায়াত জোটের দলগুলোর মধ্যে আসন সমঝোতার আলোচনার পাশাপাশি নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণেও যৌথ বৈঠক শুরু হয়েছে। গতকাল এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সাথে বৈঠক করেছেন জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান। ওই বৈঠকে নির্বাচনে বিজয়ী হতে কৌশলগুলো নিয়েও আলোচনা হয় বলে জানা যায়। এ ছাড়া এনসিপির নেতাদের সাথে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদেরও এ বিষয়ে আলাদা প্রস্তুতি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। একইভাবে নির্বাচনী কৌশল নিয়ে অন্যান্য দলের সাথেও জামায়াতের আলোচনা চলমান রয়েছে।



