জাইকার অর্থায়নে মেট্রোরেলের তিন ক্রয় প্রস্তাব প্রত্যাহার

ডিপিপির তুলনায় হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়; আন্তর্জাতিক মান নিয়েও প্রশ্ন

ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-১ প্রকল্পের তিনটি বড় ক্রয় প্রস্তাব শেষ মুহূর্তে প্রত্যাহার করেছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) যৌথভাবে অর্থায়ন করছে প্রকল্পটি। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় কয়েকটি প্যাকেজে শত শত থেকে হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হওয়ায় প্রস্তাবগুলো পুনঃযাচাইয়ের জন্য ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-১ প্রকল্পের তিনটি বড় ক্রয় প্রস্তাব শেষ মুহূর্তে প্রত্যাহার করেছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) যৌথভাবে অর্থায়ন করছে প্রকল্পটি। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় কয়েকটি প্যাকেজে শত শত থেকে হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হওয়ায় প্রস্তাবগুলো পুনঃযাচাইয়ের জন্য ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে।

গতকাল বুধবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে প্রস্তাবগুলো উপস্থাপনের কথা থাকলেও বৈঠক শুরুর আগেই সেগুলো প্রত্যাহার করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

কমিটি-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ব্যয়ের যৌক্তিকতা, দরপত্র মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারদরের সাথে সামঞ্জস্য আরো যাচাই করা হবে। প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর প্রস্তাবগুলো আবারো ক্রয় কমিটিতে উপস্থাপন করা হতে পারে।

তিন প্যাকেজে ব্যয়ের চিত্র

১. লাইন-১ (উত্তর নদ্দা-বিমানবন্দর অংশ)

এই অংশে ৫.১৮ কিলোমিটার মূল লাইন ও স্টেশন নির্মাণের জন্য একটি জাপানি-ভারতীয় কনসোর্টিয়ামকে কাজ দেয়ার প্রস্তাব ছিল। অনুমোদিত ডিপিপিতে এ কাজের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪,৫৮২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। কিন্তু প্রস্তাবিত দর অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ১,৫৯০ কোটি টাকা বেশি হওয়ায় বিষয়টি পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

২. সিপি-০২ (ডিপো ও অবকাঠামো ভবন)

চীনের সিনোহাইড্রো ও বাংলাদেশের এসইবিসিএলের যৌথ উদ্যোগকে ৪,২৮৫ কোটি টাকার কাজ দেয়ার প্রস্তাব ছিল। এটি অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৩,০৫৪ কোটি টাকা বেশি হওয়ায় ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

৩. সিপি-০৩ (সিভিল ওয়ার্কস)

চীনের তিনটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগকে ২,৬৭১ কোটি টাকার কাজ দেয়ার প্রস্তাব ছিল। এটিও মূল ডিপিপির তুলনায় প্রায় ৭৮০ কোটি টাকা বেশি হওয়ায় পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

কেন বাড়ছে ব্যয়?

প্রকৌশলী ও অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে দরপত্রের মূল্য ডিপিপির তুলনায় কিছুটা বেশি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এর পেছনে ইস্পাত, সিমেন্ট, জ্বালানি ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধি, নকশা পরিবর্তন, পরিবহন ব্যয় এবং শ্রমমূল্য বৃদ্ধির মতো কারণ কাজ করে।

তবে ডিপিপির তুলনায় কয়েকটি প্যাকেজে ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেলে তার যৌক্তিকতা বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা জরুরি। বিশেষ করে জাইকার মতো উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে সর্বোত্তম মূল্য নিশ্চিত করাই প্রচলিত নীতি।

আন্তর্জাতিক তুলনা

বিশ্বব্যাপী মেট্রোরেল নির্মাণ ব্যয় প্রকল্পভেদে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়।

ক্স ভারত : ভারত (পাটানা মেট্রো) ৪০.৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ক্স লাহোর অরেঞ্জ লাইন ৬০-৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ক্স দুবাই মেট্রো ১৮৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ক্স ভিয়েতনাম (হ্যানয় ও হো চি মিন সিটি): ব্যয় প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ১০০-১৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ক্স থাইল্যান্ড (ব্যাংকক) : উড়াল অংশের ব্যয় সাধারণত ৭০-১২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ভূগর্ভস্থ অংশে ১৮০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

ক্স ইন্দোনেশিয়া (জাকার্তা এমআরটি) : ভূগর্ভস্থ অংশের কারণে গড় ব্যয় প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি।

ক্স এমআরটি লাইন-৬ ঢাকা ১৩০-১৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার; এমআরটি লাইন-১/৫ ঢাকা (বর্তমান দর) ৩০০-৩২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশে বর্তমানে চালু এমআরটি লাইন-৬ (উত্তরা-কমলাপুর)-এর প্রকল্প ব্যয় অনুযায়ী প্রতি কিলোমিটার নির্মাণ খরচ প্রায় ১,৫৭৪ কোটি টাকা (১৩০-১৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)। এই হিসাব প্রকল্পের মোট ব্যয়কে মোট দৈর্ঘ্য দিয়ে ভাগ করে নির্ধারণ করা হয়েছে।

অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রকল্পের সাথে বাংলাদেশের তুলনা করতে হলে একই ধরনের নির্মাণপদ্ধতি, স্টেশন সংখ্যা, জমি অধিগ্রহণ, ডিপো, সিগন্যালিং, রোলিং স্টক এবং অর্থায়নের কাঠামো বিবেচনায় নিতে হবে।

বাংলাদেশের বাস্তবতা

বাংলাদেশের এমআরটি-৬ মূলত উড়ালপথে নির্মিত হলেও এমআরটি-১ প্রকল্পে উড়াল ও ভূগর্ভস্থ-দুই ধরনের অংশ রয়েছে। বিশেষ করে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ অংশ নির্মাণের কারণে প্রকল্পটির ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই বেশি।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি ব্যয় বাড়ানোর একটি কারণ হলেও, দরপত্র মূল্যায়নে পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, প্রকল্পের নকশা চূড়ান্ত না করে দরপত্র আহ্বান না করা এবং ডিপিপির বাস্তবসম্মত ব্যয় নির্ধারণ করা না গেলে প্রকল্পের ব্যয় আরো বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মত

অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি একেবারে অস্বাভাবিক নয়; তবে ডিপিপির তুলনায় কয়েক হাজার কোটি টাকার পার্থক্য হলে তার প্রযুক্তিগত ও আর্থিক ব্যাখ্যা জনসমক্ষে তুলে ধরা উচিত। এতে সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা যেমন বাড়বে, তেমনি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর আস্থাও অটুট থাকবে।

সরকার ক্রয় প্রস্তাবগুলো আপাতত প্রত্যাহার করে পুনঃমূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেয়ায় ব্যয়ের যৌক্তিকতা নতুন করে পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় কতটা কমে আসে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মানদণ্ড কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।